Antonio Gramsci আধুনিক সমাজ রাজনীতি র দর্শনে এক পরিচিত নাম। আমার চিন্তাতে যারা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে তাদের মধ্যে আন্তোনিও গ্রামশি একজন। অনেকেই তার নাম প্রথম শুনছেন তবে যারা ফিলোসোফি নিয়ে ডিপ স্টাডি করেন তারা তাকে অবশ্যই চিনে থাকবেন। মিশেল ফুকোর সমপর্যায়ের তিনি ( অন্তত আমার দৃষ্টিতে) । সংক্ষিপ্ত আকারে আমি তার ফিলোসোফিক্যাল পজিশন নিয়ে এখানে আলোচনা করছি, এগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত বিভিন্ন অনলাইন আর্টিকেলে পেয়ে যাবেন।
তো চলুন শুরু করা যাক -
১. Cultural Hegemony
এটি গ্রামশির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। Hegemony অর্থ আধিপত্য বা নেতৃত্ব। আন্তোনিও গ্রামসি এই তত্ত্ব দ্বারা বুঝিয়েছেন যে -
কোনো শাসক শ্রেণি শুধু বলপ্রয়োগ করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। তারা শিক্ষা, গণমাধ্যম, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ধর্ম, পরিবার এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে এমন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে, যাতে সাধারণ মানুষ সেগুলোকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি সমাজে বারবার কোনো নির্দিষ্ট ধারণা বই, সংবাদ, সিনেমা ও শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচারিত হয়, তবে অনেক মানুষ সেটিকে প্রশ্ন না করেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে। গ্রামশি এই ধরনের সাংস্কৃতিক প্রভাবকে "হেজিমনি" বলে ব্যাখ্যা করেন।
২. Consent and Coercion
Consent (কনসেন্ট) = স্বেচ্ছায় সম্মতি
Coercion (কোয়ার্শন) = জোরপূর্বক বাধ্য করা
গ্রামশির মতে রাষ্ট্র দুটি উপায়ে চলে -
(ক) Coercion এর মধ্যে আছে সরাসরি বল প্রয়োগের প্রায়োগিক দিক, যেগুলো হলো - পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত,কারাগার ইত্যাদি । আমাদের আইনিগত ভাবে এই কাঠামো দ্বারাই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কাঠামোর মূল কাজ হলো ভয় ও শাস্তির মাধ্যমে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা।
(খ) Consent এর মধ্যে আছে - শিক্ষা, ধর্ম, পরিবার, সংস্কৃতি
সংবাদমাধ্যম ইত্যাদি । এগুলো মানুষের সম্মতি তৈরি করে।
গ্রামশির মতে, স্থায়ী ক্ষমতার জন্য সম্মতি তৈরি করা বলপ্রয়োগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আপনারাই চিন্তা করুন আওয়ামীলীগ সরকার দীর্ঘ সময় কিভাবে টিকে ছিল? অথবা বিশ্বের ক্ষমতাশালীরা কিভাবে টিকে থাকে? । ভারতের বিজেপি সরকার যে একটা স্বৈরাচারী দল এবং কট্ররহিন্দুপন্থি একটা দল এটা তো আমরা সবাই জানি , তারা কিভাবে এত শক্ত অবস্থানে আছে? এর জবাব হলো তারা ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছে । তারা সাধারণ হিন্দুদের থেকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে এই সম্মতি অর্জন করেছে যে " বিজেপি সরকার হিন্দুদের সরকার, তারা সব সময় হিন্দুদের রক্ষা করবে..."। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ক্ষমতাবানরা এভাবেই নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখে...... ।
৩. Civil Society and Political Society
গ্রামশি রাষ্ট্রকে দুটি ভাগে দেখেছেন।
(ক) পলিটিক্যাল সোসাইটি : এর মধ্যে আছে - সরকার
পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী সহ যাবতীয় রাষ্ট্র কাঠামো
(খ) সিভিল সোসাইটি : পরিবার,স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন সহ যাবতীয় সামাজিক কাঠামো। গ্রামশির মতে, সিভিল সোসাইটিই মানুষের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
এই দুই সোসাইটি মিলে আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পযন্ত তাদের চিন্তা ও সংস্কৃতিসহ যা আছে সবই নিয়ন্ত্রণ করে। যারা এই নিয়ন্ত্রণের থেকে বাহিরে আসতে চায় রাষ্ট্র তাদের প্রতমে সমাজ থেকে আলাদা করে ( মূলত কারাগারে নিক্ষেপ করে) যদি সেখানেও তাদের দমন না করা যায় তাহলে দুনিয়া থেকেই তাদের....... ।
৪. ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল VS অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল
গ্রামশির মতে, সব বুদ্ধিজীবী একই রকম নন।তিনি দুই ধরনের বুদ্ধিজীবীর কথা বলেন -
(ক)Traditional Intellectual
যারা নিজেদের নিরপেক্ষ মনে করেন, যেমন অনেক অধ্যাপক, লেখক বা ধর্মীয় নেতা। এরাই মূলত সরকারের হয়ে সমাজে সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সম্প্রচার করে। যুগ যুগ এই শ্রেণিগুলোই আমাদের সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসাবে দেখিয়ে আসছে আর আমরাও সেগুলো বিশ্বাস করে যাচ্ছি।
(খ) Organic Intellectual
যারা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি বা গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও সমস্যার ভিত্তিতে চিন্তা করেন এবং সমাজে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। এই অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ভারতের বাবাসাহেব আম্বেদকর । সে ছিল দলিত আন্দোলনের নেতা । জাতপাত, অস্পৃশ্যতা আর সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সারাজীবন লড়াই করছেন। দলিত, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করছেন । একটা সাধারণ ছেলে যে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমাজে ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন এনেছেন। আপাতত অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসাবে তার চেয়ে ভালো কারো কথা আমার মাথাতে আসছে না...... ।
৫. War of Position
গ্রামশি মনে করতেন, সব সমাজে সরাসরি বিপ্লব সফল হয় না।
তাই আগে মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করতে হবে।অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ করতে হয়। মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন এলে রাজনৈতিক পরিবর্তনও সহজ হয়ে যায়। তিনি একে "War of Position" বলেছেন।
এর উদাহরণ হিসাবে আমরা বাংলাদেশের ২৪ শে জুলাই গনঅভ্যুত্থানের কথাটা ধরতে পারি। ১৬ বছরের স্বৈরাচার সরকারের পতন হওয়ার পিছনে ওয়ার অ পজিশন বড় একটা ভূমিকা পালন করেছে। অন্য কোনো দিন না হয় এই তত্ত্ব নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে.... ।
৬. War of Maneuver
এটি হলো সরাসরি রাজনৈতিক সংগ্রাম বা বিপ্লব।
গ্রামশির মতে, পশ্চিম ইউরোপের মতো সমাজে "War of Position" ছাড়া সরাসরি বিপ্লব সাধারণত সফল হয় না। তিনি আরও বলেন যে সব ক্ষেত্রে যে এটা সফলও হবে সেরকমও না.... । এর ভালো উদাহরণ হলো আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০১৩ সালের সাপলা চত্বরের ঘটনা।
৭. Historic Bloc
গ্রামশির মতে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শুধু অর্থনীতি যথেষ্ট নয়।
একটি শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠে যখন -অর্থনীতি,রাজনীতি
সংস্কৃতি, শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ একসঙ্গে কাজ করে।
এই সমন্বিত কাঠামোকেই তিনি Historic Bloc বলেছেন।
৮. Passive Revolution
কখনও শাসকগোষ্ঠী বড় বিপ্লব এড়াতে কিছু সংস্কার করে, কিন্তু ক্ষমতার মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখে।গ্রামশি এই ধরনের ধীর, উপর থেকে পরিচালিত পরিবর্তনকে Passive Revolution বলেন। উদাহরণস্বরূপ আওয়ামীলীগ আমলের পদ্মা সেতু সহ অন্যান্য বড় প্রজেক্টগুলো যেগুলো দ্বারা তারা আমাদের ও বিশ্বাসিদের এটা বুঝাচ্ছিল যে আওয়ামিলীগ সরকার অনেক বড় বড় উন্নয়ন করছে কিন্তু বাস্তবতা হলো তারা ক্ষমতাতে থেকে লুটপাট করছে..... ।
৯. Common Sense
গ্রামশির মতে, সাধারণ মানুষের "কমন সেন্স" জন্মগত নয়।
এটি পরিবার, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।তাই "কমন সেন্স" সময় ও সমাজভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
১০. Philosophy of Praxis
প্র্যাক্সিস অর্থ চিন্তা ও বাস্তব কাজের সমন্বয়।গ্রামশি এই শব্দটি ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন যে দর্শন শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ -
একজন শিক্ষক ন্যায়বিচার সম্পর্কে পড়ান, এটি তত্ত্ব।
কিন্তু তিনি নিজেও ছাত্রদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করেন, এটি প্র্যাক্সিস। এই তত্ত্ব থেকে আমরা এটাও বুজতে পারছি যে ফেসবুকে বিভিন্ন প্রতিবাদমূলক পোস্ট করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না বরং মাঠেও সমান ভাবে সক্রিয় থাকতে হয়..... ।
তাঁর এই ধারণাগুলো আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, গণমাধ্যম অধ্যয়ন এবং সংস্কৃতি বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে, তাঁর চিন্তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে, এবং সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষই তাঁর তত্ত্বকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেন। তো এই ছিল দার্শনিক Antonio Gramsci এর ফিলোসোফি পজিশনগুলো। তার এক একটা তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। এখানে আমি শুধু তার মূল কথাগুলো পয়েন্ট হিসাবে নিয়ে এসেছি........
উপস্থাপক : প্রিন্স ফ্রেরাসে
Prince Frerase -
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।