#গঙ্গার_সৎ_অসৎ
পর্ব ২
[ লেখকের অনুমতি নিয়ে ই- নলেজ আইডিয়াতে গল্পটাকে কোনো রকম সংযোজন - বিয়োজন ছাড়া আপলোড করা হয়েছে । আসল লেখার লিংক নিচে ]
গ্ৰামের গন্যমান্য কিছু ব্যক্তিবর্গ, ধনী গরীব, উচু নিচু সব শ্রেনীর ই কিছু কিছু লোকে ভিড় হয়ে গেলো নদীর পাড়ে। চার ধর্মীয় গুরুও এখানে আছে। মসজিদের ইমাম হুজুর, পুরোহিত সাধু বাবা, মিশনারীজের ফাদার, খাজা বাবার মাজারের প্রধান খাদেম মুশকিল আসান বাবা। সবার মুখেই ভয়ের ছাপ। না জানি কোন মায়ের বুক খালি হয়েছে।
একটি যুবক ছেলের ম**রদেহ। নদীর পানির কারনে ফুলে ফেপে ভাসতে ভাসতে তীরে এসেছে। লা***শ দেখে সহজে চেনা যাচ্ছিলো না। তবে বিগত কয়েকদিন ধরে চৌধুরী বাড়ির আতিক চৌধুরীর ছেলে ফয়েজ চৌধুরী নিখোজ ছিলো। চৌধুরী বাড়ী থেকে কেউ নদীর পাড়ে আসে নাই, কারন এই বাড়ী এখান থেকে অনেক দূরে। তাছাড়া তারা এককালে এই উপজেলায় জমিদার ছিলো। এখন জমিদারী নেই, কিন্তু চৌধুরী বংশের অহংকারী চৌধ্রাহাট এখনও যায় নাই। উঠতে বসতে চলতে ফিরতে কথায় বার্তায় চৌধুরী বংশের দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না।
মসজিদের ইমাম হুজুর ম***রদেহ দেখে চিনতে পেরেছেন। তিনি ই প্রথম বলে উঠলেন এইডা তো আমাগো ফয়েজ।
হুজুরের কথা শুনে সুজন আরো এগিয়ে গেলো লা**শের কাছে। এবং চিনতে পেরে হাউমাউ করে কেদে দিলো। ফয়েজ ছিলো সুজনের বড় ভাইয়ের মতো। শুধু সুজনের না। ফয়েজ এই গ্ৰামের ধনী গরীব সবার সাথেই খুব ভালো ব্যবহার করতো। চৌধুরী বংশের অহংকার একেবারেই ছিলো না এই যুবকের মাঝে। আরেকটি বড় বিষয় এই ফয়েজ ই এই গ্ৰামের একমাত্র উচ্চশিক্ষিত ছেলে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে MSC শেষ করে এসেছিলো গ্ৰামে। সে চাইলেই দেশের বাহিরে গিয়ে সেটেল হতে পারতো, নিজের মেধা এবং অর্থ দুইটাই ছিলো। অন্তত ঢাকায় থাকতে পারতো। কিন্তু সে চলে এসেছে তার জন্মভূমি এই গ্ৰামে। এই গ্ৰামকে নিয়ে তার ছিলো অনেক স্বপ্ন। গ্ৰামের মানুষ ভালো চিকিৎসা পায় না। এখানে একটি ছোটোখাটো হাসপাতাল দেয়ার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু দূর্ভাগ্য এই গ্রামে এখনও ইলেকট্রিসিটি আসে নি। একটি উন্নতমানের হাসপাতাল পরিচালনার জন্য কারেন্ট মাস্ট প্রয়োজন।
এই বছর উপজেলা চেয়ারম্যান ইলেকশনে তার দাড়ানোর কথা ছিলো।
কিন্তু তার সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতাও ছিলো। বড় সমস্যা হলো সে সরকার দলীয় নয়, বিরোধী দলের হয়ে নির্বাচন লড়তো। নির্বাচন শেষ হলে বিয়ে করার কথাবার্তাও চলছিলো। আহা জীবন কত ঠুনকো,,,,,,
ইমাম হুজুর চৌধুরী বাড়িতে লোক মারফত খবর পাঠালেন। পুলিশ আসলো। পুলিশ মরদেহ দেখে বুঝতে পারে নি এটা কি হ**ত্যা নাকি আত্মহ***ত্যা।
ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ পুলিশ নিতে চেয়েও পারে নি। চৌধুরী বাড়ী থেকে কিছুতেই দেয়া হয় নি। পৌরসভা থেকে আসা সাধারণ পুলিশ এরা। এরা নিজেদের প্রশাসনিক পাওয়ার দিয়ে ডে**ড বডি নেয়ার চেষ্টাও করে নি।
কোনো এসআই বা দারোগা সাধারণত গ্রামের কোনো বিষয়ে আসে না। এই প্রত্যন্ত গ্রাম তাদের কাছে অতি নগন্য। এর জন্য সময় কোথায়?
কেটে যায় দিন। সুজনের মন খুব ই খারাপ। শুধু সুজনের কেনো? পুরা গ্রামেই শোকের ছায়া। ফয়েজ ভাইয়ের মুখখানি সুজনের বার বার মনে পড়ে। এই ঘটনার পর থেকে আলেয়া স্কুলে আসে না। বেশির ভাগ মেয়েরাই ভয়ে স্কুলে আসতেসে না।
এখন আলেয়ার জন্য স্কুলের বাগানে যেতে হয় না। আলেয়া কে দেখে না, তাই সুজনের মন আরো খারাপ। আগে এক বেলা নৌকা বাইতো। এখন সারাদিন নৌকা বায়। যাত্রীদের খাল পাড় করে গ্রাম থেকে গন্জে হাটে নিয়ে যায়। সুজন নিজেও শিক্ষিত ছেলে। গ্রামে উচ্চশিক্ষিত ফয়েজের পরে আরেকজন শিক্ষিত হলো সুজন। সম্পূর্ণ নিজের মেধা যোগ্যতায় মেট্রিক ইন্টার পাশ করেছে। সুজন যখন HSC পাশ করলো, সুজনের বাপ চাচা বারো ভাই সবাই মিলে খর্চা করে পুরা গ্রামে মিষ্টি বিতরন করেছে। কারন এই গ্রামে সাধারণত স্কুল পাশের পরে কলেজ পর্যন্ত কেউ আর যায় না। আর মাঝি বাড়িতে তো কেউ ফাইভ সিক্সের উপরে পড়েই না। কিন্তু সুজন ভিন্ন কিছু করে দেখিয়েছে। সুজনের স্বপ্ন গন্জে একটা বাসা ভাড়া নিবে। টিউশনি করবে। পারলে গন্জের স্কুলগুলোতে মাস্টারি চাকরি নেয়ার চেষ্টা করবে। আলেয়া কে বিয়ে করবে। বাপ, মা, আলেয়া আর বৃদ্ধা দাদীরে নিয়ে গন্জের বাসায় থাকবে। নিজে আর নৌকা বাইবে না।
ওর বাপ এই বুড়ো বয়সে এখনও নৌকা বায়। ভাইরাও বায়। সুজনের ভাইরা সবাই বিবাহীত। সুজন ই সবার ছোটো।
বাপকে একটু শান্তি দিতে চায় সে। আবার ভাবে গরীবের স্বপ্ন,,,,,, কি আর সহজে পূরন হয়,,, তবু সে চেষ্টা করবে।
সুজন আর আলেয়ার প্রথম দেখা হবার কোনো আলাদা বিশেষত্ব নেই। দুজনেই একই গ্রামের ছেলে মেয়ে। এখানে ছোটো বেলা থেকেই সবাই সবাইকে মোটামুটি চিনে জানে। শুধু সমস্যা একটাই একজন উচু বংশের মেয়ে, অন্যজন নিচু বংশের ছেলে। সুজন সপ্তাহে তিনদিন মিয়া বাড়ির কয়েকটি ঘরের ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের পড়ায়। আলেয়া তো মিয়া বাড়ির ই মেয়ে। সেই সুবাদে আলেয়াকে দেখতেও পারে। যদিও আলেয়াদের ঘরের কাউকে সুজন পড়ায় না। কিন্তু এক ঘর থেকে বাহিরে তাকালে বাড়ির উঠানে মাঝে মাঝে অন্য ঘরের আলেয়াকে দেখতে পায় সে। আলেয়াও বিভিন্ন ছুতোয় উঠানে আসা যাওয়া করে তখন।
সুজন গরীব ঘরের সুদর্শন ছেলে। লম্বা আর রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রঙ। নৌকা বাওয়া পুরুষ। এদের গায়ে থাকে শক্তি। তবেই তো শক্ত হাতে নৌকা বায়। গায়ে থাকে অতি সাধারণ ময়লা জির্ন গেঞ্জি বা শার্ট। পরনে থাকে লুঙ্গি। তবে কলেজে ক্লাস করতে যাওয়ার জন্য সুজন সবসময় প্যান্ট পড়ে যেতো। গন্জের কলেজে অনেকে লুঙ্গি পড়েও যায়। সুজন কখনও লুঙ্গি পড়ে যায় নি। আলেয়া কে স্কুলে দেখার জন্য এবং মিয়া বাড়িতে টিউশনিতে যাওয়ার জন্য সবসময় প্যান্ট পড়ে যায়। একটাই কালো প্যান্ট। আজ তিন বছর ধরে পড়তেসে।নিচের দিকে একটু খোচা লেগে ছিড়ে গেছে, সুই সুতা দিয়ে ঐটুকু বুনে নিতে হয়েছে। বুনোন টা দেখা যায়। আলেয়ার বড় মায়া হয় গরীব সুজনের জন্য।
সুজনের একটি বিশেষ দিনের কথা বার বার মনে পড়ে। সেদিন ই প্রথম সে আলেয়ার ছোয়া পায়।
আলেয়ার বয়স যখন নয় বছর আলেয়ার মা তহমিনা পাশের গ্রামের এক দু:সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে পালিয়ে যায়। আলেয়ার জমজ দুইটা ভাই আছে। ওদের বয়স তখন ছিলো মাত্র দুই বছর। এই দুইটা দুধের শিশুর কথাও তহমিনা ভাবে নাই। পরকিয়া প্রেমিকের হাত ধরে স্বামী, সন্তান,সংসার ফেলে পালিয়ে গেলো। গ্রামের মানুষ তখন বলাবলি করতো মিয়া বাড়ির বৌ ভাতার লইয়া ভাগসে। বেডার মেশিনের জোড় নাই। হেই কারনেই আরেক লাঙ লাগাইয়া ভাগসে। লোকজন যখন অতিমাত্রায় বলাবলি করতো কাসেম মিয়ার মেশিনের জোড় নাই, তাই বৌ গেসেগা, এই কথায় অতিষ্ঠ হয়ে মেশিনের জোড় আছে প্রমাণ করার জন্য আলেয়ার বাপ কাসেম মিয়া তহমিনা পালানোর এক বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিবাহ করে।
যেদিন তহমিনা পালিয়েছিলো কাসেম মিয়া আলেয়াকে নিয়েই তার মা তহমিনা কে খুজতে বের হয়। কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানতে পেরেছিলো যে পাশের গ্রামের ইকু বেপারীর সাথে তহমিনা কে যেতে দেখা গেছে। কাসেম মিয়া ইকু বেপারীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সাথে ছিলো আরও কিছু লোকজন আর আলেয়া। আলেয়াকে এই আশায় সাথে নিয়েছে যে মেয়ের কান্না দেখলে মেয়ের মা হয়তো ফিরে আসবে। তারা নৌকায় রওনা দিয়েছিলো পাশের গ্রামে। আলেয়া নৌকায় বসে অনবরত কান্না করছিলো মায়ের জন্য। সেদিন সুজনের বড় ভাইয়ের নৌকায় তারা যাচ্ছিলো। সুজনের বড় ভাই আর সুজন নৌকা বাইছিলো।
তখন সুজনের বয়স ছিলো ১৪। গায়ে ছিলো পুরান একটা রঙচঙে শার্ট আর লুঙ্গি। নয় বছর বয়সী ছোট্র মেয়ে আলেয়া কি করুন ভাবে কান্না করছিলো। গায়ে ছিলো হাটু সমান ফ্রক। চুল ছিলো দুই দিকে বেনী করা। কালো মেয়েটা কতটা করুন ভাবে মায়ের জন্য কান্না করছিলো তা দেখে সূজনের বড় মায়া লাগলো। সুজন ছোট্র আলেয়ার মাথায় একবার হাত দিলো। তারপরে গালে।
সান্তনার সুরে বললো "কাইন্দো না বুইন, তোমার মায় তো বাইচা আছে, মরে নাই তো, একদিন ঠিকি ফিরা আইবো, কাইন্দো না"। সান্তনা দিতে দিতে আলেয়ার মাথায় আর দুই গালে কয়েকবার স্পর্শ করলো।খাল পাড় হয়ে নৌকা তখন ছোটো নদীর মুখে এসেছে। জোছনা রাত, চাদের আলোয় নদীর পানি চিক চিক করছে। চারিদিকে ফকফকা। চারপাশে ঠান্ডা পানির গা শীতল করা হাওয়া বইছে।
এই প্রথম ছোয়া, দুইটি কিশোর কিশোরীর পাপহীন পবিত্র প্রথম স্পর্শ,,,,,,,,,,
✍️ #ইমি_চৌধুরী
#Imi_Chowdhury
চলবে,,,,,,,,,,,,,
পর্ব ১
https://www.facebook.com/share/p/893PxpMYnjwcHpbo/?mibextid=oFDknk
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।