সিরিজ- থ্রিলার টাইম
শেষ ফরমান
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ঐতিহাসিক থ্রিলার | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৯০৫ সালের অক্টোবরের এক বৃষ্টিভেজা রাতে কলকাতার গভর্নমেন্ট প্রেসে কাজ শেষ করে বের হওয়ার সময় হরনাথ বাবার ঘরে রাখা পুরোনো চাবিটার কথা মনে করল। তার বাবা রামলোচন ওই প্রেসের হিসাবরক্ষকের অধীনে নথিপত্র গুছিয়ে দেওয়ার কাজ করতেন। কয়েক দিন ধরে বাড়ি ফিরে তিনি অস্বাভাবিক চুপচাপ থাকছিলেন। সেদিন রাতেও বের হওয়ার আগে শুধু বলেছিলেন, “প্রেসের উত্তর দিকের আলমারিটা খুলবি না।” কিন্তু মানুষকে যে জিনিস নিষেধ করা হয়, কৌতূহল প্রায়ই তাকে সেখানেই নিয়ে যায়।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। প্রেসের বেশিরভাগ কর্মচারী চলে গেছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে। হরনাথ নথির ঘরে ঢুকে দেখল, উত্তর দিকের পুরোনো লোহার আলমারিটার নিচ থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ আসছে—যেন ভেতরে কেউ ধীরে ধীরে কাগজ ঘষছে। সে বাবার চাবিটা বের করল। তালায় ঢুকতেই খুলে গেল। ভেতরে কোনো মানুষ ছিল না। ছিল একটি মোটা খাম। খামের ওপর কাঁপা হাতে লেখা—“৩১ অক্টোবরের আগে খুলিবে না।” নিচে কোনো সরকারি সিল নেই। তার বদলে কালো মোমে চাপ দেওয়া একটি চিহ্ন—ভাঙা মুকুট। হরনাথ খামটি হাতে নিয়েই বুঝেছিল, জিনিসটা তার নয়। সে সেটি আগের জায়গায় রেখে আলমারি বন্ধ করে দিল।
পরদিন সকালে আলমারিটা খোলা পাওয়া গেল। খামটি নেই। রামলোচন সেদিন প্রথমবার ছেলের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে বলেছিলেন, “তুই কাউকে কিছু বলিসনি তো?” হরনাথ মাথা নাড়ল। রামলোচন শুধু বলেছিলেন, “ভালো করেছিস।” তারপর আর কোনো কথা হয়নি।
চল্লিশ বছর পর, ১৯৪৫ সালের শীতের শুরুতে, মৃত্যুশয্যায় রামলোচন তার ছেলেকে একটি ছোট লোহার বাক্স দিয়ে বলেছিলেন, “প্রেস থেকে যে জিনিসটা হারিয়েছিল, সেটা আমি হারাইনি।” হরনাথ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলে তিনি বাক্সের ভেতর থেকে একটি পুরোনো কাগজের টুকরো বের করলেন। তাতে হাতে আঁকা একটি ঘরের নকশা। হরনাথ জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?” রামলোচন বললেন, “যেখানে কেউ খুঁজবে না।” “কী আছে সেখানে?” উত্তর দেওয়ার আগেই কাশিতে তাঁর কথা থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস করে বললেন, “৩১ অক্টোবরের কাগজটা যেন কখনো প্রকাশ না পায়।” সেই রাতেই তিনি মারা গেলেন।
হরনাথ বহু বছর কাগজটির কথা ভুলে ছিল। বাবার মৃত্যুর পর পুরোনো বাড়ির উঠোনে একটি আমগাছ কাটতে গিয়ে মাটির নিচে লোহার ছোট বাক্সটি পাওয়া গেল। বাক্সের ভেতরে ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া খাম। হরনাথ তখন বৃদ্ধ। খামটি খুলতে তার হাত কাঁপছিল। ভেতরে একটি সরকারি নথি। তারিখ—৩১ অক্টোবর ১৯০৫। প্রথম পাতায় প্রশাসনিক সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব। ভাষা কঠিন, সরকারি। কিন্তু দ্বিতীয় পাতায় এসে হরনাথ থেমে গেল। একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, যা বঙ্গভঙ্গের ঘোষিত প্রশাসনিক কাঠামোকেই বদলে দিত। তার নিচে হাতে লেখা একটি বাক্য—“প্রকাশের পূর্বে প্রত্যাহার করা হলো।” আর তার নিচে তিনটি স্বাক্ষর। দুটি ইংরেজ নাম। তৃতীয়টি রামলোচনের।
হরনাথের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তার বাবা কোনো কর্মকর্তা ছিলেন না। একটি হিসাবের টেবিলে বসা সাধারণ কর্মচারী। তাঁর স্বাক্ষর সেখানে থাকার কথা নয়। নথির শেষ পাতাটি ছিল না। শুধু ছেঁড়া কাগজের কিনারা। হরনাথ সেই রাতেই নথিটি আবার বাক্সে রেখে দিল। তারপর সারা জীবন কাউকে কিছু বলেনি।
১৯৭২ সালে হরনাথের মৃত্যুর পর তার নাতি অমল পুরোনো বাক্সটি পায়। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ছে। বাক্সের ভেতরের নথি দেখে প্রথমে তার মনে হয়েছিল, এটি হয়তো কোনো পুরোনো প্রশাসনিক খসড়া। কিন্তু তারিখটা দেখে সে থেমে গেল—৩১ অক্টোবর ১৯০৫। অমল কলকাতার আর্কাইভে গিয়ে সেই সময়ের সরকারি নথি খুঁজতে শুরু করল। কয়েক দিন পর একটি রেজিস্টারে সে ২১ অক্টোবরের একটি এন্ট্রি পেল—“বিশেষ প্রজ্ঞাপন—মুদ্রণ সম্পন্ন।” কিন্তু প্রজ্ঞাপনের কোনো কপি নেই। পরের পাতাটিও নেই। রেজিস্টারের পাতাটা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।
অমল আরও খুঁজে জানতে পারল, ২১ অক্টোবরের পর থেকে ওই প্রজ্ঞাপনের কোনো সরকারি উল্লেখ নেই। যেন কাগজটি কখনো অস্তিত্বই পায়নি। সেদিন রাতে সে দাদার রেখে যাওয়া নথিটা আবার খুলল। শেষ পাতার ছেঁড়া অংশটা আলোয় ধরে দেখল। কাগজের একেবারে নিচে কালির কয়েকটি দাগ এখনও বোঝা যায়। একটি শব্দ—“স্থগিত নয়—বাতিল।” তার নিচে আরেকটি লাইন, এতটাই ফিকে যে পড়তে কষ্ট হচ্ছিল—“মূল নথি ধ্বংস করা হয়েছে।”
অমল নথিটা ভাঁজ করতে যাচ্ছিল, তখন আর্কাইভের দরজায় তালা পড়ার শব্দ হলো। সে মাথা তুলল। দরজার ওপাশে একজন দাঁড়িয়ে।
“কাগজটা রেখে দিন, অমলবাবু।”
অমল কোনো উত্তর দিল না। লোকটা আবার বলল, “আপনার দাদা চল্লিশ বছর অপেক্ষা করেছিলেন। আপনার এত তাড়া কিসের?”
অমল ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। নিচের ফাঁক দিয়ে লোকটির জুতো দেখা যাচ্ছিল। বৃষ্টির কাদা লেগে আছে। আর তার ডান হাতে একটি কালো মোমের সিল—ভাঙা মুকুট।
অমল পেছনে সরে এল।
দরজার ওপাশের মানুষটি বলল, “ইতিহাসে কিছু জিনিস হারিয়ে যায় না, অমলবাবু। শুধু যারা খুঁজতে যায়, তারা একসময় হারিয়ে যায়।”
পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
অমল দরজা খুলল না। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা নথিটির দিকে তাকিয়ে সে দেখল, এতক্ষণ যে ছেঁড়া পাতাটাকে সে অসম্পূর্ণ ভেবেছিল, তার নিচে কাগজের ভাঁজের ভেতর থেকে আরেকটি পাতলা অংশ বেরিয়ে আছে। সে সেটি টেনে বের করল। সেখানে মাত্র একটি লাইন—
“এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ পেলে বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে।”
অমল অনেকক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নথিটা ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখল।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আর বহু বছর পর, সেই রাতে, কলকাতার একটি পুরোনো আর্কাইভে আবার একটি সরকারি নথি হারিয়ে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।