#গঙ্গার_সৎ_অসৎ
পর্ব -৯
[ লেখকের অনুমতি নিয়ে ই- নলেজ আইডিয়াতে গল্পটাকে কোনো রকম সংযোজন - বিয়োজন ছাড়া আপলোড করা হয়েছে । আসল লেখার লিংক নিচে ]
ফাদারের সাথে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মুসলিম হিন্দু সবাই প্রার্থনা করছে। ফাদার দুই হাত জোড়ো করে মাথা নত করে জেসাস এবং মাদার মেরির ছবির সামনে প্রনাম করলেন, গ্রামের জেলে এবং বেদে সম্প্রদায়ের মানুষগুলিও ফাদারের দেখাদেখি প্রনাম করলো।
আবিদ খান আর শম্ভু দুজন হল্ ঘরটির এক কর্নারে দুইটি চেয়ারে বসলো। প্রার্থনা শেষে সবাই চলে যাচ্ছে। ফাদার প্রত্যেকের যাওয়ার আগে একশো টাকা করে দিলেন, প্রায় ১৭ জন নিম্নবিত্ত লোক। ফাদারের দৃষ্টি পড়লো আবিদ আর শম্ভুর দিকে। শম্ভুকে তো সে আগে থেকেই চিনে। আবিদের সাথে তার আলাপ নেই। তবে আবিদকেও সে গ্রামের হাটে, গঞ্জের হাটে দেখেছে কখনও সুজনের সাথে, কখনও শম্ভুর সাথে, কখনও চৌধুরী বাড়ীর কারো না কারো সাথে দেখেছে। খোজ নিয়ে জেনেছে ছেলেটা চৌধুরী বাড়ীর মেহমান।
বেশিরভাগ সময়ে গঞ্জের দুইটা ফার্মেসির আশেপাশে ঘুরতে দেখেছে। ফাদার নিজেই এগিয়ে এলো আবিদের দিকে। আবিদ উঠে দাড়িয়ে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো। ফাদার হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন "গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড"। ফাদার একজন মিডিয়াম হাইটের মধ্যবয়সী ব্যক্তি। বাদামী গায়ের রঙ, চেহারায় কাটছাট বেয়ার্ড আছে। চোখে চশমা। আবিদের মনে হলো চশমা তার বয়সটা একটু যেনো বাড়িয়ে দিয়েছে। ভাবগাম্ভীর্য এনেছে। হয়তো একজন পাদ্রীর ভাবগাম্ভীর্য থাকাটা বাধ্যতামূলক। ঠিক যেমন মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন হুজুরদের থাকে।
ফাদার তার কাজের লোককে চা নাশতা দিতে বললেন।
আবিদ চায়ে চুমুক দিয়ে বললো "ফাদার আমি আপনার প্রার্থনা একমনে শুনছিলাম, সময়টা কিভাবে কেটে গেলো টের ও পাই নি"। ফাদার মৃদু হেসে বললেন "এটাই ঈশ্বর বন্দনার মহিমা মাই চাইল্ড", তারপরে তিনি শম্ভুর দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বললেন "কিরে বাছা তুই তো চার্চের ঘর ভুলেই গেছিস, এখন আর আগের মতো আসিস না কেনো"? শম্ভু মাথা চুলকে ছাত্রদের মতো উত্তর দিলো "সাধুজীর পূজার ঘরেও সময় দেওন লাগে মাঝে মইধ্যে, তাই আওয়া হয় না হুজুর, নিজেগো বাইদা কামও থাকে, দুই দিন আগে জেলা সদরে বিয়া বাড়িতে খেলা দেহানের জন্য বড় একটা ট্রিপ পাইসি, যারা খেলা দেহাইসে, আমি তাগো লগে নিজে গেসি, নয়তো ভাগের টাকা ওরা মাইরা দেয়"।
ফাদার অভিযোগের কন্ঠে বললেন "কতদিন বলেছি তোকে আমাকে হুজুর ডাকবি না"।
আবিদ খেয়াল করলো শুদ্ধ পরিস্কার উচ্চারন ফাদারের, তবুও কেনো যেনো একসেন্টে বাংলাদেশের মতো না। অনেকটা পশ্চিম বঙ্গের টোন।
আবিদ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলো "ফাদার আপনার হোম ডিস্ট্রিক্ট কোথায়"?
ফাদার হেসে বললেন "আমি দক্ষিন ভারতের কেরালা থেকে এসেছি মাই চাইল্ড"। শম্ভু অবাক হয়ে বললো "কন কি ফাদার, আগে তো কখনও হুনি নাই"।
ফাদার বিচলিত হয়ে গেলেন, বললেন তোরা তো কেউ কখনও জানতে চাস নি, আমি তো তোদের আপন হবার জন্য ই এসেছি"। আবিদ কিছু একটা ভাবছে, ফাদার আর শম্ভুর আলাপের মাঝখানেই হঠাৎ আবিদ বললো " আপনি যে ভারতীয় এটা কি ফয়েজ জানতো? ফাদার বললেন,"হ্যা জানতো, ফয়েজ দুই দিন পর পর ই আসতো চার্চে"। আবিদ খুব ধীরে ধীরে চা পান করছে, পাচ মিনিটের জায়গায় সে পনেরো মিনিট লাগাচ্ছে। আবিদ আবার বললো,"ফাদার আপনি নিজে একা এখানে থাকেন, কেনো গ্রামের গরীবদের মাঝে এতো টাকা বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন"? আপনি নিশ্চয়ই জানেন অতি উচ্চ বিত্ত আর অতি নিম্নবিত্ত এই দুই শ্রেনীকে যতোটা এভয়েড করা যায়, ততোই মঙ্গল, আপনি এভাবে টাকা দিতে থাকলে এদের টাকার নেশা পেয়ে বসবে"।
ফাদার এবার হা হা করে প্রান খুলে হেসে বললেন "ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে গরীব মানুষদের সাহায্য করার জন্য ই মিশনারীজ থেকে আমাকে এখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাছাড়া মাই চাইল্ড তুমি অতি উচ্চবিত্ত আর অতি নিম্নবিত্ত বলে মানুষকে যেভাবে ভাগ করছো এটা বেদ শাস্ত্রের কথা, তোমার আর আমার জন্য নয়, ঈশ্বরের কাছে সবাই সমান, তোমার কোরানে বলা হয়েছে সব মানুষ ঈশ্বরের বান্দা অর্থাৎ গোলাম, ধনী গরীব সবাই, আর আমার বাইবেলে আছে সব মানুষ ই ঈশ্বরের সন্তান, ধনী গরীব সবাই"।এই পর্যন্ত বলে ফাদার থামলেন। আবিদ আর শম্ভু শিষ্যদের মতো বসে ফাদারের কথা শুনছে। ফাদার আবার কলেজের প্রফেসরদের মতো বলতে শুরু করলেন। বললেন " জাত পাতের ভয়ানক এক প্রথা ছিলো এই উপমহাদেশে, কারন বেদ এবং মনুস্মৃতি তে মানুষের চারটি জাতের কথা উল্লেখ আছে,ঈশ্বরের মাথা থেকে সৃষ্টি হয়েছে ব্রাক্ষ্মন, বুক থেকে ক্ষত্রিয়, পাকস্থলী এবং উরু থেকে বৈশ্য, পা এবং পায়ের তলার ময়লা থেকে শূদ্র"। শম্ভু অবাক হয়ে শুনছে ফাদারের কথা। শম্ভু বললো ফাদার আমনে আমাগো ধর্ম বেফারেও এতো কিছু জানেন,,,, আইচ্ছা তাইলে বেদ আর মনুস্মৃতি কোন কিতাব টা পড়ুম"? ফাদার শম্ভুর দিকে তাকিয়ে মায়া ভরা হাসি দিয়ে বললেন, তোরা এখন ধর্ম গ্ৰন্থ ছুয়ে পড়তে পারছিস, কিন্তু আজ থেকে একশো বছর আগেও শূদ্ররা ধর্মীয় গ্ৰন্থ ছোয়া এবং মন্দিরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো, তুই সেই শূদ্র মাই চাইল্ড, তুই ধর্মীয় গ্ৰন্থ কোনটা পড়বি তোদের পুরোহিত সাধু বাবাকে জিগেস করে পড়িস"। শম্ভু মুখ চোখ কালো করে বললো "ফাদার আমি বিশ্বাস করি না, ভগবান আমারে জাত পাতে ভাগ করসে এইটা আমি মানতে পারুম না"।
ফাদার শম্ভুর মাথায় হাত দিয়ে মায়া ভরা কন্ঠে বললেন " ও মাই চাইল্ড ভগবান কোনো ভুল করেন নি, এই জাত পাত মানুষের সৃষ্টি তার নিজ স্বার্থে"। শম্ভু কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বললো "তবে যে আমনে কইলেন বেদ আর মনুস্মৃতি তে এই কথার উল্লেখ আছে, কিন্তু বেদ আর মনুস্মৃতি তো ভগবানের ই বানী, তাইলে আবার নিজ স্বার্থে মানুষ এই কথা বানাইলো কেমনে? এবার ফাদার একটু চুপ করে আছেন, তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। ফাদার আবার শম্ভুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন " মাই চাইল্ড এজন্য ই তো তোদেরকে বলি প্রতিদিন একবার প্রভু জেসাসের সামনে এসে মাথা নত কর্, তার কাছে তোরা সবাই সমান"।
আবিদ মিশনারীজের বাড়ীটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। বাড়ীর ঘরে বাহিরে চতুর্পাশে দৃষ্টিনন্দন কিছু পশ্চিমা শিল্পকর্ম থাকার কারনে প্রথম দর্শনে মনে হবে গ্রামের এক কোনে এক চিলতে পশ্চিমা ভূখণ্ড।
আবিদ বাড়ীর চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে আবার চার্চ রুমের ভেতরে আসলো, সে দেখলো ফাদার আর শম্ভু আলাপ করেই যাচ্ছে। আবিদ সহাস্য ভঙ্গিতে ফাদারের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললো "ফাদার আপনি ই তো বললেন, আমাদের আল্লাহর কাছেও সব মানুষ ই সমান, সবাই ই এক আল্লাহর বান্দা, তাহলে শম্ভু আমাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া শুরু করলে কেমন হয় বলুন তো ফাদার"? ফাদার এক ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালেন আবিদের দিকে, কোনো উত্তর দিলেন না।
শম্ভু স্কুলের ছোটো শিশুর মতো আবার বললো "ফাদার ঈশ্বর নিজেই প্রভু, নিজেই পিতা, নিজেই পুত্র? এইডা কেমনে সম্ভব"?
ফাদার গর্বে হেসে বললেন " সে তো ঈশ্বর, তার জন্য সবই সম্ভব"।
আরো কিছুক্ষন আলাপ শেষ করে আবিদ আর শম্ভু বের হয়ে এলো চার্চের বাড়ী থেকে।
তারা গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেটে যাচ্ছে। তাদের গন্তব্য এখন পুরোহিত সাধু বাবার পূজার ঘর।
আবিদ বললো "শম্ভু আমি বাড়ীর ভেতরে ঢোকার আগে বাড়ীর বাহিরে চতুর্পাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে চাই, বাড়ীর পেছন দিক দিয়ে চলো"।
আবিদ আর শম্ভু সাধুজীর বাড়ীর পেছন বাগানের দিকে যেই না আসলো, তারা দেখলো বাড়ীর পেছনের কড়িকাঠের দরজা ঠাস করে খুলে গেলো, আর দরজা দিয়ে কাদতে কাদতে এক যুবতী নারী দৌড়ে বেরিয়ে এলো, বাড়ীর পেছনের বাগানের অন্যপাশে গাছ গাছালির আড়াল দিয়ে দৌড়ে নারীটা চলে গেলো।
আড়াল থেকে এই দৃশ্য দেখে আবিদ অবাক। সে শম্ভুর দিকে তাকিয়ে দেখলো শম্ভুও প্রায় হতবিহ্বল,,,,, আবিদ শম্ভুর ঘোর কাটানোর জন্য শম্ভুর ঘাড়ে হাত রেখে বললো " মেয়েটাকে চিনো" ?
শম্ভু আবিদের দিকে তাকালো না, যুবতী মেয়েটি যেই পথ ধরে গেলো, সেদিকেই অবাক চোখে তাকিয়ে বললো "মানসী,,,,,,,,,,,, মানসীর কি বেফার,,,,,,,,
✍️ #Imi_Chowdhury
#ইমি_চৌধুরী
চলবে,,,,,,,,,,,,,,
পর্ব ৮
https://www.facebook.com/share/p/hL9RgHVBy2BA5bDo/?mibextid=oFDknk
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।