জর্জ লুকাচ (Georg Lukács): জীবন, দর্শন ও উত্তরাধিকার
পর্ব ৩: জর্জ লুকাচের বৌদ্ধিক গুরু: যেসব দার্শনিক তাঁর চিন্তাকে গড়ে তুলেছিলেন
কোনো মহান দার্শনিক শূন্য থেকে জন্ম নেন না। তাঁর চিন্তা সবসময় পূর্ববর্তী দার্শনিকদের সঙ্গে এক ধরনের সংলাপের ফল। কেউ পূর্বসূরিদের অনুসরণ করেন, কেউ তাঁদের সমালোচনা করেন, আবার কেউ পুরোনো ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। জর্জ লুকাচও এর ব্যতিক্রম নন।
তিনি নিজে নতুন অনেক তত্ত্বের প্রবর্তক হলেও, তাঁর দর্শনের ভিত গড়ে উঠেছে কয়েকজন মহান চিন্তাবিদের ধারণার ওপর। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ইমানুয়েল কান্ট, জর্জ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল, কার্ল মার্ক্স, ম্যাক্স ভেবার এবং জর্জ সিমেল। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে গভীর প্রভাব ছিল হেগেল ও মার্ক্সের।
প্লেটো: আদর্শ সমাজের ধারণা
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো (Plato, উচ্চারণ: প্লেটো) মনে করতেন, আমরা যে জগৎ দেখি তা চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো Forms (ফর্মস; বাংলা: রূপ বা আদিরূপ) বা Ideas (আইডিয়াস; বাংলা: ধারণা)।
উদাহরণ হিসেবে, পৃথিবীতে হাজার রকম চেয়ার থাকতে পারে, কিন্তু "চেয়ার" ধারণাটি একটিই। প্লেটোর মতে, সেই আদর্শ "চেয়ার"-ই প্রকৃত বাস্তবতা, আর বাস্তবের সব চেয়ার তার অসম্পূর্ণ অনুকরণ।
লুকাচ প্লেটোর এই মত গ্রহণ করেননি। কিন্তু সমাজকে একটি সামগ্রিক রূপ (Whole বা Totality) হিসেবে দেখার প্রবণতার মধ্যে প্লেটোনীয় ঐতিহ্যের একটি দূরবর্তী প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায়।
অ্যারিস্টটল: মানুষ একটি সামাজিক সত্তা
অ্যারিস্টটল (Aristotle, উচ্চারণ: অ্যারিস্টটল) বলেছিলেন,
«"মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই একটি রাজনৈতিক প্রাণী।"»
এখানে "রাজনৈতিক" বলতে দলীয় রাজনীতি বোঝানো হয়নি। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, মানুষ একা নয়; সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যেই তার পূর্ণতা লাভ করে।
লুকাচও মানুষকে কখনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, একজন মানুষকে বুঝতে হলে তাকে তার শ্রেণি, সমাজ এবং ইতিহাসের ভেতরে স্থাপন করতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অ্যারিস্টটলের সামাজিক মানুষ ধারণার একটি সাদৃশ্য রয়েছে।
ইমানুয়েল কান্ট: জ্ঞানের সীমা
আধুনিক দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant, উচ্চারণ: ইমানুয়েল কান্ট) একটি মৌলিক প্রশ্ন করেছিলেন:
আমরা কীভাবে কিছু জানি?
এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত Epistemology (এপিস্টেমোলজি; বাংলা: জ্ঞানতত্ত্ব)।
Epistemology শব্দটি এসেছে গ্রিক epistēmē (জ্ঞান) এবং logos (আলোচনা) থেকে।
জ্ঞানতত্ত্ব হলো দর্শনের সেই শাখা, যেখানে আলোচনা করা হয়:
* জ্ঞান কী?
* জ্ঞানের উৎস কী?
* আমরা কীভাবে সত্যকে জানি?
* মানুষের জ্ঞানের সীমা কোথায়?
কান্টের মতে, মানুষ কখনো বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে জানতে পারে না। মানুষের মন নিজেই অভিজ্ঞতাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সাজায়।
লুকাচ এই ধারণা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, কিন্তু পরে মার্ক্সের প্রভাবে তিনি মনে করেন, মানুষের চিন্তাকে শুধু মনের গঠন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে হবে না; মানুষের সামাজিক অবস্থানও তার চিন্তাকে প্রভাবিত করে।
হেগেল: লুকাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষক
যদি প্রশ্ন করা হয়, লুকাচের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব কার, তাহলে উত্তর হবে হেগেল।
হেগেলের দর্শন না বুঝলে লুকাচকে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
হেগেলের দর্শনের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো Dialectic (ডায়ালেকটিক; বাংলা: দ্বান্দ্বিকতা)।
ডায়ালেকটিক কী?
"Dialectic" শব্দটি এসেছে গ্রিক dialegesthai থেকে, যার অর্থ "সংলাপের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান করা"।
কিন্তু হেগেলের কাছে ডায়ালেকটিক শুধু সংলাপ নয়; এটি বাস্তবতার পরিবর্তনের নীতি।
তাঁর মতে, পৃথিবীতে কোনো কিছু স্থির নয়। সবকিছু পরিবর্তিত হয়, আর এই পরিবর্তন ঘটে দ্বন্দ্বের মাধ্যমে।
অনেকে ডায়ালেকটিককে Thesis (থিসিস) → Antithesis (অ্যান্টিথিসিস) → Synthesis (সিন্থেসিস) সূত্রে ব্যাখ্যা করেন। যদিও হেগেল নিজে এই তিনটি শব্দ এভাবে ব্যবহার করেননি, তবু শিক্ষার্থীদের বোঝার জন্য এটি একটি কার্যকর মডেল।
উদাহরণ:
একটি ধারণা জন্ম নিল (থিসিস)।
তার বিপরীত ধারণা এল (অ্যান্টিথিসিস)।
দুয়ের সংঘর্ষ থেকে একটি নতুন ও উন্নত ধারণা তৈরি হলো (সিন্থেসিস)।
এই নতুন ধারণাই আবার নতুন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করবে। এভাবেই ইতিহাস এগিয়ে চলে।
লুকাচ এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে গ্রহণ করেন এবং পরে মার্ক্সবাদী ভিত্তিতে নতুনভাবে ব্যবহার করেন।
টোটালিটি (Totality)
হেগেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Totality (টোটালিটি; বাংলা: সামগ্রিকতা)।
এর অর্থ হলো, কোনো বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে বোঝা যায় না। একটি অংশকে বুঝতে হলে পুরো ব্যবস্থাকে বুঝতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি গাছের একটি পাতা বিশ্লেষণ করে পুরো বনকে বোঝা যায় না। বন, মাটি, জলবায়ু, সূর্যালোক এবং অন্যান্য গাছের সঙ্গে তার সম্পর্ক বুঝতে হবে।
লুকাচ এই ধারণাকে তাঁর পুরো দর্শনের ভিত্তি বানান। তাঁর মতে, একজন শ্রমিককে শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, পুরো পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
কার্ল মার্ক্স: হেগেল থেকে বস্তুবাদের দিকে
হেগেলের পরে লুকাচের সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিলেন কার্ল মার্ক্স।
মার্ক্স বলেছিলেন,
হেগেলের ডায়ালেকটিক সঠিক, কিন্তু তিনি এটিকে "মাথার ওপর দাঁড় করিয়ে" রেখেছেন। তাই এটিকে "পায়ের ওপর দাঁড় করাতে" হবে।
এর অর্থ কী?
হেগেল মনে করতেন, ধারণা ইতিহাসকে চালিত করে।
মার্ক্স বললেন, না। মানুষের বস্তুগত জীবন, উৎপাদন, শ্রম এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কই ইতিহাসের চালিকাশক্তি।
লুকাচ এই দুই চিন্তাকে একত্র করার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, সমাজকে বুঝতে হলে অর্থনীতি যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের চেতনা ও ইতিহাসও জরুরি।
ম্যাক্স ভেবার: যুক্তিকরণ
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার (Max Weber, উচ্চারণ: ম্যাক্স ভেবার) লুকাচের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।
ভেবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Rationalization (র্যাশনালাইজেশন; বাংলা: যুক্তিকরণ)।
আধুনিক সমাজে সবকিছু ধীরে ধীরে হিসাব, নিয়ম, দক্ষতা এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর অধীন হয়ে পড়ে। এতে দক্ষতা বাড়লেও মানুষ ক্রমশ যন্ত্রের মতো আচরণ করতে শুরু করে।
এই ধারণা থেকেই লুকাচ পরে তাঁর বিখ্যাত Reification (রেইফিকেশন; বাংলা: বস্তুকরণ) তত্ত্ব নির্মাণ করেন।
জর্জ সিমেল: আধুনিক জীবনের সংকট
জর্জ সিমেল (Georg Simmel, উচ্চারণ: জর্জ সিমেল) আধুনিক নগরজীবন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।
তিনি দেখিয়েছিলেন, বড় শহরে মানুষ হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও একাকী হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রতিস্থাপন করে।
লুকাচ এই পর্যবেক্ষণকে আরও বিস্তৃত করে বলেন, পুঁজিবাদে শুধু সম্পর্ক নয়, মানুষ নিজেকেও একটি "বস্তু" হিসেবে দেখতে শুরু করে।
উপসংহার
জর্জ লুকাচ কোনো একক দার্শনিকের অনুসারী ছিলেন না। তিনি প্লেটোর সামগ্রিক চিন্তা, অ্যারিস্টটলের সামাজিক মানুষ, কান্টের জ্ঞানতত্ত্ব, হেগেলের দ্বান্দ্বিকতা, মার্ক্সের বস্তুবাদ, ভেবারের যুক্তিকরণ এবং সিমেলের আধুনিক সমাজ বিশ্লেষণকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন।
কিন্তু তিনি কেবল তাঁদের পুনরাবৃত্তি করেননি। বরং এই সব চিন্তাকে একত্র করে বিংশ শতাব্দীর জন্য মার্ক্সবাদের একটি নতুন ব্যাখ্যা নির্মাণ করেন। সেই ব্যাখ্যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি প্রশ্ন:
কেন আধুনিক মানুষ এমন এক সমাজে বাস করে, যেখানে সে নিজেই নিজের তৈরি সামাজিক ব্যবস্থাকে চিনতে পারে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ History and Class Consciousness (হিস্ট্রি অ্যান্ড ক্লাস কনশাসনেস; বাংলা: ইতিহাস ও শ্রেণি-চেতনা) রচনা করেন, যা নিয়ে আমরা পরবর্তী পর্ব থেকে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।