শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৩ : সত্যিটা এত কঠিন হবে ভাবিনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"সব সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় না। কিছু সত্য মানুষকে ভেঙেও দেয়।"
অফিসে বসে অভিক মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে এক্সেলের সেল, সংখ্যার সারি। কিন্তু চোখে ভাসছে কাল রাতের দৃশ্য—নিশির উল্টো করে রাখা ফোন, বারান্দায় চাপা গলা, আর সেই এক লাইনের মেসেজ।
সকালে বের হওয়ার সময় ঠিক করেছিল, আজ পালাবে না। সন্দেহের ভূত নিয়ে আর একটা দিনও না। যা হবে, সামনাসামনি হবে।
বাসায় ফিরল বিকেল পাঁচটায়। ইচ্ছে করেই আগে।
দরজা খুলতেই মিশি দৌড়ে এল। “বাবা, আজকে আপু আমাকে অঙ্ক শিখিয়েছে!” মেঘলা টেবিলে খাতা মেলে বসে। নিশি রান্নাঘর থেকে উঁকি দিল। “তুমি? আজ এত তাড়াতাড়ি?”
সব স্বাভাবিক। এতটাই স্বাভাবিক যে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। ঝড়ের আগে আকাশ যেমন শান্ত থাকে।
রাত দশটা। মেয়েরা ঘুমিয়ে গেছে। ঘরের বাতি নেভানো, শুধু বারান্দায় একটা হলুদ আলো জ্বলছে।
অভিক বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। পাশে এসে দাঁড়াল নিশি। দুজনের মাঝখানে দুই হাত ফাঁক। আগে এই ফাঁকটা থাকত না।
দূরে কোথাও ট্রেন চলে গেল। শব্দটা মিলিয়ে যাওয়ার পর অভিক কথা বলল। গলা যতটা সম্ভব শান্ত রাখল।
“নিশি, তোমার সাথে কথা ছিল।”
নিশি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখে প্রশ্ন নেই, ক্লান্তি। “বলো।”
“আমি কয়েকদিন আগে তোমার ফোনে একটা মেসেজ দেখেছি।”
বাতাসটা মুহূর্তের জন্য থেমে গেল মনে হলো। নিশি স্থির। চোখের পাতাও নড়ছে না। সে চিৎকার করল না, “কী বলছ এসব?” বলল না, “তুমি আমার ফোন ধরো কেন?”
শুধু ধীরে ধীরে রেলিংয়ের ওপর রাখা হাতটা মুঠো করল। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “কতটুকু দেখেছ?”
এই একটা বাক্য। এতেই অভিকের বারো বছরের সংসারটা কেঁপে উঠল। যার কিছু লুকোনোর নেই, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না।
অভিকের গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে উঠল। তবু সে চেঁচাল না। চেঁচানোর শক্তিটুকুও যেন কেউ শুষে নিয়েছে।
“আমি পুরোটা জানতে চাই।”
নিশি বারান্দা থেকে ঘরে গেল। সোফায় বসল। হাঁটুর ওপর দুই হাত জড়ো করে রাখল। অভিক সামনের চেয়ারে। মাঝখানে টি-টেবিলটা যেন একটা দেশের সীমানা।
অনেকক্ষণ পর নিশি বলল, “সায়ান।”
নামটা শুনে অভিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। মনে করার চেষ্টা করল। “ভার্সিটির সায়ান?”
নিশি মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ছয় মাস আগে ফেসবুকে হঠাৎ নক দেয়। আমি প্রথমে কথা বলিনি। তারপর...”
“তারপর?” অভিকের গলা ফ্যাসফ্যাসে শোনাল নিজের কাছেই।
“তারপর কথা শুরু হলো। পুরোনো দিনের গল্প। তুমি অফিসে, মেয়েরা স্কুলে। দুপুরগুলো ফাঁকা লাগত। ওর সাথেও কথা বলতে ভালো লাগত।”
ঘরের দেয়ালঘড়িটা টিকটিক করছে। শব্দটা আগে কখনো এত জোরে লাগেনি।
“শুধু কথা?” অভিক জানত প্রশ্নটা করতে হবে। না করলে আজ রাতে সে মরেই যাবে।
নিশি চোখ বন্ধ করল। দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। “শুরুতে শুধু কথাই ছিল, অভিক। বিশ্বাস করো। কিন্তু আমি... আমি আটকাতে পারিনি। একদিন দেখা করেছি। তারপর আরও দুই দিন।”
প্রতিটা শব্দ একেকটা পাথর। এসে বুকের ওপর পড়ছে। অভিকের মনে হলো সে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে।
সে উঠল না। টেবিল উল্টাল না। গালিও দিল না। শুধু বসে রইল। রাগ যখন সীমা ছাড়ায়, মানুষ তখন পাথর হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “আমার কী কমতি ছিল, নিশি?”
এবার নিশি শব্দ করে কেঁদে ফেলল। “তোমার কমতি ছিল না। তুমি সংসারের জন্য জান দিয়ে দিয়েছ। কিন্তু আমরা... আমরা কবে শেষ একসাথে বসে চা খেয়েছি বলতে পারো? কবে শেষ তুমি জিজ্ঞেস করেছ, ‘আজ তোমার মন কেমন?’”
অভিক তাকিয়ে রইল। সত্যি তো। কবে শেষ জিজ্ঞেস করেছে?
“আমি একা হয়ে যাচ্ছিলাম, অভিক। ঘরে চারটা মানুষ, তবু আমি একা। সায়ান শুনত। আমার ছোট ছোট কথাও মন দিয়ে শুনত। আমি জানি এটা কোনো অজুহাত না। তবু... আমি ভুল করেছি।”
“তাহলে আমাকে বলোনি কেন?” অভিকের গলা কাঁপছে। “আমরা তো বন্ধু ছিলাম। বলতে পারতে, ‘আমার দম বন্ধ লাগছে’। আমি তো বদলাতাম।”
“ভয় লাগত। ভাবতাম তুমি রাগ করবে। ভাবতাম তুমি বলবে ‘নাটক করো না’। তাই চুপ করে গেছি। আর চুপ থাকতে থাকতে দেয়ালটা এত উঁচু হয়ে গেল যে আর টপকাতে পারিনি।”
ঘরজুড়ে নীরবতা। সেই নীরবতায় বারো বছরের সংসারটা কাচের গ্লাসের মতো ভেঙে পড়ছে, অভিক স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে, নিশির চোখের জলটা নাটক না। অনুশোচনাটা সত্যি। কিন্তু যেটা ভেঙেছে, সেটার নাম বিশ্বাস। কাচ জোড়া লাগলেও দাগ থেকে যায়।
“এখন কী চাও তুমি?” অভিক জিজ্ঞেস করল।
নিশি মুখ তুলল। চোখ লাল। “আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি তোমাকে হারাতে চাই না। মেয়েদের সংসার ভাঙতে চাই না। তুমি যদি তাড়িয়ে দাও, আমি যাব। যদি শাস্তি দাও, মাথা পেতে নেব।”
অভিক উঠে দাঁড়াল। মেয়েদের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘলা উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে, মিশি কোলবালিশ জড়িয়ে। ওরা জানে না, ওদের পৃথিবীটা আজ রাতে কেঁপে উঠেছে।
বুকের ভেতরটা এত ভারী লাগছে যে মনে হচ্ছে এখনই বসে পড়বে।
সে ফিরে এসে নিশির সামনে দাঁড়াল। “আজ আমার গায়ে হাত তোলার কথা। তোমাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার কথা। কিন্তু আমি পারছি না। জানো কেন?”
নিশি তাকিয়ে রইল।
“কারণ আমি বুঝতে পারছি, এই ভাঙনের দায় আমারও। আমি তোমাকে সময় দিইনি। তোমার নীরবতাকে আদর ভেবেছি। তোমার একা হয়ে যাওয়াটা দেখিনি। আমি শুধু টাকা আনতেই ব্যস্ত ছিলাম, মানুষটাকে আনতে ভুলে গেছি।”
নিশি দুহাতে মুখ ঢাকল।
“কিন্তু,” অভিক থামল। গলাটা শক্ত করল। “এই সত্যটা আমার সব রাগ ধুয়ে দিতে পারছে না, নিশি। তুমি একা ছিলে, তাই ভুল করেছ। আমি কী করব? আমি তো একা না। আমি তো তোমাদের নিয়েই ছিলাম। তবু আমার একা লাগছে। এই একা লাগাটা কে দূর করবে?”
কোনো উত্তর নেই।
রাত তখন তিনটা।
নিশি বলল, “তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো না, অভিক। আমি সেই যোগ্য না। শুধু... শুধু মেয়েদুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে একবার ভেবো।”
অভিক জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কুকুরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। পুরো শহর ঘুম। শুধু এই ঘরটা জেগে।
সে জানে, আজ যে সত্যটা জানল, এটাই শেষ আঘাত না।
সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসবে সেদিন, যেদিন মেঘলা জিজ্ঞেস করবে, “বাবা, মা কোথায়?” অথবা মিশি বলবে, “তোমরা ঝগড়া করো কেন?”
সেই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
সে শুধু জানে, বিশ্বাস জিনিসটা কাচের মতো। একবার ফাটল ধরলে শব্দ হয় না। কিন্তু সেই ফাটল দিয়ে পুরো পৃথিবী ঢুকে পড়ে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।