এ বিউটিফুল মাইন্ড থেকে গেম থিওরি: জন ন্যাশ এবং ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের আদ্যোপান্ত
চলচ্চিত্রপ্রেমী কিংবা সাধারণ দর্শক সবার কাছেই ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ও অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র 'এ বিউটিফুল মাইন্ড' (A Beautiful Mind) অত্যন্ত পরিচিত। অসাধারণ মেধা, স্কিৎজোফ্রেনিয়ার তীব্র যন্ত্রণা এবং অবশেষ নোবেলজয়ের এক বাস্তব জীবনের রূপকথা এই সিনেমা। সিনেমার মূল চরিত্র, খ্যাতিমান গণিতবিদ জন ফোর্বস ন্যাশ জুনিয়র (John Forbes Nash Jr.) প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে এক অভিনব গাণিতিক ধারণার জন্ম দেন।
সিনেমাটির একটি স্মরণীয় দৃশ্যে দেখা যায় জন ন্যাশ ও তার বন্ধুরা এক পাব-এ (Pub) বসে আড্ডা দিচ্ছেন। হঠাৎ একদল তরুণী সেখানে প্রবেশ করে, যার মধ্যে একজন স্বর্ণকেশী (Blond) তরুণী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ন্যাশের বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেয় সবাই মিলে সেই একজন সুন্দরী তরুণীকে পটানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু ন্যাশ হঠাৎ থেমে যান এবং বন্ধুদের বলেন:
"আমরা সবাই যদি ওই এক মেয়ের পেছনে ছুটি, তবে আমরা কেউই তাকে পাব না এবং বাকি মেয়েরাও অপমানিত বোধ করে আমাদের প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু আমরা যদি ওই মেয়েটিকে উপেক্ষা করে বাকিদের দিকে মনোযোগ দিই, তবে সবাই সফল হব।"
যদিও সিনেমার এই দৃশ্যটি মূল গাণিতিক ধারণাকে কিছুটা সহজ ও নাটকীয় ভাবে উপস্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু এই চিন্তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম বড় আবিষ্কার ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম (Nash Equilibrium)। ১৯৫০-এর দশকে প্রবর্তিত এই ধারণা গেম থিওরি (Game Theory) বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত্ত্বের দৃশ্যপট চিরতরে বদলে দেয়, যার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে জন ন্যাশ অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে গেম থিওরি এবং 'ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম' কী?
ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম বোঝার আগে 'গেম থিওরি' সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। গেম থিওরি হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন একটি গাণিতিক পদ্ধতি, যেখানে একাধিক পক্ষ (Player) এমন একটি পরিস্থিতিতে অংশ নেয় যেখানে একজনের সিদ্ধান্ত বা চাল অন্যজনের লাভ-ক্ষতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
আর ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন এক স্থিতাবস্থা বা ভারসাম্য (Equilibrium), যেখানে অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগী বা পক্ষগুলো একে অপরের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত জেনে নিজের সেরা কৌশলটি বেছে নেয়। এই অবস্থায় পৌঁছানোর পর, প্রতিপক্ষ তাদের অবস্থান না পাল্টালে, একা কোনো পক্ষের পক্ষে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বাড়তি কোনো সুবিধা বা মুনাফা অর্জন করা সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি পক্ষ তাদের বর্তমান অবস্থানে আটকে যায় বা সন্তুষ্ট থাকে, কারণ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে তাদের ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিষয়টা বুঝার জন্য আমরা ক্লাসিক উদাহরণ: কয়েদির দ্বিধা (Prisoner's Dilemma) টাকে নিতে পারি। ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম ব্যাখ্যার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় গাণিতিক মডেল হলো 'প্রিজনার্স ডাইলেমা' বা কয়েদির দ্বিধা।দৃশ্যপট:
পুলিশ দুজন সন্দেহভাজন অপরাধীকে (কয়েদি A এবং কয়েদি B) দুটি ভিন্ন কক্ষে আটকে রেখে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। পুলিশ উভয়কে দুটি বিকল্প দিল 'স্বীকার করা' (Confess) অথবা 'চুপ থাকা' (Silent)।
কয়েদি A-এর চিন্তা: "B যদি চুপ থাকে, তবে আমি স্বীকার করলে খালাস পাব (০ বছর)। আর B যদি স্বীকার করে, তবে আমিও স্বীকার করলে ১০ বছরের জায়গায় ৩ বছর সাজা পাব।" অর্থাৎ B যা-ই করুক না কেন, A-এর জন্য 'স্বীকার করা' কৌশলটিই সবচেয়ে নিরাপদ।
কয়েদি B-এর চিন্তা: হুবহু একই যৌক্তিক কারণে কয়েদি B-ও 'স্বীকার করা'র সিদ্ধান্ত নেবে।
ফলাফল:উভয়েই একে অপরকে অবিশ্বাস করে 'স্বীকার করা' কৌশল বেছে নেবে এবং দুজনেরই ৩ বছর করে সাজা হবে।
এখানে (স্বীকার করা, স্বীকার করা) হলো ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম। কারণ এই অবস্থায় গিয়ে একা কয়েদি A যদি তার সিদ্ধান্ত বদলে চুপ হয়ে যায়, তবে তার সাজা ৩ বছর থেকে বেড়ে ১০ বছর হয়ে যাবে!
[ উল্লেখ্য যে দুজনেই যদি চুপ থাকত, তবে মাত্র ১ বছর করে সাজা হতো (যা সামগ্রিকভাবে সেরা ফল)। কিন্তু যোগাযোগের অভাব এবং অবিশ্বাসের কারণে তারা সেই যৌথ সেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। ]
এখন আমরা আরেকটি উদাহরণ দিয়ে আরও ভালোভাবে বিষয়টা বুঝার চেষ্টা করব - যেটা হবে :
"ব্যবসায়িক প্রয়োগ: কোকা-কোলা বনাম পেপসি কেস স্টাডি"
বাস্তব ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম প্রতিদিন ঘটে চলেছে। কর্পোরেট জগতে পণ্যের দাম নির্ধারণ বা বিজ্ঞাপনী বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো কীভাবে এই নীতি ব্যবহার করে, তা আমরা কোকা-কোলা (Coca-Cola) ও পেপসির (Pepsi) উদাহরণ দিয়ে বুঝতে পারি।
ধরা যাক, এই দুই জায়ান্ট কোম্পানির সামনে বিজ্ঞাপনী বাজেটের দুটি বিকল্প আছে: উচ্চ বিজ্ঞাপনী বাজেট (High Ads) এবং নিম্ন বিজ্ঞাপনী বাজেট (Low Ads)।
এখন যা ঘটবে তা হলো -
১. কোকা-কোলার দৃষ্টিভঙ্গি: পেপসি যদি কম বিজ্ঞাপন দেয়, কোকা-কোলা বেশি বিজ্ঞাপন দিয়ে $১৫০M আয় করতে চাইবে। আবার পেপসি যদি বেশি বিজ্ঞাপন দেয়, কোকা-কোলা কম বিজ্ঞাপন দিলে পাবে $৫০M, কিন্তু বেশি দিলে পাবে $৭৫M। সুতরাং, কোকা-কোলার ডোমিন্যান্ট স্ট্র্যাটেজি হলো বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়া।
২. পেপসির দৃষ্টিভঙ্গি:কোকা-কোলার মতো পেপসির জন্যও সমান গাণিতিক সমীকরণ প্রযোজ্য। তাদের জন্যও সেরা নিরাপদ কৌশল হলো বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়া।
ব্যবসায়িক ভারসাম্য (Equilibrium):অবশেষে উভয় কোম্পানিই "বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়া" সিদ্ধান্ত বেছে নেবে এবং দুজনেই $৭৫M করে মুনাফা অর্জন করবে। এটিই হলো এই প্রতিযোগিতার ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম।
[ যদিও দুজনেই কম বিজ্ঞাপন দিলে বিজ্ঞাপনী খরচ বাঁচিয়ে $১০০M করে লাভ করতে পারত, কিন্তু প্রতিপক্ষ একা বাজার দখল করে নেবে এই আতঙ্কের কারণে কেউই বেশি বিজ্ঞাপনের বাজেট থেকে পিছু হটতে পারে না।]
ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম কেবল গণিত বা ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের চারপাশের অনেক জটিল সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন ঘটে:
পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা (Cold War Arms Race): স্নায়যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু একপক্ষ অস্ত্র কমালে অন্যপক্ষ আক্রমণের সুযোগ নেবে এই ভয়ে উভয় পক্ষই বিপুল অস্ত্র মজুদ রাখার ভারসাম্যে (Nash Equilibrium) আটকে ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন নিঃসরণ:বিশ্ব উষ্ণায়ন রুখতে সব দেশের কার্বন নিঃসরণ কমানো উচিত। কিন্তু একটি দেশ উৎপাদন কমিয়ে নিঃসরণ কমালে অন্য দেশগুলো যদি কারখানা চালু রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়, তবে প্রথম দেশটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই ভয় থেকেই বিশ্বব্যাপী কার্যকর জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়।
ট্রাফিক জ্যাম ও নেভিগেশন অ্যাপ: গুগল ম্যাপস যখন সব চালককে জ্যাম এড়াতে একটি বিকল্প ছোট রাস্তা সাজেস্ট করে, তখন সবাই একযোগে সেই নতুন রাস্তায় চলে যায়। ফলে নতুন রাস্তাটিতেও জ্যাম লেগে যায়। চালকরা অজান্তেই নতুন একটি ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামে পৌঁছে যান
তো আমি আশা করি যে এতটুকু আপনারা বুঝতে পেরেছেন। আমাদের এখন বুঝতে হবে যে - ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম অর্থনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত্ত্বে বিপ্লব আনলেও বাস্তব জীবনে এর কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন:
১. পূর্ণ যুক্তিবাদিতার পূর্বশর্ত (Assumption of Rationality):এটি ধরে নেয় যে প্রতিটি মানুষ সম্পূর্ণ যৌক্তিকভাবে এবং আবেগমুক্ত হয়ে চিন্তা করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষ প্রায়ই আবেগ, লোভ, ভয় বা ভুলের বশে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়।
২. তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতা (Imperfection of Information): বাস্তব বাজারে প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব বা সব তথ্য সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয় না।
৩. একাধিক ভারসাম্যের উপস্থিতি:কিছু জটিল পরিস্থিতিতে একের অধিক ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম তৈরি হতে পারে, যেখানে কোনটি নিশ্চিতভাবে ঘটবে তা বলা কঠিন।
এখন যদি আমরা পুরো বিষয়টার সারাংশ করি তাহলে বিষয়টা দাঁড়ায় যে - 'এ বিউটিফুল মাইন্ড'মুভি আমাদের একজন জিনিয়াসের জীবনের আলো-আঁধারি দেখিয়েছে, কিন্তু জন ন্যাশের দিয়ে যাওয়া গাণিতিক উত্তরাধিকার আজও আধুনিক অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ব্যবসায়িক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম আমাদের শেখায় যে, ব্যক্তিস্বার্থ আর যৌথস্বার্থ সবসময় এক পথে হাঁটে না। একটি প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে কেবল নিজের জন্য সেরা কৌশল খুঁজলেই চলে না, বরং প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য পদক্ষেপ বিবেচনা করে নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করাই আসল বুদ্ধিমত্তা। ব্যবসায়িক কৌশল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনচর্চা আমরা না চাইতেও প্রতিদিন জন ন্যাশের সেই অদ্ভুত গাণিতিক ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই যায়।
[ অনলাইন এতে এই বিষয়ের উপর থিসিস / জার্নাল পেপার পেয়ে যাবেন জন র্যাশের Nash Equilibrium এর উপর, সেখানে পুরো ডিটেইলস এতে গাণিতিক ভাবে আলোচনা করা হয়েছে ]
সমাপ্ত......
প্রিন্স ফ্রেরাসে -
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।