সিরিজ- থ্রিলার টাইম
শেষ ব্যালট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
রাজনৈতিক থ্রিলার | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত ২টা ১৩ মিনিটে রাকিবের ফোনটা বেজে উঠেছিল। এত রাতে সাধারণত কেউ তাকে ফোন করে না। নম্বরটা অপরিচিত। প্রথমবার ধরেনি। দ্বিতীয়বারও একই নম্বর। তৃতীয়বার ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর নিচু গলায় একজন বলল, “কাল সকালে খবরটা দেখবেন। কিন্তু বিশ্বাস করবেন না।” লাইন কেটে গেল।
রাকিব কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে একটি জাতীয় দৈনিকে রাজনৈতিক সংবাদ করে। গত তিন মাস ধরে তার মূল কাজ ছিল আসন্ন উপনির্বাচনের প্রচারণা, প্রার্থীদের সম্পদের হিসাব আর নির্বাচনী এলাকার অস্বাভাবিক কিছু ভোটার নিয়ে প্রতিবেদন করা। গত সপ্তাহে সে একটা অদ্ভুত বিষয় খুঁজে পেয়েছিল—একটি ইউনিয়নের ভোটার তালিকায় ৪৭৮ জন মৃত মানুষের নাম রয়েছে। তাদের বয়স, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানা—সবই ঠিকঠাক। শুধু মানুষগুলো আর বেঁচে নেই। তালিকার পাশে রাকিব লাল কলমে কয়েকটি নাম চিহ্নিত করেছিল। একজনের মৃত্যুর খবর সে নিজে ছেপেছিল। আরেকজন তার নিজের মামা—তিন বছর আগে মারা গেছেন। তবু তালিকায় দুজনের নামই সক্রিয় ভোটার হিসেবে আছে।
প্রতিবেদনটি সে সম্পাদকের কাছে জমা দিয়েছিল। সন্ধ্যার পর সম্পাদক ফোন করে বললেন, “এটা আপাতত থামাও।” রাকিব জিজ্ঞেস করল, “কেন?” সম্পাদক একটু চুপ থেকে বললেন, “উপর থেকে বলা হয়েছে।” রাকিব আর জিজ্ঞেস করেনি, উপরটা কতটা উপর। পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে সে নিজের ভোটার তথ্যও একবার দেখে নিয়েছিল। কয়েক মাস আগে ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছিল। অনলাইনে তার তথ্য তখন ঠিকঠাকই দেখাচ্ছিল। সে আর বিষয়টা নিয়ে ভাবেনি।
দুপুরে পুরোনো সূত্র কামাল দেখা করতে এল। লোকটা একসময় নির্বাচন অফিসে কাজ করত। এখন বাজারে ছোট একটা কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান চালায়। কামাল কোনো কথা না বলে ব্যাগ থেকে কয়েকটি কাগজ বের করে টেবিলে রাখল। রাকিব দেখল, সেগুলো ভোটার তালিকার কয়েকটি পৃষ্ঠা। প্রায় প্রতিটি পাতায় লাল কালি দিয়ে কিছু নামের পাশে ছোট টিক চিহ্ন দেওয়া। “এই টিকগুলো?” রাকিব জিজ্ঞেস করল। কামাল নিচু গলায় বলল, “মরা মানুষ।” রাকিব তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি নিশ্চিত?” কামাল বলল, “সবাইকে আমি চিনি না। কিন্তু যাদের চিনি, তাদের কেউ বেঁচে নেই।” “তাহলে নামগুলো বাদ যায়নি কেন?” কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই প্রশ্নটাই করবেন না।” “কেন?” “কারণ এর উত্তর আমি জানি না। আর যারা জানে, তারা কথা বলে না।”
কামাল উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকিয়ে বলল, “আর একটা জিনিস দেখবেন।” রাকিব জিজ্ঞেস করল, “কী?” কামাল বলল, “শেষ পাতাটা।” রাকিব কাগজগুলো উল্টে শেষ পাতায় গেল। সেখানে কোনো মৃত মানুষের নাম ছিল না। ছিল কয়েকটি সংখ্যার তালিকা—কেন্দ্র অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা, সম্ভাব্য ভোটের হিসাব, বাতিল ভোটের সংখ্যা। নির্বাচন এখনো হয়নি। রাকিব বলল, “এগুলো কী?” কামাল কোনো উত্তর দিল না। শুধু বলল, “কাল সকাল পর্যন্ত এগুলো আমার কাছে ছিল। আজ থেকে আপনার কাছে।”
সেদিন সন্ধ্যার পর কামালকে আর ফোনে পাওয়া গেল না। রাত আটটায় তার দোকানের শাটার নামানো ছিল। পাশের চায়ের দোকানের লোক বলল, দুপুরের পর থেকেই কামালকে দেখা যায়নি। রাকিব বাড়ি ফিরে কাগজগুলো টেবিলে ছড়িয়ে বসে রইল। শেষ পাতার সংখ্যাগুলো কম্পিউটারে তুলতে গিয়ে একটি কেন্দ্রের হিসাব মিলিয়ে দেখতেই তার হাত থেমে গেল। সেখানে লেখা ভোটের সংখ্যা যোগ করলে মোট ভোট পড়ে তার চেয়েও বেশি, যতজন ভোটার ওই কেন্দ্রে নিবন্ধিত। সে আবার হিসাব করল। একই ফল। তারপর হঠাৎ কামালের কথাটা মনে পড়ল—“শেষ পাতাটা দেখবেন।”
পাতাটা হাতে নিয়ে রাকিব নিচের দিকে তাকাল। সবশেষে ছোট করে লেখা—
FINAL_RESULT
নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে।
পরদিন সকালে খবর এল, কামালের দোকানে আগুন লেগেছে। দোকানের ভেতরের বেশিরভাগ জিনিস পুড়ে গেছে। পুলিশ বলেছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। কামাল বেঁচে ছিল, তবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। রাকিব সেখানে যাওয়ার আগেই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে ছবি এল। ছবিতে কামালের দোকান—আগুন লাগার আগের ছবি। দরজার শাটারে সাদা চক দিয়ে লেখা—
৪৭৮
রাকিব ছবিটা বড় করে দেখল। সংখ্যার নিচে আরেকটি ছোট দাগ। যেন কেউ লিখে পরে মুছে ফেলেছে।
সে আর হাসপাতালে গেল না। সরাসরি অফিসে ফিরে নিজের কম্পিউটার খুলল। কাগজগুলো স্ক্যান করে পাঁচটি বড় সংবাদমাধ্যমের ঠিকানায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিল। শেষ মুহূর্তে নিজের ভোটার তথ্যটা আবার খুলে দেখল। নাম আছে। ঠিকানা আছে। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও আছে। কিন্তু ভোটার স্ট্যাটাসের জায়গায় এবার লেখা—
Inactive.
রাকিব কয়েকবার পেজটা রিফ্রেশ করল। একই ফল।
ঠিক তখনই ফোনে মেসেজ এল—
“আপনি ফলাফল পাঠালেন। কিন্তু ভোট এখনো শেষ হয়নি।”
রাকিব স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, ভয়টা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নয়।
ভয়টা হলো—
সে যে ভোটার, সেটাই হয়তো এখন আর নিশ্চিত নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।