#গঙ্গার_সৎ_অসৎ
পর্ব ৪
[ লেখকের অনুমতি নিয়ে ই- নলেজ আইডিয়াতে গল্পটাকে কোনো রকম সংযোজন - বিয়োজন ছাড়া আপলোড করা হয়েছে । আসল লেখার লিংক নিচে ]
মিয়া বাড়ির পুকুর টা বিশাল বড়। ঘাটলা বাধানো। ঘাটলার সিড়ি পুকুরের গভীরে মাঝ বরাবর গেছে। আলেয়া পুকুর পাড়ের ঘাট বাধানো বেদিতে বসে আছে। একটু সাজগোজ করেছে। এখন দুপুর শেষ হয়ে বিকাল। একটু পরে সুজন আসবে মিয়া বাড়ির পোলাপানদের পড়াতে।
এই পুকুর পাড়ে আছে আলেয়ার দেখা ছোটোবেলার অসংখ্য স্মৃতি। তবে সবগুলো স্মৃতি ই ভয়াবহ। মিয়া বাড়ীর দু:সম্পর্কের আত্মীয় হিসেবে ইকু বেপারীর বাড়ির লোকজনদের ছিলো এই বাড়িতে আসা যাওয়া। আর ইকু তো প্রায় ঘন ঘন আসতো। ছোটোবেলায় একদিন সন্ধ্যার কিছু আগে বাড়ির অন্যান্য ঘরের সমবয়সীদের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে আলেয়া পুকুরের পাশে বাগের ভেতরে ঢুকে যায়। সেখানে সুপারি,চালতা,তাল, গাব,আমড়া,আমরুজ, আম, কাঠাল, নারিকেল খেজুর গাছ গাছালি। তার একপাশে একটু দূরে জংলা অপরিস্কার ঝোপ ঝাড়। সেখানে সাপখোপ থাকে বলে বাড়ির কেউ খুব একটা আসে না। আলেয়া দেখেছিলো ঐখানে নিজের মা তহমিনা আর ইকু কে। সে দেখেছিলো তহমিনার বুকে মুখ গুজে আছে ইকু বেপারী।সেই ছোটোবেলায় বোঝেনি ঘটনা কি। এখন বোঝে আর মায়ের প্রতি ঘৃণায় মুখ সিটকে আসে। সে ভাবে "তহনও মা আমার বাহের বৌ আছিলো, মিয়া বাড়ির বৌ আছিলো, কেমনে পারতো এতো নোংরা হইতে? আলেয়া কষ্টের কথা না পারে কাউকে বলতে, না পারে সইতে। কিন্তু সে সবসময় তার বাপের বাড়ির সবার সাথে মায়ের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করে। কারন তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর ভয়ঙ্কর চেহারাও সে দেখেছে।
আলেয়ার ভাবনায় ব্যাঘাত হলো, তার চাচাতো বোন মদিনা এসে বসেছে তার পাশে। মদিনার বিয়ে ঠিক হয়েছে। হবু স্বামীর গন্জে চালের আড়ৎ আছে। মদিনা বললো " এই সন্ধ্যায় পুকুর ঘাটে একলা কি করোস"
আলেয়া একটা দীর্ঘ নি:শ্বাস ছেড়ে বললো আম্মার কথা মনে পড়ে। আব্বা যদি যহন তহন মেজাজ উঠলেই আম্মার গায়ে হাত না তুলতো, তাইলে হয়তো আম্মায় কোনোদিন আমাগোরে ফালাইয়া যাইতো না। মদিনা খিল খিল করে হেসে দিলো কথা শুনে। বললো বুঝলাম কাকা বদ রাগী, কিন্তু তোগো তিন ভাই বোইনের কি দোষ আছিলো?? তোগোরে ফালাইয়া কাকী গেলো কেমনে? মা বাপ তো ছাওয়ালের সুখের লাইগা নিজের জীবন দিয়া দেয়। তবেই তো তারা মা আর বাপ।
কাকী তোগোরে ফালাইয়া যাইয়া নিজের নারী জীবনের সুখ হয়তো পাইসে, কিন্তু মায়ের জায়গা হারাইসে। নয়তো দুই বছরের দুধের ছাওয়াল রহিম করিমরে ফালাইয়া গেলো কেমনে, তোর কথা না হয় বাদ দিলাম, তুই তো তহন বড় ই আছিলি। মদিনা দেখলো আলেয়ার মুখ চোখ কালো হয়ে গেছে। হয়তো এখনি কান্না শুরু করবে। মদিনা প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য আলেয়াকে একটু রসিকতা মতো ধাক্কা দিয়ে বললো
চিন্তা করিস না আমার বিয়ার পরে আমার দেবরের লইগা তোরে নিমু। আলেয়া মাথা নেড়ে বললো আমি ছোটো ভাই রহিমরে একলা সৎ মায়ের কাছে থুইয়া কোথাও যামু না, করিমের যহন চাইর বছর বয়স আছিলো, আমি নিজের চোক্ষে দেখসি ঐ বেটি কল পাড়ে আমার ভাইয়ের গলা চিপ্পা ধরসে, মাঝে মাঝেই এই বেটি আমরা চোখের আড়াল হইলেই রহিম করিমরে মারতো, রহিমরে তো একদিন ধাক্কা দিয়া খাট থেইকা বেটি ফালাইয়াই দিসে। আলেয়া কাদতে কাদতে বলে রহিমের মাথা ফাইট্রা ফিনকি দিয়া রক্ত পড়সিলো। আব্বায় রহিমরে গন্জের ডাক্তারের কাছে নিয়া মাথায় সেলাই কইরা আনলো। আমি আব্বারে কইসিলাম নয়া মায় রহিমরে ধাক্কা দিসে। আব্বায় বিশ্বাস করে নাই। যহন ই আব্বারে হের নয়া বৌয়ের কথা কিছু কইসি, কোনোদিন বিশ্বাস করে নাই। আব্বায় মনে করতো আমি সৎ মায়রে দেখতে পারি না, এই লাইগা বানাইয়া বানাইয়া কই।
এই বেটির অত্যাচারে করিম যাইয়া আমগো মায়ের কাছে থাকে। করিমের লাইগা আমার বড় চিন্তা হয়, ঐ বাড়িতে কেমনে থাকে, ঐ বাড়ির মানুষ আমার ভাইডার লগে কেমন করে কে জানে,,,,
আলেয়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। মদিনা আলেয়ার কান্না দেখে ভাবলো "হায়রে দুনিয়া,,,, বাপ মায়ের তালাক হইলে পোলাপান বাপ মা থাকতেও এতিম হইয়া যায়, দুয়ারে দুয়ারে ধাক্কা খায়,,, বাপ মা ই যাগো আপন হয় না, দুনিয়ায় তাগো আর কেউ থাকে না আল্লাহ ছাড়া।
সুজন বাগের আড়ালে দাড়িয়ে আলেয়ার বলা সব কথাই শুনেছে, আলেয়া সুজন কে দেখে নি। সুজন নিজের অজান্তে তার গালে হাত দিয়ে দেখলো চোখের পানিতে ভিজা, আলেয়ার কষ্টের কথা শুনতে শুনতে তার চোখ কখন ভিজে উঠেছে সে নিজেও জানে না,,,,,,,,,
নদীড় পাড়ে নৌকার বেদে পল্লীতে আজ একটা উৎসব হচ্ছে। সবাই নাচ গান করছে, নদীর পাড়ে মানুষ যারা আসা যাওয়া করে তাদের কে সাপ খেলা দেখাচ্ছে, টাকা নিচ্ছে। বেদের মেয়েরা দলে দলে গ্রামের ভেতরে যাচ্ছে। পুরুষেরা যাচ্ছে গন্জে। গন্জের হাটবারে বেদে সম্প্রদায়ের একটু আয় রুজি ভালো হয়। হাটবারে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ গন্জে আসে। সবাইকে খেলা দেখাতে দেখাতে দুই পয়সা আয় হয়।
গ্রামের বেশিরভাগ ছেলে পুলে নদীর পাড়ে বেদে পল্লীতে আসে।তাদের সাপের খেলা দেখার চেয়ে বাইদানীদের অঙ্গভঙ্গি দেখতেই আগ্রহ বেশি। বেদে নারীদের আপাদমস্তক আবেদনময়ী। খাজ কাটা কোমড়ের দুই দিক আর বুকের এক পাশ এরা বুঝে শুনেই উন্মুক্ত রাখে। তারাও বোঝে মর্দ জাতি খেলা দেখতে না, তাদের দেখতে আসে।
বেদের মেয়ে মানসী সাপের বাচ্চা হাতে নিয়ে আঙুলের কারিশমায় দারুন খেলা দেখাতে পারে। তার বয়স কত সে নিজেও জানে না। আনুমানিক ২৫ হবে। তার বাবা মাও সঠিক বলতে পারে না। লেখাপড়া জানে না, হিসাব করে রাখে নাই। সে আজ নদীর পাড়েই খেলা দেখাচ্ছে, গ্রামের ভেতরে ঢোকে নি। তার বুকটা ভয়ে ঢিপ ঢিপ করে। আজ কয়দিন সে খেতে পারে না, খাবারের ঘ্রান নাকে আসলেই বমি বমি লাগে,,,,,,,,,,,,
উৎসব দিন শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হলো। বেদেরা সবাই যার যার নৌকার সংসারে ফিরেছে। মানসীর সংসারে আছে বাপ মা, বড় বোন আর বোনের স্বামী, বড় ভাই ভাবী আর তাদের একমাত্র মেয়ে।
বড় একটা নৌকার ভেতরে এরা সবাই জোড়ায় জোড়ায় কাপড় দিয়ে নিজেদের চারপাশে পর্দা দিয়ে ঘুমায়। মানসীর বড় বোনের নাম শশী।নতুন বিয়ে হয়েছে। স্বামী পেশায় মুচি। গন্জে জুতা সেলাই করে। তার সামর্থ্য হয় নি আলাদা নৌকা গড়ে সংসার পাতানোর। তাই বাপের নৌকাতেই স্বামী ঘর জামাই থাকে এখনও। মানসীর ভাই ভাবীর ও সামর্থ্য হয় নাই নিজেদের নৌকা গড়ে নেয়ার। তাই এরাও বাবা মায়ের নৌকাতেই থাকে।
সবাই যার যার মতো কাপড় দিয়ে ঢেকে শুয়ে পড়েছে। নৌকার এক কোনায় নিভু আলোয় একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়।
সেই আলোয় সবার কাপড়ের ভেতরে হালকা হালকা দেখা যায়। সবাই সবকিছু দেখতে পায়, শুনতে পায়, তবু চোখ কান বন্ধ করে শুয়ে থাকে। শশীর নতুন বিয়ে হয়েছে। তাই নতুন কালে প্রতিটি রাত তার আদরের রাত। তার কাপড়ের পর্দার ভেতর থেকে উহ্ আহ্ আওয়াজ আসে। এই আওয়াজে মানসী লজ্জায় ভেঙে পড়ে আর নিজের কামনায় অস্থির হয়ে যায়। সে বোঝে কেনো খেতে পারে না, কেনো বমি হয়, শুধু সে জানে না কার ফসল সে পেটে নিয়ে আছে। তার হিসাব নাই। এটা কি হিন্দু ব্রাক্ষ্মণ চাটুজ্যে বাড়ির রঞ্জু চাটুজ্যের নাকি মুসলিম মাতবর বাড়ির মেহেদী মাতবর এর। যখন যে দুইটা ভালোবাসার কথা বলেছে তার সাথেই আখ ক্ষেতে আর পাট ক্ষেতে সময় কাটিয়েছে, এমন ও হয়েছে একি দিনে সকালে একজন কে আর বিকেলে একজন কে সময় দিয়েছে।
দুজনের কাছেই যখন যা চেয়েছে, তাই পেয়েছে। টাকা পয়সা বা হালকা সোনার কিছু। রঞ্জুর বৌ বাচ্চা আছে। কিন্তু মেহেদী এখনও অবিবাহিত। মেহেদীর বাবা বর্তমানে এই গ্রামের মেম্বার। তারা ক্ষমতাবান। মেহেদী মাতবর এই বছর চেয়ারম্যান ইলেকশনে দাড়াবে। ফয়েজ চৌধুরীর সাথে তার ছিলো রাজনৈতিক দন্দ্ব। আর রঞ্জু চাটুজ্যের গন্জে একটা ছোটো খাটো ফার্মেসি আছে।
মানসীর ঘুম আসে না, নৌকা থেকে নেমে পাড়ে হাটাহাটি করছে। তাকে দেখে তাদের বেদে সর্দারের ছেলে শম্ভু এগিয়ে আসছে। বললো কিরে এইহানে খাড়াই আছোত কেন? মাঝে সাঝেই রাইতে দেহি তুই হাটাহাটি করোস, মেলা রাইত জাগনা থাকোস করোস টা কি ? মানসী বিরক্তির সুরে বলে শম্ভু দা জালাইও না, তোমার কামে যাও, তুমি বড়লোক মানুষ। নিজেই একলা একটা নৌকা লইয়া থাকতে পারো, আমরাতো পারি না, এক জায়গায় এতো মানুষ, ঘুম আহে না আমার।
শম্ভু বিচলিত হয়ে বললো আয় পূব দিকে খালের পাড়ে যাইয়া একটু বসি। মানসী হ্যা বা না কিছুই বলে না, তারা হাটছে।
নদীর পাড়ে পূব দিকে খালের মুখ গেছে গ্রামের দিকে। খাল পাড়ে ফয়েজ চৌধুরী নিজের তত্বাবধানে গ্রামের স্কুল পাশ করা কিশোর যুবক ছেলেদের নিয়ে কিছু ফুলের গাছ লাগিয়েছে। এক দিকে সারি সারি ইটের বেদি সাজিয়ে বসার জায়গা মতো করেছে। এই গ্রামে ঘুরতে যাবার কোনো জায়গা নেই। এখানে যেনো সবাই এসে বসতে পারে তাই এই ব্যবস্থা। জায়গাটা বড় ই সুন্দর। শম্ভু আর মানসী এসে এখানে বসেছে।
মানসী চিন্তার সুরে বললো "শম্ভু দা এইহানে মেলাক্ষন বওন যাইবো না, কেউ দেখলে বাজে কথা কইবো"
শম্ভু হেসে বললো "আমগো চৌদ্দ পুরুষ বাইদার জাত, বিষধর সাপ লইয়া আমগো জীবন, মানুষ ডরাইতে হইবো না রে পাগলী"
মানসী নিচু স্বরে বাকা হাসি দিয়ে বললো "ফয়েজ দা সবসময় কইতো মানুষ বড় বিষধর, আচ্ছা শম্ভু দা তুমি তো ফয়েজ দার আগে পিছে থাকতা, ফয়েজ দার কি হইসিলো তুমি আন্দাজ করতে পারো না??,,,
শম্ভু আক্ষেপের ভঙ্গিতে বললো " না পারি না, তুই তো মেলা রাইত জাগনা থাকোস, তুই কোনোদিন কিছু দেহোস নাই? পাড়ের চাইর দিকে উত্তর দক্ষিন পূর্ব পশ্চিম সবখানেই তো তুই রাইতে একলা একলা হাটোস, আমি খেয়াল করসি তুই মাঝে মাঝে অনেক রাইতে নৌকায় ফিরোস, কখনও কখনও মাঝ রাইতে বাইর হতি , এক দুই ঘণ্টা পরে ফিরতি, কৈ যাইতি?
মানসী ঝাঝিয়ে উঠে দাড়িয়ে গেলো, বললো "কি কইতে চাও তুমি শম্ভু দা, আমারে ফয়েজ চৌধুরীর মরনের সাক্ষী টাক্ষী বানাইয়া ঝামেলায় ফালাইতে চাও, দেহো আমি কিন্তু কোনো সময় কিছু দেহি নাই, তোমার বাপ তো সর্দার, এই নদীর পাড়ে কেউ কিছু করতে হইলে তোমার বাপের অগোচরে পারবো না, নিজের বাপরে যাইয়া জিগাও, এই কথা বলেই মানসী হড়বড় করে বমি করে দিলো,,,,,,
শম্ভু লাফ দিয়ে পাশ থেকে সড়ে গেলো, বললো এই কি অবস্থা,,, তোর তো বদহজম হইসেরে, যা ঘুমা,,,,,,,,
✍️ #Imi_Chowdhury
#ইমি_চৌধুরী
চলবে,,,,,,,,
পর্ব ৩
https://www.facebook.com/share/p/HisoTvLFLwUJzQBw/?mibextid=oFDknk
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।