সিরিজ- থ্রিলার টাইম
শেষ প্রদীপ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধর্মীয় রহস্যভিত্তিক থ্রিলার | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত তিনটা সতেরো। গ্রামের পুরোনো মসজিদটায় তখন কেউ থাকে না। মসজিদের বয়স দেড়শ বছরেরও বেশি। চারপাশে নতুন বাড়িঘর উঠেছে, কিন্তু পেছনের পুরোনো অংশটা এখনও আগের মতোই পড়ে আছে—শেওলা ধরা দেয়াল, ভাঙা কার্নিশ, আর মাটির নিচে নেমে যাওয়া একটা ছোট ঘর, যেটা বহু বছর ধরে বন্ধ।
সেদিন রাতেই মুয়াজ্জিন রহিম প্রথম আলোটা দেখেছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে হলুদ একটা রেখা বেরিয়ে আসছিল। সে ভেবেছিল কেউ হয়তো ভেতরে ঢুকেছে। তালাটা হাতে নিয়ে দেখল, মরচে ধরা অবস্থাতেই আছে। দরজা খুলতেই তার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঘরের এক কোণে পিতলের একটা প্রদীপ জ্বলছে।
প্রদীপে তেল নেই। শুকনো সলতেটাও প্রায় পাথরের মতো শক্ত। তবু ছোট্ট আগুনটা স্থির হয়ে জ্বলছে।
রহিম আর ভেতরে ঢোকেনি।
পরদিন খবর পেয়ে ঢাকায় থাকা প্রত্নতত্ত্ব গবেষক সামিয়া রহমান এলেন। ঘরটা দেখে প্রথমেই তিনি প্রদীপের দিকে গেলেন। আঙুল দিয়ে পিতলের নিচের অংশটা ছুঁয়ে দেখলেন। তারপর প্রদীপটা নাড়াতে গিয়ে থেমে গেলেন।
পিতলের তলার সঙ্গে খুব সরু একটা ধাতব নল জোড়া। নলটা দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেছে।
“এটা প্রদীপ না,” সামিয়া বললেন, “কেউ এটাকে প্রদীপের মতো বানিয়েছে।”
দেয়ালের ভেতরের নলটা অনুসরণ করে তারা পুরোনো চুনসুরকির একটা ফাঁপা অংশ পেলেন। সেখানে শুকনো তেলের গন্ধ। বহু পুরোনো কোনো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা হয়তো এখনও কাজ করছে। প্রদীপের নিচে লুকানো ক্ষুদ্র আধারে জমে থাকা তেল ধীরে ধীরে সলতে পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল। বাইরে থেকে দেখলে তেলহীন প্রদীপ। আসলে তেল ছিল দেয়ালের ভেতরে।
রহস্যের প্রথম দরজা খুলল। কিন্তু দ্বিতীয় দরজাটা আরও অন্ধকার।
প্রদীপের পেছনে কাপড়ের একটা ছেঁড়া টুকরো পাওয়া গেল। তাতে আরবি-ফারসি মিশ্র পুরোনো হাতের লেখা। অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—“যে আলো নিভবে না, তার সামনে দরজা খুলবে না।”
মসজিদের পুরোনো নথি খুঁজতে গিয়ে সামিয়া আরেকটি অস্বাভাবিক জিনিস পেলেন। ১৮৯১ থেকে ১৮৯৭—ছয় বছরের কোনো হিসাব নেই। ওয়াকফের খাতা আছে, জমির হিসাব আছে, মেরামতের খরচ আছে; শুধু ওই ছয় বছর যেন কেউ ইতিহাসের খাতা থেকে ছিঁড়ে নিয়েছে।
পুরোনো দলিলের একটি প্রান্তে অবশ্য লেখা ছিল—জমিটি দান করেছিলেন স্থানীয় এক হিন্দু জমিদার। শর্ত ছিল, এখানে প্রার্থনার জায়গা থাকবে এবং পথিক, দরিদ্র ও যে-কোনো ধর্মের মানুষ আশ্রয় পাবে। সেই সূত্র ধরেই ১৮৯৫ সালের একটি বিবর্ণ ছবি পাওয়া গেল।
ছবিতে পাঁচজন মানুষ।
একজন মুসলিম আলেম। একজন খ্রিস্টান পুরোহিত। একজন হিন্দু সন্ন্যাসী। পাশে দাঁড়িয়ে দুজন ইউরোপীয় পোশাকের মানুষ।
ছবির পেছনে কালি দিয়ে লেখা—
“১৮৯৫। শেষ রাত।”
তার নিচে আরেকটি বাক্য।
“আজ যে সিদ্ধান্ত হবে, তার কথা কেউ জানবে না।”
সামিয়া ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
রাত নামার পর আবার প্রদীপটা জ্বলে উঠল।
এইবার তিনি একা ছিলেন না। রহিম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের বাতাসে পুরোনো তেলের গন্ধ। দেয়ালের নিচে খসখসে শব্দ হচ্ছিল। সামিয়া মেঝের একটি পাথর সরাতেই নিচে কাঠের ছোট বাক্স দেখা গেল।
বাক্সের ভেতর ছিল কয়েকটি কাগজ, একটি পুরোনো সিলমোহর এবং সেই পাঁচজনের আরেকটি ছবি।
কিন্তু দ্বিতীয় ছবিটায় একজন মানুষ নেই।
প্রথম ছবিতে পাঁচজন। দ্বিতীয়টিতে চারজন।
পেছনে লেখা—
“চুক্তি রক্ষা হয়নি। জমির দলিল বদলে দেওয়া হয়েছে। যে বদলেছে, সে আমাদেরই একজন।”
সামিয়ার চোখ এবার সিলমোহরের দিকে গেল। সেটি জমিদারের নয়। মসজিদেরও নয়। পাঁচজনের মধ্যে থাকা ইউরোপীয়দের একজনের ব্যক্তিগত সিল।
আর তার পাশে ভাঁজ করা একটি কাগজ।
নামটি পড়েই সামিয়া থেমে গেলেন।
নামটা তিনি আগেও দেখেছেন—১৮৯৭ সালের পরের একটি সরকারি জমির নথিতে। সেখানে ওই ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়নি। বরং কয়েক বছর পরেও তার স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
অর্থাৎ ছবির মানুষটি অদৃশ্য হয়নি।
অদৃশ্য হয়েছিল শুধু সত্যিটা।
সামিয়া ধীরে ধীরে প্রথম ছবিটা আবার হাতে নিলেন। প্রদীপের আলো ছবির ওপর পড়ছিল। পাঁচজনের মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
চারজন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে।
শুধু একজন অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
তার হাতে ক্যামেরা।
ছবিটা আসলে সে-ই তুলেছিল।
সামিয়া ছবিটা উল্টে দিলেন।
পেছনে নতুন করে একটি লাইন দেখা গেল, যেটা এতক্ষণ ধুলোয় ঢাকা ছিল—
“যে ছবি তোলে, সে-ই সবসময় ছবির ভেতরে থাকে না।”
ঠিক তখনই প্রদীপের শিখা নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
আর দেয়ালের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ধাতব কিছু ঘষে ওঠার শব্দ শোনা গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।