শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৫ : বিচ্ছেদের কাগজে সই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"একটা কলমের কালি শুকিয়ে গেল, কিন্তু চারটা মানুষের জীবন বদলে গেল।"
সিদ্ধান্তটা এক রাতের না।
অনেকগুলো নীরব রাত, অর্ধেক বলা কথা, আর রোজ সকালে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাতে না পারা—সব মিলে একদিন দুজনেই বুঝে গেল, জোর করে সেলাই করলে কাপড়ে টান লাগে। ছিঁড়ে যায়।
কথাটা প্রথম অভিকই বলেছিল।
ডাইনিং টেবিলে দুজন মুখোমুখি। মাঝখানে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ।
“নিশি, এভাবে আর হয় না।”
নিশি সঙ্গে উত্তর দেয়নি। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “হয়তো তুমি ঠিকই বলছ।”
কোনো চিৎকার নেই। কাপ-পিরিচ ভাঙা নেই। শুধু একটা স্বীকারোক্তি, যা বোমার চেয়েও বেশি শব্দ করে ভেঙে পড়ল ঘরটায়।
‘ভালো’ শব্দটা কেউ উচ্চারণ করল না। কারণ দুজনেই জানে, এখানে ভালো বলে কিছু নেই। আছে শুধু কম খারাপ।
এরপর শুরু হলো অন্য এক যুদ্ধ—কাগজের যুদ্ধ।
আইনজীবীর চেম্বারে এসি চলছে, তবু ঘামছে দুজনেই। টেবিলের ওপর বারো বছরের সংসারটা এখন কয়েকটা পয়েন্টে ভাগ হয়ে গেছে।
১. মেঘলা ও মিশি থাকবে বাবার সাথে।
২. মা প্রতি শুক্রবার বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দেখা করতে পারবে।
৩. পড়াশোনার খরচ...
৪. ঈদের ছুটি...
টাইপিস্ট মেয়েটা খটখট করে টাইপ করছে। তার কাছে এটা রুটিন কাজ। অভিকের কাছে প্রতিটা লাইন একেকটা ছুরি।
“সন্তানদের সর্বোচ্চ মানসিক কল্যাণের স্বার্থে...” লাইনটা পড়ে নিশি মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখের কোণে জল।
আইনজীবী গম্ভীর মুখে বললেন, “আবেগ দিয়ে তো হবে না। বাস্তবতা দেখুন।”
বাস্তবতা। শব্দটা এত ভারী কেন?
আদালতে যাওয়ার দিন আকাশটা মেঘলা। যেন আকাশও জানে, আজ কিছু একটা চিরতরে শেষ হতে চলেছে।
অভিক উবারে উঠল। নিশি উঠল সিএনজিতে। একই রাস্তা, একই আদালত। তবু দুজন দুই দিক থেকে গেল। মাঝখানে যে দূরত্বটা তৈরি হয়েছে, সেটা আর কিলোমিটারে মাপা যায় না।
বারান্দায় শত শত মানুষ। জমির দলিল হাতে কাঁদছে বৃদ্ধ, খোরপোষের মামলায় এসেছে এক তরুণী কোলে বাচ্চা নিয়ে। এই ভিড়ের মধ্যে অভিক আর নিশি চুপচাপ বেঞ্চের দুই প্রান্তে বসল।
কেউ কারো দিকে তাকাল না। তাকালে যদি ভেঙে পড়ে?
পিয়ন এসে নাম ডাকল। “অভিক হোসেন, নিশি আক্তার।”
ভেতরে ঢুকল দুজন। বিচারকের সামনে দাঁড়াল।
আইনজীবী ফাইল এগিয়ে দিলেন। “ইয়োর অনার, পার্টিরা মিউচুয়াল ডিভোর্সে সম্মত। সই বাকি।”
একটা নীল ডটপেন এগিয়ে দিলেন অভিকের দিকে।
অভিক কলমটা ধরল। আঙুল কাঁপছে।
বারো বছর আগে আরেকটা কলম ধরেছিল সে। রেজিস্ট্রি খাতায়। সেদিন চারপাশে ফ্ল্যাশের আলো, শানাই, “দোয়া করি সুখী হও”। নিশি লাল শাড়িতে লজ্জায় মাথা নিচু করে ছিল।
আজও কলম আছে। কাগজ আছে। সাক্ষী আছে। নেই শুধু সেই লাল শাড়ি, সেই লজ্জা, সেই ভবিষ্যৎ।
নিবটা কাগজে ছোঁয়াতেই মনে হলো, এই কালিটা শুধু কাগজে পড়ছে না। মেঘলার রিপোর্ট কার্ডে পড়ছে, মিশির আঁকার খাতায় পড়ছে, বারো বছরের প্রতিটা সকালের চায়ের কাপে পড়ছে।
সই করে কলমটা নামিয়ে রাখল। শব্দ হলো না। তবু মনে হলো, একটা পাহাড় ধসে পড়ল।
নিশি সই করল তারপর। নামটা লিখতে গিয়ে কলম থেমে গেল দুইবার। শেষে ‘নিশি আক্তার’ লেখাটা শেষ করে সে কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না, এই কয়টা অক্ষর একটা সংসার শেষ করে দিতে পারে।
আদালত থেকে বেরিয়ে দুজন গেটের সামনে দাঁড়াল।
পাশাপাশি। তবু মাঝখানে বারো বছরের লাশ।
অভিক পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল মুছল। আসলে চোখ।
“মেয়েদের সামনে... আমরা ঝগড়া করব না। কখনো।” গলাটা ভাঙা।
নিশি চোখ মুছতে মুছতে মাথা ঝাঁকাল। “ওরা যেন কখনো না ভাবে, ওদের জন্য আমরা আলাদা হয়েছি। দোষটা আমাদের। ওদের না।”
অভিক কিছু বলল না। কারণ সে জানে, বাচ্চারা দোষ খোঁজে না। ওরা শুধু ব্যথা পায়।
বাসায় ফিরে কলিংবেল দিতেই মিশি দরজা খুলল। “বাবা! তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আমি ভয় পাচ্ছিলাম।”
অভিক মেয়েকে কোলে তুলে নিল। ছোট শরীরটা বুকে চেপে ধরতেই বুঝল, এই বুকের ভেতর যে ঝড় বইছে, সেটা এই বাচ্চাটা ডিজার্ভ করে না।
“কাজ ছিল মা। সরি।”
মিশি গলা জড়িয়ে ধরল। “আর কখনো দেরি করবে না তো?”
“না মা। কখনো না।”
মিথ্যে প্রতিশ্রুতি। সে জানে। দেরি তো হয়েই গেছে। অনেক দেরি।
মেঘলা দূরে সোফায় বসে। বই খোলা, কিন্তু পড়ছে না। সে বাবার চোখের দিকে তাকাল। এই কয়দিনে মেয়েটা বড়দের মতো তাকাতে শিখে গেছে। যে চোখ প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তর চায় না। কারণ উত্তরটা সে জানে।
রাতে দুই মেয়েকে নিয়ে শুয়েছে অভিক। মাঝখানে সে, দুই পাশে দুই মেয়ে।
মিশি ঘুমের মধ্যে বলল, “বাবা, মা কখন আসবে?”
অভিকের গলা বন্ধ হয়ে এল। “আসবে মা। শুক্রবারে আসবে।”
“শুধু শুক্রবারে কেন? আগে তো রোজ থাকত।”
অভিক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। উত্তর নেই।
মেঘলা পাশ ফিরে শুয়ে আছে। ঘুমায়নি, অভিক জানে।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল অভিক। নিচে শহর জ্বলছে। হাজার হাজার আলো। হর্ন, গান, জীবন। সব চলছে। শুধু তার চার দেয়ালের ভেতর সময়টা থেমে গেছে।
কাগজে সই করার সময় ভেবেছিল, কষ্ট এখানেই শেষ। এখন বোঝে, ওটা শুরু।
বিচ্ছেদ মানে মুক্তি না। বিচ্ছেদ মানে নতুন এক যুদ্ধ। যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষ নেই, শুধু নিজের সাথে রোজ হারতে হয়।
আর সবচেয়ে বড় শাস্তি? মিশি যখন বড় হয়ে জিজ্ঞেস করবে, “বাবা, তোমরা কেন আলাদা হয়েছিলে?”
সেদিন সে কী উত্তর দেবে?
“আমরা একে অপরকে সময় দিইনি”? নাকি “তোমার মা ভুল করেছিল”? কোনো উত্তরই তো মেয়েটার শৈশব ফিরিয়ে দেবে না।
রাত বাড়ে। ঘরের ভেতর নীরবতা আরও গাঢ় হয়।
অভিক বুঝে গেছে, আদালতের কাগজ দুটো মানুষকে আলাদা করতে পারে। কিন্তু দুটো বাচ্চার বুকের ভেতর যে প্রশ্নটা ঢুকে গেল, সেটার রায় কোনো আদালত দিতে পারবে না।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।