সিরিজ- থ্রিলার টাইম
মানচিত্রের শেষ দাগ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
অভিযানভিত্তিক থ্রিলার | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানচিত্রে জায়গাটার কোনো নাম নেই। শুধু একটি কালো দাগ। পাশে পেন্সিলে লেখা—“ফিরে আসার পথ নেই।”
মানচিত্রটা চট্টগ্রামের এক পুরোনো নিলামঘরে পাওয়া গিয়েছিল। ব্রিটিশ আমলের পাহাড়ি জরিপের কাগজের মধ্যে ভাঁজ হয়ে থাকা পাতাটা হাতে নিয়েই ভূগোল গবেষক আরিফের চোখ আটকে যায়। পাহাড়, নদী, উপত্যকার রেখা—সবকিছু বর্তমান স্যাটেলাইট মানচিত্রের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। শুধু একটি উপত্যকা নেই। আধুনিক কোনো মানচিত্রে নেই, সরকারি নথিতেও নেই।
আরিফ অভিযানে বের হলো তিনজনকে নিয়ে—ফটোগ্রাফার মেহরিন, পাহাড়ি পথ চেনা রাকিব এবং অবসরপ্রাপ্ত জরিপ কর্মকর্তা হাবিব সাহেব। যাত্রার আগে মানচিত্রটা দেখে হাবিব সাহেব বলেছিলেন, “এই দাগটা দেখলে পথ বদলাবে।”
“আপনি জায়গাটা চেনেন?”
“চেনার কথা নয়।”
তৃতীয় দিনের বিকেলে তারা শেষ বসতিটা পেরিয়ে পাহাড়ে ঢুকল। মোবাইল নেটওয়ার্ক হারিয়ে গেল। সন্ধ্যার আগে একটি নদী পেল তারা। মানচিত্রে নদীটি পূর্বদিকে যাওয়ার কথা, বাস্তবে উত্তর দিকে বেঁকে গেছে।
আরিফ বলল, “নদী বদলেছে।”
হাবিব সাহেব নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “নদী বদলালে পাহাড়ও বদলায় না।”
একটু পরে নিজেই যোগ করলেন, “কখনো পাহাড়ই নদীর পথ বদলায়।”
কথাটা বলার সময় তাঁর মুখে কোনো বিস্ময় ছিল না।
সেই রাতেই তাঁবুর বাইরে ধাতব কিছু ঘষে যাওয়ার শব্দ হলো। রাকিব টর্চ নিয়ে বেরিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, “কেউ আমাদের আগে এখানে এসেছে।”
ভোরে নদীর ধারের কাদায় জুতোর ছাপ পাওয়া গেল। চারজনের। তাদের নিজেদের তিন জোড়া নয়। চতুর্থ ছাপ পাহাড়ের দিকে গেছে।
দুপুরের পর জঙ্গল হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। সামনে পাথরের দেয়াল। মাঝখানে সরু ফাটল। ফাটলের ওপাশে তারা এমন একটি উপত্যকা পেল, যা কোনো আধুনিক মানচিত্রে নেই।
পাথরের কয়েকটি ঘর দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ঘরগুলো পুরোনো দেখালেও দরজা নতুন। পাশে সদ্য কাটা গাছের গুঁড়ি; ভেতর থেকে এখনও আঠালো রস বের হচ্ছে।
একটি ঘরে পাওয়া গেল আধুনিক পাথর কাটার যন্ত্র, জেনারেটর আর কয়েকটি পাথরের নমুনা। প্রতিটি পাথরের গায়ে একই চিহ্ন—ভাঙা একটি মুকুট।
চিহ্নটা দেখে হাবিব সাহেব অস্বস্তিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেন।
আরিফ এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “আপনি আগে এখানে এসেছেন?”
হাবিব সাহেব উত্তর দেওয়ার আগেই পাহাড়ের ওপাশ থেকে শব্দ এল।
টং।
টং।
টং।
শব্দের কাছে গিয়ে তারা মাটিতে বসানো একটি লোহার দরজা পেল। দরজার নিচ থেকে ঠান্ডা বাতাস বের হচ্ছিল।
হাবিব সাহেব বললেন, “এটা খুলবেন না।”
“কেন?”
“কারণ আমি জানি নিচে কী আছে।”
তার আগেই দরজাটা ভেতর থেকে খুলে গেল।
একজন লোক হাতে রাইফেল নিয়ে ওপরে উঠল। তাকে দেখে হাবিব সাহেবের মুখ বদলে গেল।
লোকটি বলল, “স্যার, আপনি বলেছিলেন মানচিত্রটা আর কেউ খুঁজে পাবে না।”
আরিফের বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আপনি এই জায়গায় আগে এসেছিলেন?” সে হাবিব সাহেবকে জিজ্ঞেস করল।
হাবিব সাহেব এবার বললেন, “বত্রিশ বছর আগে।”
লোকটি মানচিত্র চাইল। হাবিব সাহেব মানচিত্রটা মাটিতে ফেলে দিলেন। লোকটি তুলতে যাওয়ার আগেই আরিফ সেটা কুড়িয়ে নিল। কাগজের কালো দাগের নিচে আরেকটি রেখা দেখা যাচ্ছিল—একটি নদী, একটি পুরোনো খনি আর একটি গ্রামের নাম।
শাহাপুর।
আরিফের গ্রামের নাম।
তার বাবা তেইশ বছর আগে সেই গ্রামের পরিত্যক্ত কয়লাখনিতে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
আরিফ হাবিব সাহেবের দিকে তাকাল।
“আপনি জানতেন?”
হাবিব সাহেব চুপ করে রইলেন।
মানচিত্রের পেছনে আরেকটি লেখা ছিল। হাতের লেখাটা আরিফ চিনতে পারল। তার বাবার।
“কালো উপত্যকা শেষ জায়গা নয়। এখান থেকে পথ যায় শাহাপুরের নিচে।”
আরিফ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
দূরের পাহাড়ের ওপাশ থেকে আবার সেই শব্দ ভেসে এল।
টং।
টং।
টং।
এবার শব্দটা উপত্যকা থেকে নয়।
তার নিজের গ্রামের দিক থেকে আসছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।