ঝর্ণার কোলাহলে হারানো নিশ্বাস
️—রফিক আতা—
খৈয়াছড়া:—
জলপ্রপাতের কলতান, পর্বতের
আল্পনা ও সবুজের মায়াবী আহ্বান,
আ্যডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চকর
এক অনবদ্য সফরনামা
★★★
___________________১৩
ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। বাতাসে দুর্বোধ্য ভঙ্গিতে দুলছে পত্রপল্লব। সারা শরীরে ক্লান্তির আবরণ, ক্ষুধার তীব্রতা যেন প্রতিটি শিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা বসে আছি খৈয়াছড়ার পর্বতশৃঙ্গে—নীচের গভীর সবুজে লুকিয়ে থাকা ঝর্ণার কলকল ধ্বনি কানে আসছে, কিন্তু উৎসমুখ চোখে পড়ছে না।
—সাহেদ ভাই!
—বল বন্ধু!
—মনটা চাইছিলো ক্ষুদে বিজ্ঞানীর খাতায় নাম লিখে রাখি, কিন্তু এবারে তো সে সুযোগ আর হলো না।বললাম আমি।
সাহেদ ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—হুম…
তারপর দার্শনিক ভঙ্গিতে বললেন—
—শোন, ঝর্ণার উৎসমুখ নিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বহু গবেষণা হয়েছে। মূলত ঝর্ণার উৎস কয়েকভাবে হতে পারে। প্রথমত, ভূগর্ভস্থ জলাধার
—পাহাড়ের ভেতরে পাথরের স্তরে পানি জমে থাকে, যা চাপের কারণে ফেটে বের হয়। দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালে পাহাড়ের বুকের ভেতরে জমা হওয়া বৃষ্টির পানি, যা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে এবং সারা বছর প্রবাহ ধরে রাখে। তৃতীয়ত, তুষার বা বরফ গলন, যা আমাদের এলাকায় না হলেও পাহাড়ি ঝর্ণার বড় উৎস।
তারপর একটু থেমে যোগ করলেন—
—তবে খৈয়াছড়ার মতো এলাকায় বর্ষার পানি আর ভূগর্ভস্থ জলাধারের মিশ্রণই সম্ভবত প্রধান উৎস। কারণ খরার মৌসুমেও এখানে স্রোত থাকে, যা শুধু বৃষ্টির পানি হলে সম্ভব নয়। পাহাড়ের ভেতরের পাথরের স্তরগুলোতে ফাঁকা জায়গা থাকে, সেখানে পানি জমে থাকে এবং চাপ পেয়ে ফেটে বের হয়—যেমনটা কোরআনে বর্ণিত আছে।
আমি বললাম—
—মানে, পাথরের মধ্য দিয়েই উৎসমুখ হতে পারে?
তিনি মাথা নেড়ে বললেন—
—ঠিক তাই। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهَارُ
وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشَّقَّقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ
অর্থ: “পাথরের মধ্যেও কিছু রয়েছে, যা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয়। আর কিছু আছে যা ফেটে যায় এবং তা থেকে পানি বের হয়।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৭৪)
—এটি শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, ভূতত্ত্বগত দিক থেকেও সঠিক ব্যাখ্যা। কারণ পৃথিবীর অনেক ঝর্ণাই এমনভাবে গঠিত হয়।
আমি চুপচাপ শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল—ঝর্ণার গোপন উৎস আমরা চোখে না দেখলেও, তার রহস্য যেন শব্দ, ইতিহাস আর বিজ্ঞানের মিলনেই ধরা দিল।
★★★
___________________১৪
আমরা ইতি টানতে চলেছি এই নাতিদীর্ঘ ভ্রমণ—তবু মনে হচ্ছে যেন কাহিনিটা মাত্র শুরু। সবুজের মায়াবী আঁচল ছেড়ে যেতে মন একটুও রাজি নয়। তবুও সূর্যের সোনালি গোলকটি ধীরে ধীরে পাহাড়ের পেছনে হারিয়ে যাওয়ার আগে, আমাদের চাই এই নির্জন পর্বতারণ্য থেকে বেরিয়ে নীড়ে ফিরতে। পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখর থেকে ফেরার জন্য যখন পা বাড়ালাম, ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম—আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি!
যেদিকেই চোখ মেলি, সামনের দৃশ্য যেন একই—অগণিত পাহাড়, কুয়াশায় মোড়া নীলাভ শীর্ষ, আর একরাশ অচেনা গহীন শূন্যতা। যে পথ ধরে এসেছিলাম, তার কোন চিহ্ন নেই—যেন জ্বিনের মতো হঠাৎ মিলিয়ে গেছে। বাতাসে তখন এক অদ্ভুত শীতলতা, যা শুধু শরীর নয়, মনকেও শিরশির করে তুলছে। আমরা দিশাহীনভাবে পাথরের ওপর পা ফেলে এগোচ্ছি, আর পায়ের নিচে ভাঙা পাতার মচমচ শব্দ শূন্যতার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমরা এই পাহাড়ি ইন্দ্রজাল ও গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি। মনে হলো, যেন এক বোবা ভূত আমাদের পথ আটকে দিয়েছে—যে ভূতের না মুখ আছে, না ভাষা, শুধু অদ্ভুত এক মায়াজালে জড়িয়ে ধরে রাখছে। এদিকে আমাদের হাতে থাকা টিকিটে কোনো নাম্বার নেই, যা উদ্ধারকর্মীদের জানাতে পারি। পরিস্থিতি আরও আতঙ্কজনক হয়ে উঠছিলো।
সাহেদ ভাই তখন ক্রমাগত বলছিলেন—“দরুদপাঠ করো, আল্লাহই পথ দেখাবেন।” আমরা কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে, দুরুদুরু হৃদয়ে অবিরাম দরুদপাঠ করতে থাকলাম। হঠাৎ দূরে কোথাও থেকে মানুষের কোলাহল ভেসে এলো—যেন ঝড়ের রাতে হঠাৎ প্রদীপের আলো দেখা। হৃদয়ে একটু আশার আলো জ্বলে উঠল। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে সেই আওয়াজ অনুসরণ করে সাবধানে এগোতে লাগলাম।
তবে সামনে যতই এগোচ্ছি, পথ ততই দুর্বোধ্য হয়ে উঠছিলো। কিছু দূর পথ চলার পর এক পাহাড়ের ঢালে আমরা কয়েকজন পর্যটককে দেখতে পেলাম। কিন্তু মাঝখানে ছিল এক গভীর উপত্যকা—যেন নীল ধোঁয়ার পর্দায় ঢাকা ভয়াল খাদ। নিচে তাকাতেই মাথা ঘুরে উঠল; এমন গভীরতা যে, কোনো ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শরীরের পক্ষে তা পাড়ি দেওয়া অবাস্তব। হাল ছেড়ে দিয়ে আমরা আবারও হারানো পুরোনো পথ খুঁজতে লাগলাম।
★★★
___________________১৫
এক পর্যায়ে গিয়ে আমি আটকে পড়লাম এক মহা বিপদের মুখে—একটি খাড়া ও ভয়াল খাদঘেরা স্থানে। আমি নিচে, আর সাহেদ ভাই উপরে। হাত রাখার জায়গা সামান্য, পা রাখার ঠাঁই আরও কম, যেন সামান্য অসতর্কতাতেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠল সাদা কাফন ও শ্বাশ্বত কফিনের ছবি। এখান থেকে গড়িয়ে পড়লে তা হবে নিশ্চিত মৃত্যু।
অনুভব করছিলাম, ধীরে ধীরে হাত ও পায়ের নিচ থেকে শিকড়হীন মাটি সরে যাচ্ছে। নিচে তাকাতেই বুক হিম হয়ে গেল—এক গভীর অতল খাদ, যার শেষ দেখা যায় না। সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠল। বুঝলাম, চিৎকার বা অস্থিরতায় কোনো লাভ নেই; এই সময়ে কেবল আল্লাহর স্মরণ আর ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করাই একমাত্র পথ। আমি কালিমা, দরুদ ও দোয়া পাঠ করতে করতে কেঁপে ওঠা গলায় সাহেদ ভাইকে বললাম—
“ভাইয়া, দ্রুত কিছু করুন! আমি পড়ে যাচ্ছি… পায়ের নিচে ভর নেই!”
সাহেদ ভাই এক মুহূর্ত দেরি না করে উপরের একটি শক্ত বৃক্ষের শিকড় আঁকড়ে ধরলেন, তারপর নিজের এক পা নিচে ঝুলিয়ে দিলেন। আমি মরিয়া হয়ে সেই পা শক্ত করে ধরলাম, আর তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে টেনে তুললেন। সেই মুহূর্তে আমি কাছের একটি শক্ত শিকড়ে হাত পেয়ে প্রাণপণে ধরে ফেললাম। সেখানেই থমকে দাঁড়ালাম, বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন পৃথিবীর সব শব্দ ঢেকে ফেলল।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতায় মনে হলো—ঝর্ণার কলকল ধ্বনি, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক, এমনকি মহাকাশে ঘূর্ণমান শুভ্র নীহারিকাও থেমে গেছে। মৃত্যুর একেবারে দোরগোড়া থেকে ফিরে এসে চোখ ভিজে গেল প্রভুর শুকরিয়ায়।
আমরা তখন প্রতিজ্ঞা করলাম—যদি এই পাহাড়ি গোলকধাঁধা ও মায়াজাল থেকে মুক্তি পাই, তবে প্রভুর তরে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করব।
তারপর ধীরে ধীরে আবার পথে পা বাড়ালাম। পাহাড়ি কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে হঠাৎ করেই সামনে দেখা মিলল এক চেনা বাঁকের—যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর প্রথম সূর্যের আলো। সেখানে দাঁড়িয়ে দূর থেকে ভেসে এলো পরিচিত সাইরেনের সুর, যার সঙ্গে মিশে আছে প্রসবণের কলকল, ঝরনার লহরি, আর পাখির ডানার শব্দ। প্রতিটি ধ্বনি যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—“তোমরা বেঁচে গেছো।”
আমরা দম ছেড়ে বসলাম। হৃদয়ে তখন শুধু একটাই অনুভূতি—মুক্তি, স্বস্তি, আর অশেষ কৃতজ্ঞতা সেই প্রভুর প্রতি, যিনি আমাদের এই মৃত্যুপুরি থেকে উদ্ধার করলেন।
★★★
___________________১৬
সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমের আকাশে গাঢ় কমলা রঙ মেখে দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ি পথের আঁকাবাঁকা সিঁড়ি বেয়ে আমরা ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম। সারাদিনের অভিযানের ক্লান্তি যেন শরীরকে শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলেছে, তবুও মন এখনও ঝর্ণার স্রোতে ভাসছে। পথের দুপাশে কুয়াশা জমতে শুরু করেছে, বাতাসে এসেছে শীতল ছোঁয়া। সেই বাতাসে মিশে আছে পাহাড়ি ফুলের মিষ্টি গন্ধ, যা বারবার পেছনে তাকাতে বাধ্য করে—যেন বিদায় নিতে মন চাইছে না।
ঝর্ণার কলকল ধ্বনি ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর অজানা পাখির কণ্ঠ। প্রতিটি পা ফেলতে ফেলতে মনে হচ্ছে, এই পথ শুধু আমাদের মাদ্রাসায় ফেরার নয়, বরং নিজের ভেতরের নীরবতায় ফিরে যাওয়ারও। দিনের আলো কমে আসছে, কিন্তু অন্তরের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
সফরের প্রতিটি মুহূর্ত মনে গেঁথে আছে—দুর্গম পথের দুরন্ত চ্যালেঞ্জ, অদৃশ্য উৎসের রহস্য, হারিয়ে যাওয়া পথ, মৃত্যুপুরি আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। ক্লান্ত শরীরেও মন ভরে আছে এক ধরনের প্রশান্তিতে।
যখন পাহাড়ের ঢালে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে আমরা নিচের সবুজ বিস্তারের দিকে তাকালাম, মনে হলো—যত দূরেই যাই না কেন, এই স্মৃতি, এই শ্বাস, এই জলধ্বনি আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকবে। ফেরার পথ তাই শেষ নয়; এটি কেবল নতুন কোনো অভিযানের, নতুন কোনো স্বপ্নের সূচনা।
সমাপ্ত___________
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।