তোর বাম হাতে ব্যথা তো?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
স্মৃতিচারণ | ৯ অক্টোবর ২০২৬
“তুই ডান হাত দিয়ে টিপ, তোর বাম হাতে ব্যথা তো!”
বাবা কথাটা বলেছিলেন ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর দুপুরে।
আমি তখন তাঁর মাথা টিপে দিচ্ছি। তিনি খিদমা হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে। কয়েক দিন ধরে জ্বর, শরীর দুর্বল। ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। তার সঙ্গে তীব্র হার্ট অ্যাটাক।
তবু আমার বাম হাতের ব্যথাটা তাঁর মনে আছে।
আমি তাঁর মাথা টিপছিলাম। বাবা চোখ বন্ধ করে ছিলেন। হঠাৎ কথাটা বললেন এমনভাবে, যেন অসুস্থ মানুষটি তিনি নন, বরং আমার শরীরটাই তাঁর চিন্তার বিষয়।
সেদিন আমি জানতাম না, এটাই হবে বাবার সঙ্গে আমার শেষ স্বাভাবিক কথাগুলোর একটি।
বাবার অসুস্থতার শুরু ২২ অক্টোবর।
সন্ধ্যার দিকে খবর পেলাম, বাবার প্রচণ্ড জ্বর। ছুটে গেলাম তাঁর বাসায়। গেস্ট রুমের ছোট খাটটিতে বাবা শুয়ে ছিলেন। কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখতেই হাত সরিয়ে নিতে ইচ্ছে হলো। শরীর জ্বরে পুড়ছে। হাত-পায়ে ব্যথা।
বাবা আগে থেকেই স্ট্রোকের রোগী ছিলেন। বয়সও হয়েছিল। কিন্তু সেদিন তাঁকে দেখে মনে হলো, এই জ্বরটা যেন একসঙ্গে তাঁর শরীরের সব শক্তি টেনে নিয়েছে।
রক্তের নমুনা নেওয়া হলো। রাতের দিকে এলাকার ডাক্তার এসে রিপোর্ট দেখে বললেন, “তাকে হাসপাতালে ভর্তি করুন।”
বাবা রাজি হলেন না।
তিনি তখনও নিজের মতো করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিলেন। আমাকে দেখে হয়তো বুঝতে দিতে চাইছিলেন না যে তিনি কতটা অসুস্থ।
রাত এগারোটার দিকে আমি বাসায় ফিরে এলাম।
সারারাত ঘুম হলো না।
ফজরের নামাজের পর একটু চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম ভেঙে আবার বাবার কাছে গেলাম।
তখন বাবা অস্বাভাবিক কথা বলছেন। স্যালাইন চলছে। কখনো হাতের স্যালাইন খুলে ফেলছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি ঠিকমতো বুঝতেই পারছেন না কোথায় আছেন।
রিপোর্ট তখন হাতে।
আর অপেক্ষা করিনি।
দুপুরে অ্যাম্বুলেন্স এলো। বাবাকে হুইলচেয়ারে বসানো হলো। সাততলা থেকে নামাতে চারজন মানুষ লাগল।
সিঁড়ি দিয়ে বাবাকে নামানো হচ্ছে।
সেদিন কেউ জানত না, এই সাততলা দিয়ে তাঁর আর কখনো ওপরে ওঠা হবে না।
সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। শুক্রবার হওয়ায় রাস্তাও ফাঁকা ছিল। দ্রুত পৌঁছে গেলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা দ্রুত হলো না। হার্ট বা স্ট্রোকের ডাক্তারও পাওয়া গেল না।
বাবাকে নিয়ে আবার বের হলাম।
এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল।
এক জায়গায় আইসিইউ বেড নেই। শেষ পর্যন্ত মগবাজারের একটি হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারলাম। হাসপাতালের পরিচালক আমার বন্ধু ছিলেন। তাঁর সহযোগিতায় বাবার চিকিৎসা শুরু হলো।
সেই রাত, পরের দিন, তারপর আরও একটি দিন—হাসপাতালের কেবিন, আইসিইউ, রিপোর্ট, প্লাটিলেট, প্লাজমা—সবকিছু একসঙ্গে চলতে থাকল।
বাবার প্লাটিলেট কমে গিয়েছিল। প্লাজমা দিতে হলো। ছোট ভাই ডোনার আনতে ছুটল।
কিছু সময় বাবাকে ভালোও মনে হয়েছিল।
অসুস্থ মানুষের সামান্য ভালো থাকাকেও তখন বড় আশা মনে হয়।
২৫ অক্টোবর তাঁকে বাসার কাছের খিদমা হাসপাতালে নিয়ে এলাম। সেদিন বাবা কিছুটা স্বাভাবিক ছিলেন।
পরদিন দুপুরে তাঁর পাশে আমি একা।
“মাথাটা একটু টিপে দে।”
আমি তাঁর মাথা টিপছিলাম।
তারপর সেই কথাটা—
“তুই ডান হাত দিয়ে টিপ, তোর বাম হাতে ব্যথা তো!”
আমি আর কিছু বলিনি।
হয়তো বাবাও আর কিছু বলতে চাননি।
এই কথাটার মধ্যে কোনো বিদায় ছিল না। কোনো শেষ কথা ছিল না। কেউ জানত না, কয়েক ঘণ্টা পর আমাদের সামনে কী অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর ছোট ভাই এলো। আমি মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে বাসায় গেলাম। ওর টেস্ট পরীক্ষা চলছিল।
বাসায় ঢোকার পরপরই ফোন।
বাবার পেট ফুলে গেছে।
জ্বর বেড়েছে।
শ্বাস নিতে পারছেন না।
আবার হাসপাতালে গেলাম।
বাবাকে দেখে মনে হলো, এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। ডাক্তার বললেন, “অবিলম্বে আইসিইউতে নিতে হবে।”
অ্যাম্বুলেন্সে করে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
সেখানেও আইসিইউ বেড নেই।
অনেক অনুরোধের পর একটা বেড পাওয়া গেল। ৭ নম্বর।
বাবাকে আইসিইউতে নেওয়া হলো।
ভেতরে ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন। বাইরে আমরা।
কিছুক্ষণ পর একজন ডাক্তার এসে বললেন, “খুব দেরি হয়ে গেছে। এখন একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই পারেন কিছু করতে।”
রাত একটা পর্যন্ত বাবার পাশে ছিলাম।
তিনি বারবার পানি চাইছিলেন।
আমি পানি দিচ্ছিলাম।
তিনি আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখছিলেন।
এইটুকুই।
কোনো বড় কথা হয়নি।
কোনো বিদায়ও হয়নি।
শুধু বাবার হাতটা আমার হাতে ছিল।
তারপর শরীরটা দুর্বল লাগায় বাসায় ফিরে এলাম।
সকাল আটটার দিকে ছোট ভাই ফোন করল।
“ডাক্তাররা লাইফসাপোর্ট দিতে চাচ্ছেন, তুমি অনুমতি দেবে?”
আমি জানতাম, আর কোনো পথ নেই।
বললাম, “দাও।”
হাসপাতালে গিয়ে দেখি, বাবা যন্ত্রের নলের নিচে শুয়ে আছেন।
চোখেমুখে অদ্ভুত শান্তি।
দুপুর পর্যন্ত ছিলাম। মেয়ের পরীক্ষা ছিল। তাই বাসায় ফিরতে হলো।
ভাবলাম, বিকেলে আবার যাব।
কিছু কিছু “আবার” আর আসে না।
বিকেলের দিকে ফোন এলো।
“তুমি হাসপাতালে যেও না। বাসায় এসো। বাবা আর নেই।”
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনলাম।
নিচে নেমে গেলাম।
বাবা ফিরেছেন।
কয়েক দিন ধরে যাঁকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটেছি, তিনি এবার নিজের বাসায় ফিরলেন।
চোখ বন্ধ।
মুখে শান্তি।
দেখে মনে হচ্ছিল, বাবা ঘুমিয়ে আছেন।
কিন্তু ডাকলেও আর চোখ খুলবেন না।
আমি কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মনে পড়ছিল, কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি বলেছিলেন,
“তুই ডান হাত দিয়ে টিপ, তোর বাম হাতে ব্যথা তো!”
বাবার শেষ কথাগুলোর মধ্যে আমার নিজের জন্য তাঁর সেই চিন্তাটুকু রয়ে গেল।
তিনি তখন নিজের শরীরের সঙ্গে লড়ছিলেন।
তবু আমার বাম হাতের ব্যথাটা ভুলে যাননি।
বাবারা বোধহয় এভাবেই থেকে যান।
চলে যাওয়ার পরও।
কোনো বড় কথায় নয়।
একটা সাধারণ বাক্যে।
একটা হাতের মুঠোয়।
অথবা এমন কোনো দুপুরে, যখন হঠাৎ মনে পড়ে যায়,
কেউ একজন একদিন নিজের অসহ্য কষ্টের মধ্যেও বলেছিল,
“তোর বাম হাতে ব্যথা তো?”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।