জর্জ লুকাচ (Georg Lukács): জীবন, দর্শন ও উত্তরাধিকার
পর্ব ২ : যে ইউরোপ জর্জ লুকাচকে গড়ে তুলেছিল
কোনো দার্শনিককে বুঝতে হলে শুধু তাঁর বই পড়লেই হয় না। তিনি যে যুগে জন্মেছেন, যে সমাজে বেড়ে উঠেছেন এবং যে রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশে চিন্তা করেছেন, সেটিও বুঝতে হয়। কারণ দর্শন কখনো শূন্যে জন্ম নেয় না; এটি সর্বদা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপ করে।
জর্জ লুকাচ ১৮৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ইউরোপ ছিল এক বিরাট পরিবর্তনের যুগ। বাইরে থেকে ইউরোপকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক সংঘাত, জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং শ্রমিক অসন্তোষ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই অস্থির বাস্তবতাই পরবর্তীকালে লুকাচের চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে।
শিল্পবিপ্লব ও নতুন সমাজ
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া Industrial Revolution (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন; বাংলা: শিল্পবিপ্লব) উনবিংশ শতাব্দীতে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
শিল্পবিপ্লব বলতে শুধু নতুন যন্ত্র আবিষ্কারকে বোঝায় না। এটি মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, পরিবার, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের নাম।
আগে অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করত। কিন্তু কারখানা গড়ে ওঠার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। এর ফলে ইউরোপে দুটি নতুন সামাজিক শ্রেণি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
প্রথমটি হলো Bourgeoisie (বুর্জোয়া; বাংলা: পুঁজিপতি বা মালিক শ্রেণি)। এরা কারখানা, ব্যাংক, জমি এবং উৎপাদনের উপকরণের মালিক ছিল।
দ্বিতীয়টি হলো Proletariat (প্রলেতারিয়েত; বাংলা: শ্রমিক শ্রেণি)। এদের নিজের উৎপাদনের কোনো উপকরণ ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের শ্রম বিক্রি করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না।
কার্ল মার্ক্সের মতে, আধুনিক সমাজের মূল দ্বন্দ্ব এই দুই শ্রেণির মধ্যকার সংঘাত। লুকাচ পরবর্তীকালে এই ধারণাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন।
পুঁজিবাদ কী?
লুকাচকে বোঝার জন্য Capitalism (ক্যাপিটালিজম; বাংলা: পুঁজিবাদ) শব্দটির অর্থ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
"Capital" (ক্যাপিটাল) শব্দের অর্থ হলো পুঁজি বা এমন সম্পদ যা ব্যবহার করে আরও সম্পদ তৈরি করা যায়।
পুঁজিবাদ এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন থাকে এবং উৎপাদনের প্রধান উদ্দেশ্য হয় মুনাফা অর্জন।
অর্থাৎ, একটি কারখানা যদি মানুষের প্রয়োজন মেটানোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় লাভের পরিমাণ বাড়াতে, তবে সেটি পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য বহন করে।
মার্ক্স এবং পরে লুকাচের মতে, পুঁজিবাদ শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি মানুষের চিন্তা, সম্পর্ক, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়কেও প্রভাবিত করে।
সাম্রাজ্যবাদ
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু অঞ্চল দখল করে।
একে বলা হয় Imperialism (ইম্পেরিয়ালিজম; বাংলা: সাম্রাজ্যবাদ)।
সাম্রাজ্যবাদ বলতে বোঝায়, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অথবা সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
শুধু ভূখণ্ড দখলই এর উদ্দেশ্য ছিল না। উপনিবেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ, নতুন বাজার তৈরি এবং সস্তা শ্রমশক্তি ব্যবহার করাও এর প্রধান লক্ষ্য ছিল।
লুকাচ এই সাম্রাজ্যবাদী যুগের মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলেন। ফলে তিনি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন কীভাবে অর্থনীতি ও রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
জাতীয়তাবাদের উত্থান
এই সময় ইউরোপে আরেকটি শক্তিশালী ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার নাম Nationalism (ন্যাশনালিজম; বাংলা: জাতীয়তাবাদ)।
জাতীয়তাবাদ এমন একটি মতবাদ, যেখানে মানুষ নিজেদের একটি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে একক জাতি হিসেবে কল্পনা করে এবং সেই জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি করে।
এই জাতীয়তাবাদ ইউরোপে অনেক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখলেও, একই সঙ্গে বহু যুদ্ধ ও সংঘর্ষের কারণও হয়ে ওঠে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
১৯১৪ সালে শুরু হয় First World War (ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার; বাংলা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ)।
এটি শুধু একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ইউরোপের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে দেয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সামাজিক হতাশা ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
লুকাচও এই সংকট প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতি সবসময় মানবমুক্তি নিয়ে আসে না; বরং তা ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে।
রুশ বিপ্লব
১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় Russian Revolution (রাশিয়ান রেভল্যুশন; বাংলা: রুশ বিপ্লব)।
এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, যেখানে বলশেভিকদের নেতৃত্বে জারতন্ত্রের পতন ঘটে।
এই বিপ্লব লুকাচের চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি মনে করতে শুরু করেন যে মার্ক্সের তত্ত্ব কেবল বইয়ের ধারণা নয়; বাস্তব সমাজেও তা রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে।
ইউরোপের দার্শনিক পরিবেশ
লুকাচের সময় ইউরোপে একসঙ্গে বহু দর্শনচর্চা চলছিল।
একদিকে ছিল Positivism (পজিটিভিজম; বাংলা: প্রত্যক্ষবাদ), যা বলত প্রকৃত জ্ঞান কেবল পর্যবেক্ষণ ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে অর্জন করা যায়।
অন্যদিকে ছিল German Idealism (জার্মান আইডিয়ালিজম; বাংলা: জার্মান ভাববাদ), যা মানুষের চেতনা, যুক্তি এবং ধারণার ওপর জোর দিত।
আবার Marxism (মার্ক্সিজম; বাংলা: মার্ক্সবাদ) সমাজকে ব্যাখ্যা করছিল অর্থনীতি, শ্রেণি এবং উৎপাদন সম্পর্কের আলোকে।
এই তিনটি ধারার সঙ্গে লুকাচ পরিচিত ছিলেন। তবে তিনি এগুলোর কোনোটিকেই হুবহু গ্রহণ করেননি। বরং তিনি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যেখানে ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক বাস্তবতা হিসেবে বোঝা যায়।
কেন এই প্রেক্ষাপট জানা জরুরি?
অনেকেই মনে করেন, লুকাচ হঠাৎ করেই "শ্রেণি-চেতনা" বা "বস্তুকরণ" নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন। বাস্তবে তা নয়।
তিনি শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন দেখেছেন।
তিনি পুঁজিবাদের উত্থান দেখেছেন।
তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন।
তিনি রুশ বিপ্লবের সাফল্য দেখেছেন।
আর এই চারটি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, মানুষ কেন নিজের সমাজকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারে না? কেন মানুষ এমন এক ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়, যা তাকে ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই তিনি তাঁর বিখ্যাত তত্ত্বগুলো নির্মাণ করেন।
চলবে...
পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করব লুকাচের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলা চিন্তাবিদদের নিয়ে। বিশেষভাবে আলোচনা হবে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, কান্ট, হেগেল, মার্ক্স, ম্যাক্স ভেবার এবং জর্জ সিমেলের চিন্তা কীভাবে লুকাচের দর্শনকে গড়ে তুলেছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।