সম্পর্কের শেষ কথাগুলো
পর্ব ৩ — মাঝখানে কারা?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৮ আগস্ট, ২০২৬
বিয়ে হয়েছিল দুজনের। কিন্তু সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যদি চার-পাঁচজন মিলে নিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই সম্পর্কের আসল সিদ্ধান্তের জায়গাটা কোথায়?
আমাদের সমাজে বলা হয়, বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়, দুটি পরিবারেরও সম্পর্ক। কথাটা সুন্দর। পরিবার পাশে থাকবে, সুখে-দুঃখে সাহায্য করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন পাশে থাকা আর মাঝখানে থাকার পার্থক্যটা আমরা ভুলে যাই। তখন বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ধীরে ধীরে স্বামী-স্ত্রীর সিদ্ধান্ত, অভিমান, ঝগড়া, অর্থনীতি, সন্তান নেওয়া—এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও ঢুকে পড়েন। পরিবার তখন আশ্রয় না হয়ে দাম্পত্যের অদৃশ্য তৃতীয় মানুষ হয়ে ওঠে।
বিয়ের পরেও নিয়ন্ত্রণ কেন?
অনেক বাবা-মা মনে করেন, ছেলে বা মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও তার জীবনের বড় সিদ্ধান্তে শেষ কথাটা তাদেরই থাকা উচিত। কোথায় থাকবে, টাকা কীভাবে খরচ হবে, কখন সন্তান নেবে, কার সঙ্গে কতটা সম্পর্ক রাখবে—এসবও পারিবারিক আলোচনার বিষয় হয়ে যায়।
অথচ পরামর্শ আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়।
বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা মূল্যবান। তাদের কথা শোনা দরকার। কিন্তু দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যখন নিজেদের সংসার শুরু করেন, তখন নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তাদের থাকা দরকার। “আমাদের বাড়িতে এভাবেই হয়ে আসছে”—এই কথার মধ্যে ঐতিহ্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই ঐতিহ্যের কারণে নতুন মানুষটির নিজের পছন্দ বা ব্যক্তিত্ব মুছে যেতে পারে না।
“মানিয়ে নাও” কেন শুধু একজনের জন্য?
বিশেষ করে নতুন বউদের বলা হয়, “একটু মানিয়ে নাও।” “আমাদের বাড়ির নিয়ম এটাই।” “এভাবে কথা বলতে নেই।”
মানিয়ে নেওয়া অবশ্যই দরকার। নতুন পরিবারে গেলে নতুন মানুষ, নতুন অভ্যাস, নতুন নিয়মের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। কিন্তু যদি শুধু নতুন মানুষটিকেই বদলাতে হয়, চুপ থাকতে হয়, সবকিছু বুঝে নিতে হয়, আর পরিবারের অন্য কারও বদলানোর প্রয়োজন না হয়—তাহলে সেটা মানিয়ে নেওয়া নয়; সেটা একতরফা সমন্বয়।
একটি পরিবারে নতুন মানুষ এলে শুধু তাকেই পরিবারকে বুঝতে হবে না। পরিবারকেও তাকে বুঝতে হবে।
মাঝখানে যে মানুষটি পড়ে
সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় অনেক সময় পড়ে স্বামী বা স্ত্রী। একদিকে বাবা-মা, অন্যদিকে জীবনসঙ্গী। তখন প্রশ্ন আসে—“তুই কার পক্ষে?”
অথচ বিয়ে কোনো যুদ্ধ নয়।
বাবা-মা এবং জীবনসঙ্গী—দুটি আলাদা সম্পর্ক। দুটিরই গুরুত্ব আছে। কিন্তু দুটির দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের জায়গা এক নয়। একজন ছেলে যদি প্রতিটি বিষয়ে মায়ের অনুমতি ছাড়া কিছু করতে না পারেন, স্ত্রী একসময় নিজেকে নিজের সংসারে অতিথি মনে করতে পারেন। আবার একজন স্ত্রী যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিজের বাবা-মায়ের অনুমতি খোঁজেন, স্বামীও মনে করতে পারেন, তাদের সংসারে সবসময় তৃতীয় একজন উপস্থিত।
এখানে কারও পক্ষ নেওয়া দরকার নেই। দরকার সম্পর্কগুলোর সীমা বোঝা।
শুধু শ্বশুরবাড়ি নয়
দাম্পত্যে মেয়ের বাড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপও একই সমস্যা তৈরি করতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর ছোটখাটো ঝগড়া হলেই মাকে ফোন করে সব বলা, বাবার সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া, রাগের মুহূর্তে সঙ্গীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা খুলে বসা—এসব ধীরে ধীরে দুজনের নিজেদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বাবা-মায়ের সাহায্য নেওয়া ভুল নয়। বরং প্রয়োজনের সময় তাদের পাশে পাওয়া আশীর্বাদ। কিন্তু প্রতিটি অভিমান যদি সঙ্গে সঙ্গে দুই পরিবারের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে যে সমস্যা দুজনের মধ্যে এক সন্ধ্যায় মিটে যেতে পারত, সেটাই পরে পারিবারিক সম্মান, অপমান ও পক্ষ নেওয়ার ঘটনায় পরিণত হতে পারে।
সীমারেখা মানে দূরত্ব নয়
বাবা-মায়ের সঙ্গে সীমারেখা তৈরি করা মানে তাদের বাদ দেওয়া নয়। তাদের সম্মান করা যাবে, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো যাবে, পরামর্শ নেওয়া যাবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ঝগড়া, অনুভূতি, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা দাম্পত্যের প্রতিটি সিদ্ধান্তে পরিবারের অনুমতি প্রয়োজন—এমন ধারণা সুস্থ নয়।
এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ হতে পারে—“আমরা।”
“আমরা দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
এই ছোট্ট কথাটির মধ্যে দাম্পত্যের একটা বড় শক্তি আছে। এতে বাবা-মাকে অপমান করা হয় না, আবার স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের জায়গাটাও পরিষ্কার থাকে।
মানিয়ে নেওয়া দুদিক থেকেই
নতুন বউ যেমন নতুন পরিবারের কিছু নিয়ম বুঝবে, তেমনি শ্বশুরবাড়ির মানুষকেও বুঝতে হবে—নতুন মানুষটির নিজের ইতিহাস আছে, নিজের অভ্যাস আছে, নিজের পছন্দ-অপছন্দ আছে।
একইভাবে একজন স্ত্রীকেও বুঝতে হবে, স্বামীর বাবা-মায়ের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ককে সম্মান করা তার নিজের দাম্পত্যেরও অংশ।
কিন্তু সম্মান মানে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলা নয়। আবার স্বাধীনতা মানে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
শেষ কথা
প্রশ্নটা শ্বশুরবাড়ি ভালো না খারাপ, সেটা নয়। প্রশ্ন হলো—পরিবার কি বুঝতে পারছে, তাদের সন্তান এখন নিজের একটি পরিবারও তৈরি করেছে?
আর স্বামী-স্ত্রী কি বুঝতে পারছেন, নিজেদের সংসার গড়ার স্বাধীনতা মানে বাবা-মাকে প্রতিপক্ষ বানানো নয়?
বাবা-মা পাশে থাকবেন, পরামর্শ দেবেন, প্রয়োজনে সাহায্য করবেন। কিন্তু দাম্পত্যের প্রতিটি কথার বিচারক হবেন না।
কারণ পরিবার ছায়া হয়ে থাকলে মানুষ তার নিচে শান্তি পায়। কিন্তু সেই ছায়া যদি সবসময় সামনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে মানুষ নিজের পথটাই দেখতে পায় না।
একটি সংসারকে পরিবার বানাতে তাই দূরত্ব নয়, দরকার সঠিক সীমারেখা। বাবা-মাকে বাদ দিয়ে নয়, তাদের সম্মান করেই।
কারণ পাশে থাকা আর মাঝখানে থাকার পার্থক্যটা ছোট মনে হলেও, একটি দাম্পত্যের জন্য কখনো কখনো সেটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।