" আহান ভাইয়া আমাকে বললো, তোর মত একটা কালো মেয়েকে আমি ভালোবাসবো এটা তুই ভাবলি কি করে" ?
কখনও নিজেকে আয়নায় দেখেছিস? যদি না দেখে থাকিস তাহলে দেখে নিস। তুই আমাকে ভালোবাসিস এটাই আমার জন্য লজ্জার।
তোর সাথে আমার যায়না৷ তোর লেভেলের কাউকে খুজে নিস। যেখানে তোকে দেখলেই আমার ভালো লাগেনা সেখানে তুই এসে আমায় ভালোবাসার কথা বলছিস৷ এটা যদি ভার্সিটির সবাই জানে তখন আমার মান- সম্মানের কি হবে ভেবে দেখেছিস।
আমাকে এখন পর্যন্ত যতগুলো মেয়ে প্রপোজ করেছে তারা যেমন সুন্দরি তেমন স্মার্ট ছিলো। কিন্তু তোর মাঝে এর কোনটাই নেই। সো, আজকের পর আর আমাকে এসব বলবিনা৷
" আহান ভাইয়ের কথা শুনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি আর চোখের পানি ফেলছি। মাথা নিচু রেখেই ভাইয়াকে বললাম, যদি আমি ফর্সা হতাম তাহলে কি তুমি আমাকে ভালোবাসতে " ?
আমার এরকম কথা শুনে আহান ভাইয়া কিছু বলছেনা৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর বললো, তখন ভেবে দেখতাম।
- আমি দেখতে কালো এটা কি আমার দোষ ?
- দেখ তোর এরকম ফা'ল'তু কথা শোনার ইচ্ছে বা সময় কোনটাই আমার নেই। তুই যা তো এখান থেকে।
" চোখের পানি যেনো বাঁধ মানছে না। ঠিকভাবে কথাও বলতে পারছিনা৷ চোখের পানি মুছে আহান ভাইয়াকে বললাম, আমি ভার্সিটিতে দেখি তুমি কিভাবে মেয়েদের সাথে আড্ডা দাও৷ হেসে হেসে কথা বলো। হ্যা আমি জানি তারা কেও আমার মত কালো, আনস্মার্ট না। আমি দূর থেকে তোমাকে দেখি। তখন ইচ্ছে হয় তোমার কাছে গিয়ে বলি, তুমি শুধু আমার সাথে কথা বলবে আর কারও সাথে না। অজানা এক জড়তার কারনে সেটা পারিনা৷ এমনকি তোমার সামনে গিয়ে ভালোবাসার কথা বলবো সেই সাহসও আমার নেই। আমি তোমাদের বাসায় শুধু তোমার জন্যই আসি। এটা জেনেও যে আমাকে দেখলেই তুমি বিরক্ত হও। তারপরও কোনো এক অনুভুতির কারনে আসি। তোমাকে দেখলে আমি পৃথিবীর সব কষ্ট ভুলে যাই। আমি জানি তুমি আমাকে কখনও ভালোবাসবে না। তারপরও আজকে তোমাকে ভালোবাসার কথা বলে দিলাম৷ কারন আমি আর পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো যেনো তোমাকে আমার অনুভুতির কথা বলতে না পারলে আমি ম'রে যাবো। তোমার কাছ থেকে আমার কোনো প্রত্যাশা ছিলোনা তাও আমি কষ্ট পাচ্ছি, আমি কাঁদছি। মনে হচ্ছে যেনো কেও ছু'রি দিয়ে আমার বুকে আঘাত করছে। তুমি শুধু জাস্ট আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও৷ আমি কালো এটা কি আমার দোষ?
- কোন উত্তর নেই আমার কাছে। আর তুই আমার সামনে এসব নাটক একদম করবি না। ভালোই তো অভিনয় পারিস। এমন ভাবে কাঁদছিস মনে হয় যেনো কেও মা'রা গেছে।
- আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা বলতে চাচ্ছিলাম না৷ কিন্তু না বলে থাকতে পারলাম না। ভার্সিটিতে তোমাকে ওই ইরার সাথে দেখে আমি সহ্য করতে পারিনি।
আমি এটা আগে থেকেই জানতাম তুমি আমাকে কখনও ভালোবাসবেনা৷ তারপরও আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ কারন ভালোবাসায় প্রত্যাশা রাখা উচিত না। শুধু ভালোবাসার মত অনুভূতি থাকলেই হয়।
তারপরও আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম। কল্পনা করতাম তুমি আমাকে ভালোবাসো৷ আর ভাবতাম একবার এটা সত্যি হয়ে যেতো।
আমি তো ইচ্ছে করে কালো হইনি। আল্লাহ আমাকে এমন করে সৃষ্টি করেছে৷ আর আমি এতেই খুশি। ভালো থেকো। আর কখনও তোমাকে ভালোবাসার কথা বলবোনা৷ তবে তোমাকে ভুলতেও পারবো না। তোমাকে ভুলে থাকার সেই শক্তিটুকু আমার নেই।
আমার একটা কথা রাখবে ভাইয়া?
- বল
- কখনও আমার সাথে কথা বলা অফ করো না৷ যত ইচ্ছে অপমান করো জাস্ট আমার সাথে কথা বলো। এতেই আমি খুশি থাকবো।
আর কিছু বললাম না। চোখের পানি মুছে চলে আসলাম। বিছানায় শুয়ে ভাবতেছি আমি কালো কেন হলাম? যদি অন্যদের মত ফর্সা হতাম তাহলে হয়তো আজকে আহান ভাইয়া আমাকে ভালোবাসতো৷
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে দেখলাম। আমি কতটা কালো। মানুষ কেনই বা আমাকে ভালোবাসবে৷ সবসময় এর জন্য কথা শুনে আসছি এখনও শুনে যাচ্ছি।
সবাই শুধু আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। মনে হয় কালো হয়ে আমি কোন অপরাধ করে ফেলেছি৷
***
রুহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে। এমন সময় ওর আম্মু আসলো। ওকে এভাবে দেখে বললো, কি হয়েছে তোর? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
রুহি বললো, আচ্ছা মা আমি কালো কেন? আমি কেন অন্যদের মত ফর্সা হলাম না? সবাই শুধু আমাকে অপমানই করে৷ আমি কালো এটা কি আমার দোষ? আমি তো ইচ্ছে করে কালো হয়নি।
রুহি আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলোনা। ওর মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। ওর মা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে৷
রুহির মা ওকে বললো, কে বলেছে তুই কালো? যারা তোকে কালো বলে তাদের মন কালো৷ আমাদের কাছে তুই পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরি মেয়ে৷ অন্যদের কাছে তুই কেমন সেটা নিয়ে কখনও ভাববি না। তারা সমালোচনা করবেই। এটা তাদের স্বভাব। তাই বলে কি এসব কানে নিতে হবে।
রুহির মা চোখের পানি মুছে দিলো। রুহিকে বললো, এখন কান্না বন্ধ কর। খেতে চল। খাওয়ার পর আমরা আমাদের বাসায় যাবো। তোর মামা - মামি অপেক্ষা করছে।
- আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা
- আমি খাবার নিয়ে আসছি। আমি তোকে খাইয়ে দিচ্ছি।
কিছুখন পর মা খাবার নিয়ে আসলো। মা আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মায়েরা বুঝি এমনই। সব কষ্ট তারা ভুলিয়ে দিতে পারে। এক মুহুর্তে সব কষ্ট ভুলে যেতে লাগলাম৷
মা আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর বলছে, আমার কাছে তুই পৃথিবীর সবথেকে লক্ষী একটা মেয়ে। তোকে যে কালো বলে তার চোখের ডাক্তার দেখানো উচিত। ফর্সা হলেই তাকে সুন্দর বলতে হবে আর কালো হলে তাকে অসুন্দর এমনটা তো না তাইনা। প্রতিটা মানুষের ভিতরে অদ্ভুত এক মায়া আছে। তোর জন্মের পর তো আমাকে একজন বলেছিলো, আপা আপনার মেয়ের গায়ের রং কালো হলেও ও অনেক সুন্দর৷ ওর দিকে তাকালেই ভালো লাগে৷ আপনার মেয়েকে আমাকে দিয়ে দিবেন?
- দিয়ে দিতে
- তাহলে এখন কে খাইয়ে দিতো শুনি। কার কাছে মুখ লুকিয়ে কাঁদতি।
- তোমার কাছে। কারন আমি সেখান থেকে তোমাকে খুজে তোমার কাছে চলে আসতাম।
মা আমার কপালে চুমু দিয়ে বললো, আর কখনও যেনো কাঁদতে না দেখি।
চলে আসার আগে আহান ভাইয়ের দিকে একবার তাকালাম। কারও সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। হয়তো কোনো মেয়েই হবে। আমার হৃদয়টা যেনো দু'ম'ড়ে - মু'চ'ড়ে গেলো। ভাইয়া অন্য কারও সাথে কথা বলবে এটা আমি একদমই মেনে নিতে পারিনা।
*******
ভার্সিটিতে এসে ভাইয়ার আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। তাকে একবার দেখেই ক্লাসে যাবো। কিছুখন পর ভাইয়া আসলো। ভাইয়াকে একা দেখে ভাবলাম তার সাথে কথা বলি। আমি আহান ভাইয়ার সাথে কথা বলতে গেলাম আর ভাইয়া আমাকে ইগনোর করে অন্য একটা মেয়ের সাথে কথা বলতে লাগলে।
***
আহান ভাইয়া আমাকে ইগনোর করে অন্য একটা মেয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। আমি আহান ভাইয়াকে অন্য কারও সাথে কথা বলতে দেখে সহ্য করতে পারলাম না। সেখান থেকে চলে আসলাম।
আমি জানি আহান ভাইয়া ইচ্ছে করেই আমার সাথে এমন করেছে। তাকে এতটাই ভালোবাসি যে তার সব অপমান,ইগনোর চোখ বুঝে সহ্য করে নেই। আমি বিশ্বাস করি আহান ভাইয়া একদিন আমাকে ভালোবাসবে।
আমি চুপচাপ একা একা বসে আছি৷ হঠাৎ আমার বেস্টফ্রেন্ড অনিশা এসে বললো, আজকেও কি আহান ভাইয়ের জন্য মন খারাপ নাকি?
রুহি কিছু না বলে চুপ করে আছে৷ অনিশা বললো, বুঝতে পেরেছি। তা এভাবে মন খারাপ করে না থেকে ভাইয়াকে ভালোবাসার কথা বললেই তো পারিস
রুহি শান্ত গলায় বললো, বলেছিলাম ভালোবাসার কথা
- তারপর কি হলো?
- যেটা প্রত্যাশিত ছিলো সেটাই হয়েছে। আমি ফর্সা হলে হয়তো আহান ভাইয়া আমাকে ভালোবাসতো৷ তার জন্য কত সুন্দরী, স্মার্ট মেয়ে পা'গ'ল আর সে কিনা আমার একটা কালো মেয়েকে ভালোবাসবে৷ এটা ভাবাও অন্যায়।
- মন খারাপ করিস না। সাদা, কালো কোনো বিষয় না। মানুষের মনটা ভালো কিনা সেটাই দেখা উচিত। তোর মন অন্য সবার থেকে আলাদা। আহান ভাইয়া হয়তো সেটা বুঝতে পারছেনা।
- আমি কি করবো কিছু বুঝতে পারছিনা। আমি সত্যিই তাকে অনেকটা ভালোবেসে ফেলেছি। সে আমাকে বলেছে, আমি যেনো কখনও তার সামনে না যাই,তার সাথে কথা না বলি। কিন্তু আমি তো তার সাথে কথা না বলে থাকতে পারবো না। তাকে না দেখলে আমার ভালো লাগেনা।
সে যখন অন্য মেয়ের সাথে কথা বলে তখন মনে হয় কেও যেনো আমার হৃদপিণ্ড এ আঘাত করছে। আমি কালো এটা কি আমার দোষ? আমি কি নিজে ইচ্ছে করে কালো হয়েছি নাকি?
- এসব চিন্তা মাথা থেকে বাদ দে। তার কথাও ভুলে যে। তার যে মন- মানসিকতা তাতে তার প্রতি আসক্তি কমানোই তোর জন্য ভালো হবে।
- আমি পারছি না। যত ভাবছি তার কথা ভাববো না, তাকে ভুলে যাবো। তখনই আরও বেশি আসক্তি হয়ে যাই তার প্রতি।
কিছুদিন পর
আজকে ভার্সিটিতে অনুষ্ঠান আছে৷ আমি আহান ভাইয়ার কাছে গিয়ে বললাম, ভাইয়া তোমার সাথে একটা সেলফি তুলি।
এটা বলে আমি আহান ভাইয়ার সাথে সেলফি তুলতে লাগলাম। ভাইয়া আমার মোবাইলটা ফেলে দিয়ে রাগি ভাবে বললো, ওই নিজেকে আয়নায় দেখেছিস। কোথায় তুই আর কোথায় আমি। তোর সাথে সেলফি তুলে অনলাইনে দিলে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। তোকে না ওইদিন বলেছি আমি তোকে ভালোবাসি না। আমার সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছিলাম। তারপরও বেহায়ার মত সবসময় আমার পিছু পরে থাকিস৷ যা তো এখান থেকে।
আশে পাশের সবাই হাসাহাসি করছে৷ আহান ভাইয়া সবার সামনে এতটা অপমান করবে তা ভাবতে পারিনি। চোখ দিয়ে পানি পরছে। লজ্জায় কারও দিকে তাকাতে পারছিলাম না। নিজের প্রতি অনেক ঘৃনা হচ্ছে। একটা মানুষের জন্য সবার সামনে এতটা অপমানিত হলাম৷
অনিশা আমাকে নিয়ে গেলো। চোখের পানি এখনও থামছেনা। বার বার শুধু আমার ভাইয়ার বলা কথা গুলো কানে বাজছে। আমি কি এতটাই অপমানের যোগ্য৷ এমন অপমান না করলেও পারতো।
যার মন- মানসিকতা এতটা নিচ তাকে আর যাই হোক ভালোবাসা যায়না৷ তাকে এতদিন ভালোবাসতাম এটা ভাবতেই আমার ঘৃনা হচ্ছে। এখন থেকে আমি আর তার প্রতি আসক্তি না৷ মন থেকে তার প্রতি ঘৃনা ছাড়া আর কিছুই নেই৷
২ বছর পর
এই দুই বছরে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে৷ ওই দিনের অপমানের পর আমি আর তাকে নিয়ে ভাবিনি৷ তাদের বাসায় ও যায়নি। এখন অনেক ভালো আছি। কেও কার আমার গায়ের রং নিয়ে অপমান করেনা। পড়াশোনায় অনেক মনযোগ দিয়েছি৷ কাউকে নিয়ে আর ভাবিনা। আমি কালো এটা নিয়ে আর মন খারাপ করিনা৷ শহরের অনেক সুন্দর মানুষ আছে যাদের মনটা আমার থেকেও কালো৷ বাহ্যিক সৌন্দর্যটাই সবকিছু না এটা বুঝি এখন।
শুনেছি আহান ভাইয়া কারও কাছ থেকে ধোঁকা খেয়েছে। মেয়েটা ভার্সিটির সেরা সুন্দরি ছিলো। আহান ভাইয়া তাকে অনেক ভালোবাসতো৷ কিন্তু মেয়েটা শুধু আহান ভাইয়ার সাথে টাইম পাস করেছিলো। আহান ভাইয়া যখন জানতে পারে মেয়েটা আরও অনেক রিলেশনে আছে তখন মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে আর মেয়েটা ভার্সিটির সবার সামনে থা'প্প'ড় মে'রে আহান ভাইয়াকে অপমান করে। ঠিক আমাকে আহান ভাইয়া যেমনটা করেছিলো। ওই ঘটনার পর আহান ভাইয়া অনেকদিন ভার্সিটি আসেননি। লোকমুখে শুনেছি তিনি অনেক ডিপ্রেশনে আছেন৷ কেন জানিনা আমার ভালো লাগছিলো। সৌন্দর্যের পিছনে দৌড়ে ছিলেন এমনটা তো হওয়ারই কথা। হয়তো এটাই প্রকৃতির বিচার।
একসময় কালো ছিলাম বলে সবার কাছে নিজেকে ছোট মনে হতো। কিন্তু ওই ঘটনার পর এটাই এখন নিজের আত্নবিশ্বাস৷ আমি কালো মেয়ে এটাই আমার অহংকার। যার মন- মানসিকতা সুন্দর সে কখনও কালো হতে পারেনা আর সৌন্দর্যের পূ'জা'রী কখনও সুখি হতে পারেনা।
সমাপ্ত
ভালো থাকুক পৃথিবীর সব কালো মানুষ গুলো। আজকের দিনে এসেও ব'র্ন'বাদ মোটেও কাম্য নয়৷ কারও আত্মবিশ্বাস দূর করার জন্য অপর মানুষের জাস্ট একটি শব্দই যথেষ্ট। যত অপমানিত হবেন ততটা নিজের প্রতি আত্নবিশ্বাসী হবেন৷ মন- মানসিকতা সুন্দর তো পৃথিবীর সবকিছুই সুন্দর। ধন্যবাদ
কালো মেয়ে
লেখকঃ Rabi Al Islam
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।