#তুমি অনিবার্য
Part - 3
বটতলার চাতাল থেকে ফিরে আসার পর ঈশান এবং মেহুর মন দুটি ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছিল, যদিও দুজনের মাঝেই ছিল এক নিগূঢ় 'আক্ষেপ'। সন্ধ্যা তখন তার 'কৃষ্ণচূড়ার রাগিণী' শেষ করে রাতের 'অন্ধকার-সঞ্চারিণী' নীরবতা নিয়ে এসেছে।
_______
মেহুর বাড়িটি ছিল ‘স্বচ্ছল-আভিজাত্যের’ প্রতীক। চন্দন কাঠের আসবাব আর বারান্দার সবুজ গাছপালা এক 'শান্ত-স্নিগ্ধ' পরিবেশ তৈরি করেছিল। কিন্তু আজ মেহুর মনে সেই 'নিরাবেগ শান্ততা' ছিল না। রাতের আহারের পর সে তার মায়ের পাশে বসেছিল এক নিবিষ্ট গৃহকোণ।
"মেহু, ঈশানের কথা ভাবছিলাম," তার মা, রুবাইয়া আজিজ, কাপড় ভাজ করতে করতে বললেন।
- "ছেলেটা আজকাল বড্ড 'উদাসীন' থাকে। ওর চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় কিছু একটা ওকে 'অভ্যন্তরীণ'ভাবে পীড়া দিচ্ছে।"
মেহু যেন বিদ্যুতের স্পর্শ পেল। মায়ের মুখে ঈশানের নাম শুনেই তার হৃদয়ে একটি 'অপ্রত্যাশিত' স্পন্দন অনুভূত হলো। সে তৎক্ষণাৎ তার অনুভূতিকে 'নিরসন' করার চেষ্টা করল। - -"ও সবসময়ই তো একটু বেশি দার্শনিক। ওর দর্শনই ওকে পীড়া দেয়, মা। আর কিছু নয়।"
-"শুধু দর্শন নয়, মেহু। তোর জন্য ওর একটা গভীর টান আছে। আমরা সবাই দেখি। তোদের বন্ধুত্বটা একটা 'দুর্বোধ্য' বাঁধনে বাঁধা। যদিও আমি জানি তোরা এটাকে বন্ধুত্বের ঊর্ধ্বে কিছু ভাবতে নারাজ, তবুও..." রুবাইয়া আজিজ হেসে উঠলেন।
মা'র এই সরল স্বীকারোক্তি মেহুকে হঠাৎ করে এক 'দারুণ-সংকটে' ফেলে দিল। সে তো এই সত্যটাকেই গত কয়েক বছর ধরে 'অস্বীকার' করে আসছে! সে উঠে বারান্দার দিকে গেল। আকাশে চাঁদ তখন এক 'একাকী প্রদীপের' মতো জ্বলছে।
মেহুর মনে তখন শুরু হয়েছে এক 'নিঃশব্দ-বিপ্লব'। ঈশানকে সে কী চোখে দেখে? সে কি শুধুই বন্ধু? যখন অর্ণব তাকে তির্যক কথা বলেছিল, ঈশানের পাশে দাঁড়ানোটা কি শুধু বন্ধুর প্রতি আনুগত্য ছিল? নাকি ঈশানকে হারানোর এক 'গোপন-আশঙ্কা'? বটতলায় বসে ঈশানের সেই 'দুর্ভাবনামূলক' চোখ, তার স্পর্শে ঈশানের হাতে জেগে ওঠা সেই 'দৃঢ়-প্রত্যয়'—এগুলো কি কেবলই বন্ধুত্বের প্রতীক?
হঠাৎ মেহু অনুভব করল, ঈশানকে ছাড়া তার জীবনের সব 'সুসংহত' পরিকল্পনাগুলো অর্থহীন হয়ে যায়। ঈশান তার জীবনে শুধু 'উপস্থিতি' নয়, বরং তার 'অস্তিত্বের প্রতিভূ'। এই ভাবনা আসতেই তার সমস্ত শরীর যেন কেঁপে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ নিজেকে বোঝাল: না, এইটা ভালোবাসা নয়। এটা অভ্যাস। এটা নির্ভরতা। এই গভীর, 'অবিচ্ছেদ্য' বন্ধনটা হলো 'নিঃশর্ত-স্নেহ', প্রেম নয়। প্রেম হলো 'অস্থিরতা', আর তাদের সম্পর্ক হলো 'স্থির-আলো'। এই 'আত্ম-প্রবঞ্চনা'য় সে নিজেকে যেন আরও বেশি করে জড়িয়ে ফেলল। সে নিজেকে দৃঢ়ভাবে বলল, "আমি এই আবেগকে 'স্থানচ্যুত' করব। আমার সম্পর্কটা 'অনন্য', একে 'সাধারণীকৃত' হতে দেব না।" কিন্তু এই 'প্রতিজ্ঞা'র আড়ালে এক 'নিগূঢ়-বাসনা' ফিসফিস করে উঠল, যা তাকে এই প্রথম ভয় দেখাল সে কি তবে সত্যিই ঈশানকে ভালোবাসতে শুরু করেছে? এই 'অপ্রিয়-স্বীকারোক্তি'কে মেহু জোর করে তার মনের এক 'নিভৃত-অন্ধকারে' ঠেলে দিল।
___
অন্যদিকে, ঈশান তার চিলেকোঠার ঘরে বসেছিল। তার ঘরটি ছিল 'আলো-আঁধারি'র এক চমৎকার মিশ্রণ পুরোনো বই, কিছু স্কেচ খাতা আর এককোণে রাখা একটি 'জ্যোতির্বীক্ষণিক' টেলিস্কোপ। তার বাবা-মা কাজের সূত্রে রাতে ফেরেন, তাই বাড়ির এই অংশটা ছিল তার একান্ত 'চিন্তাক্ষেত্র'।
ঈশান জানলার বাইরে তাকালো। তার মুখে তখন চাঁদের আলো এসে পড়েছে। এই 'চন্দ্রালোকিত প্রতিচ্ছবি'তে তার চেহারার 'অপরূপা ঔজ্জ্বল্য' আরও বেশি করে প্রকাশ পাচ্ছিল। তার 'প্রশান্ত-গভীর' চোখগুলো ছিল এই মুহূর্তে সামান্য অশ্রুসিক্ত, যেন তার মনের সমস্ত 'গোপন-ব্যথা' ঐ দুই চোখের 'উপাসনা-ভঙ্গিমা'য় মূর্ত হয়ে উঠেছে। তার 'সুঠাম' চিবুক এবং 'সংবেদনশীল' ঠোঁটজোড়া তার ভেতরের 'অবিরল কাব্যিকতা'র সাক্ষ্য দিচ্ছিল। তার এই 'স্নিগ্ধ-বিষাদময়' রূপটি ছিল এমন যে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সে যেন কোনো 'অসীম-অধীরতা' নিয়ে কারোর আগমন প্রতীক্ষা করছে।
আজকের কথোপকথন তাকে সেই 'আদিম-মুহূর্তে' ফিরিয়ে নিয়ে গেল, যেদিন তার বন্ধুত্ব প্রেমে রূপান্তরিত হয়েছিল।
স্মৃতি...
সেদিন ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরের দিন। মেহু ঈশানের বাড়িতে এসে হাউহাউ করে কেঁদেছিল। সে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চেয়েছিল, কিন্তু নম্বরের অভাবে তার প্রিয় বিষয়ে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। মেহু তখন মেঝেতে বসে কাঁদছিল, তার সমস্ত 'নিটোল স্বপ্ন' ভেঙে চুরমার। ঈশান সেদিন তার পাশে বসেছিল, তার মাথায় হাত রেখেছিল, আর একটিও সান্ত্বনার কথা বলেনি। শুধু নীরবতার 'অতলস্পর্শী' ভাষা দিয়ে মেহুকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, সে তার পাশে আছে। মেহু যখন ধীরে ধীরে শান্ত হলো, সে ঈশানের দিকে তাকালো সেই চাহনিতে ছিল এক 'অকপট আত্মসমর্পণ'।
সেই মুহূর্তে ঈশান উপলব্ধি করেছিল, মেহু কেবল তার বন্ধু নয়। মেহুর কষ্ট তার নিজের কষ্টের চেয়েও বেশি 'তীব্রতা' নিয়ে তাকে আঘাত করেছিল। ঐ 'নিশ্চুপ-ক্রন্দনে'র সময়ে, ঈশানের হৃদয়ের 'সুরক্ষিত-আবাসন'-এ প্রেম এক 'নীরব-প্রবেশাধিকার' লাভ করেছিল। সে বুঝেছিল, সে মেহুকে তার সমস্ত 'অসম্পূর্ণতা' ও 'বিফলতা' সহ ভালোবাসে—এক 'নিঃশর্ত-অনুষঙ্গ'।
আজকের মতো চাঁদনী রাতে সেই স্মৃতি তার মনে আবার 'প্রস্ফুটিত' হলো। মেহুকে সে কেন ভালোবাসে? এই প্রশ্নটা আজ আর 'অপ্রাসঙ্গিক' নয়। সে ভালোবাসে কারণ মেহু হলো সেই 'একমাত্র-আশ্রয়', যেখানে তার 'নিঃসঙ্গ-স্বভাব' এক 'অন্তর্নিহিত-স্থিতি' খুঁজে পায়। তার ভালোবাসা কোনো 'মোহ-মায়া' নয়, বরং জীবনের এক 'বাস্তব-উপলব্ধি'।
ঈশান তখন তার স্কেচ খাতাটি খুলল। পাতা উল্টাতেই দেখা গেল একটি পুরোনো স্কেচ—মেহুর মুখ। তার 'আবেগহীন' চোখেও যেন এক 'উষ্ণ-আর্দ্রতা' ফুটে উঠেছে। সে ভাবল: কাল সকালে লাইব্রেরিতে যাব।আমার কাজ হলো তার বইগুলো সাজানো, আর আমার কাজ হলো আমার হৃদয়ের এই 'অনুলিখিত-ইতিহাস'টি চিরকাল গোপন রাখা।
হঠাৎ তার মনে পড়ল অর্ণবের কথা—'যা অনিবার্য, তা একদিন আসবেই।' ঈশান এক 'অজ্ঞাত-শিহরণে' কেঁপে উঠল। তার এই অব্যক্ত প্রেমটি কি তবে সত্যিই মেহুর 'অস্বীকৃতি'র দেওয়াল ভেঙে একদিন বেরিয়ে আসবে? আর সেদিন কি তাদের সম্পর্কটা টিকে থাকবে?
ঈশান স্থির করল, কালকের দিনটা হবে 'পরীক্ষা-নিরীক্ষার'। সে দেখবে, মেহুর 'অটল-বিশ্বাস' কতটা গভীর। সে এমন কিছু করবে, যা বন্ধুত্ব এবং প্রেমের 'সীমারেখা'কে আরও ঝাপসা করে তুলবে। কারণ তার মনে আজ কেবল একটাই কথা ঘুরছে: এই নীরবতা আর 'আত্ম-গোপন' তাকে বেশিদিন শান্তি দেবে না। 'অনিবার্য'কে হয়তো সত্যিই আর ঠেকানো যাবে না।
চলবে....??
[Do not copy]
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।