বাবার শেষ ক’টা দিনের কথা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরণঃ স্মৃতিচারণ
পোস্টের তারিখঃ ০৯-১০-২০২৫
২০২২ সালের ২২ অক্টোবর।
হঠাৎ খবর পেলাম—বাবার প্রচণ্ড জ্বর। সন্ধ্যার দিকে দৌড়ে গেলাম বাবার বাসায়। গেস্ট রুমের ছোট খাটটিতে বাবা শুয়ে আছেন। পাশে গিয়ে বসে বাবার কপালে হাত রাখলাম—হাতের মধ্যে যেন জ্বলে উঠলো আগুনের তাপ। শরীরে প্রবল জ্বর, হাত-পায়ে ব্যথা।
আমার বাবা এমনিতেই স্ট্রোকের রোগী। তার উপর এই জ্বর যেন শরীরের সমস্ত শক্তি কেড়ে নিয়েছে।
রাত আটটার দিকে প্যাথলজির স্যাম্পল কালেকশন ম্যান এসে রক্তের নমুনা নিয়ে গেলেন।
রাত দশটার দিকে বাবা উঠে বসেন। আমাকে দেখে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন প্রাণপণে।
রাত দশটা দশে এলাকার ডাক্তার এলেন। রিপোর্ট দেখে বললেন—“তাকে হাসপাতালে ভর্তি করুন।”
কিন্তু বাবা একদম রাজি নন।
ডাক্তার বললেন, “ঠিক আছে, সকালে স্যালাইন দিন, রিপোর্টগুলো দেখাবেন।”
রাত এগারোটার দিকে আমি বাসায় ফিরে এলাম।
চিন্তায় ভরে গেল মাথা। সারারাত ঘুম এল না। ফজরের নামাজের পর একটু চোখ লেগে এলো।
ঘুম ভেঙেই ছুটে গেলাম বাবার কাছে। দেখলাম স্যালাইন চলছে, কিন্তু বাবা অজ্ঞান অজ্ঞান ভাব, আবোল-তাবোল বকছেন। কখনো বা হাতের স্যালাইন খুলে ফেলছেন।
রিপোর্ট এসেছে—বাবার ডেঙ্গু জ্বর এবং সঙ্গে তীব্র হার্ট অ্যাটাক।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম—আর নয়, এবার হাসপাতালে নিতে হবে।
দুপুর দুইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলো। বাবাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে চারজন ধরে সাততলা থেকে নামানো হলো। কে জানতো—এটাই হবে তাঁর জীবনের শেষবার বাসা থেকে বের হওয়া।
অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে সরকারি হাসপাতালে। সেদিন শুক্রবার, রাস্তাও ফাঁকা।
কয়েক মিনিটেই পৌঁছে গেলাম।
কিন্তু সরকারি চিকিৎসা—তা তো সবারই জানা। দ্রুত কোনো ব্যবস্থা হলো না। হার্ট বা স্ট্রোকের ডাক্তারও নেই। প্রতিটি মুহূর্তই বাবার জন্য অমূল্য, অথচ সময় যেন থেমে আছে।
বাধ্য হয়ে আবার বেসরকারি হাসপাতালে ছুটলাম।
কিন্তু সেখানে আইসিইউ বেড ফাঁকা নেই।
শেষে মগবাজারের এক হাসপাতালের পরিচালক—আমার বন্ধু। ওর মাধ্যমে বাবাকে ভর্তি করাতে পারলাম।
আইসিইউ-তে শুরু হলো বাবার চিকিৎসা।
রাত এগারোটার দিকে আমার শরীর খারাপ লাগায় বাসায় ফিরে এলাম।
বাবা তখনো ভেন্টিলেশনে যাননি—ডাক্তাররা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
পরদিন সকালে গিয়ে শুনলাম—রক্তের প্লাটিলেট কমে গেছে, আজই প্লাজমা দিতে হবে।
ছোট ভাই ছুটে গেল ডোনার আনতে।
বাবাকে কেবিনে আনা হলো, রক্ত দেওয়া শুরু হলো। সেদিন বাবা কিছুটা ভালো। তবু জ্বরটা ছাড়ছে না।
২৪ অক্টোবর আরেক ব্যাগ প্লাজমা দিতে হলো। ২৫ অক্টোবর সকলে মিলে ঠিক করলাম—বাবাকে বাসার কাছের খিদমা হাসপাতালে নিয়ে যাই।
সেখানে ভর্তি করানো হলো। সেদিন কিছুটা স্বাভাবিক ছিলেন বাবা।
কিন্তু রাতের দিকে আবার জ্বর এল।
২৬ অক্টোবর সকালেও অবস্থা অপরিবর্তিত।
দুপুরে আমি একা বাবার পাশে। বাবা বললেন, “মাথাটা একটু টিপে দে।”
আমি তাঁর মাথা টিপে দিচ্ছিলাম।
হঠাৎ বললেন, “তুই ডান হাত দিয়ে টিপ, তোর বাম হাতে ব্যথা তো!”
হার্ট অ্যাটাকের পর আমার হাতের কষ্টটাও বাবার মনে ছিল—এত অসুস্থ হয়েও তিনি তা ভুলেননি।
কিছুক্ষণ পর ছোট ভাই এল। আমি মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে বাসায় গেলাম। ওর টেস্ট পরীক্ষা চলছিল।
আমি বাসায় ঢুকতেই ফোন এল—বাবার পেট ফুলে গেছে, জ্বর বেড়েছে, শ্বাস নিতে পারছেন না।
দৌড়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেখি—বাবা তীব্র কষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন।
ডাক্তার বললেন—“অবিলম্বে আইসিইউতে নিতে হবে।”
অ্যাম্বুলেন্সে করে মুগদা হাসপাতালে ছুটলাম। কিন্তু আইসিইউতে কোনো বেড খালি নেই।
অবশেষে প্রচেষ্টায়, সুপারিশে, প্রায় আধঘণ্টার লড়াই শেষে একটি রিজার্ভ বেড পেলাম—৭ নম্বর।
বাবাকে নেওয়া হলো আইসিইউতে।
ডাক্তাররা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।
ডাক্তার একবার মাথা নেড়ে বললেন—“খুব দেরি হয়ে গেছে। এখন একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই পারেন কিছু করতে।”
রাত একটা পর্যন্ত বাবার হাত ধরে বসেছিলাম।
তিনি বারবার পানি চাইছিলেন, হাত শক্ত করে ধরে রাখছিলেন।
তারপর শরীরটা কেমন দুর্বল লাগায় আমি বাসায় ফিরলাম।
সকাল আটটার দিকে ছোট ভাই ফোন করে বলল—“ডাক্তাররা লাইফসাপোর্ট দিতে চাচ্ছেন, তুমি অনুমতি দেবে?”
আমি জানতাম, আর কোনো উপায় নেই—বললাম, “দাও।”
হাসপাতালে গিয়ে দেখি, বাবার নিথর দেহ শুয়ে আছে যন্ত্রের নলের নিচে। চোখে মুখে যেন নিঃশেষ শান্তি।
দুপুর পর্যন্ত থাকলাম, মেয়ের পরীক্ষার জন্য ফিরতে হলো। ভাবলাম বিকেলে আবার হাসপাতালে যাবো।
কিন্তু বিকেল গড়াতেই ফোন এল,
“তুমি হাসপাতালে যেও না, বাসায় এসো। বাবা আর নেই।”
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজল। আমি নীচে নেমে গেলাম।
দেখলাম—বাবা ফিরেছেন।
চোখ বন্ধ, মুখে প্রশান্তি, যেন দীর্ঘ ক্লান্তির পর গভীর ঘুমে আছেন।
শুধু প্রাণটা নেই তাঁর দেহে।
চোখের সামনে আমার বাবা, অথচ তিনি আর নেই…
#স্মৃতিচারণ #বাবা #হারানোরবেদনা #জীবনেরগল্প #বাংলাসাহিত্য #MohammadJahidHossain #EmotionalWriting
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।