জর্জ লুকাচ (Georg Lukács, উচ্চারণ: জর্জ লুকাচ) : জীবন, দর্শন ও উত্তরাধিকার
পর্ব ১ : জন্ম, পরিবার, শিক্ষা এবং একজন দার্শনিকের বৌদ্ধিক বিকাশ
আধুনিক মার্ক্সবাদ (Marxism, উচ্চারণ: মার্ক্সিজম) নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কয়েকটি নাম বারবার ফিরে আসে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জর্জ লুকাচ। তিনি শুধু একজন মার্ক্সবাদী দার্শনিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহিত্য-সমালোচক, নন্দনতত্ত্ববিদ, সমাজ-তাত্ত্বিক এবং ইতিহাসচিন্তক। বিংশ শতাব্দীতে মার্ক্সবাদকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে তাঁকে "পাশ্চাত্য মার্ক্সবাদের জনকদের একজন" বলা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে একজন ধনী ব্যাংকারের ছেলে ইউরোপের অন্যতম বিপ্লবী মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদে পরিণত হলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাঁর শৈশব, শিক্ষা এবং বৌদ্ধিক বিকাশের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
জর্জ লুকাচ ১৮৮৫ সালের ১৩ এপ্রিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। তখনকার ইউরোপ ছিল শিল্পবিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের দ্রুত পরিবর্তনের যুগ। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য এবং রাজনীতিতে নতুন নতুন মতবাদ জন্ম নিচ্ছিল। ফলে লুকাচ এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন, যখন ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ এক বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
তাঁর পিতার নাম ছিল জোজেফ লুকাচ (József Lukács)। তিনি একজন সফল ব্যাংকার ছিলেন এবং পরবর্তীকালে রাজকীয় উপাধিও লাভ করেন। তাঁর মা আদেল ভার্টহাইমার (Adel Wertheimer) ছিলেন একটি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা ইহুদি পরিবারের সদস্য। পরিবারটি আর্থিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই লুকাচ বই, শিল্প, সঙ্গীত, নাটক এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
এই পারিবারিক পরিবেশ তাঁর ভবিষ্যৎ চিন্তাজগত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ দার্শনিকরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠেন না; তাঁদের মানসিক ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ এবং সময়ের মধ্য দিয়ে। লুকাচের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছিল।
শিক্ষা জীবন
লুকাচ প্রথমে বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন (Law, উচ্চারণ: ল) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science, উচ্চারণ: পলিটিক্যাল সায়েন্স) অধ্যয়ন করেন। প্রশ্ন হতে পারে, পরে তিনি দর্শনের মানুষ হলেন, তাহলে আইন কেন পড়লেন?
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপের বহু বুদ্ধিজীবী প্রথমে আইন পড়তেন। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ, অধিকার, বিচার এবং ক্ষমতার কাঠামো বোঝার অন্যতম প্রধান পথ ছিল আইনশাস্ত্র। পরবর্তীতে তাঁদের অনেকেই দর্শন, সমাজবিজ্ঞান কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রবেশ করেন। তাই লুকাচের আইন অধ্যয়ন ছিল তাঁর বৌদ্ধিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
আইনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য, দর্শন এবং ইতিহাস নিয়ে স্বশিক্ষায় গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের লেখা পড়ে ফেলেন। বিশেষভাবে তাঁর আগ্রহ ছিল নাটক, ট্র্যাজেডি, নন্দনতত্ত্ব এবং ইতিহাসের দর্শনের প্রতি।
পরবর্তীতে তিনি জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় তখন ইউরোপের দর্শনচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সেখানে তিনি সেই সময়ের বহু খ্যাতিমান পণ্ডিতের বক্তৃতা শোনেন এবং সমসাময়িক দার্শনিক বিতর্কের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন।
জার্মান ভাববাদ (German Idealism)
লুকাচের বৌদ্ধিক বিকাশ বোঝার জন্য প্রথমে "জার্মান ভাববাদ" কী, তা বোঝা জরুরি।
German Idealism (জার্মান আইডিয়ালিজম; বাংলা: জার্মান ভাববাদ) ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে জার্মানিতে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী দার্শনিক আন্দোলন।
এখানে "Idealism" শব্দটি অনেককে বিভ্রান্ত করে। দৈনন্দিন জীবনে "আদর্শবাদী" বলতে আমরা যে অর্থ বুঝি, দর্শনে তার অর্থ ভিন্ন।
দর্শনে Idealism বলতে বোঝায়, বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষেত্রে মন, চেতনা, ধারণা বা বুদ্ধির ভূমিকা মৌলিক। অর্থাৎ মানুষের চিন্তা ও চেতনা বাস্তবতাকে বোঝার কেন্দ্রীয় উপাদান। এর অর্থ এই নয় যে বস্তুজগৎ নেই; বরং প্রশ্ন হলো, বাস্তবতাকে আমরা কীভাবে জানি এবং তার ভিত্তি কী।
এর বিপরীতে Materialism (ম্যাটেরিয়ালিজম; বাংলা: বস্তুবাদ) মনে করে, বস্তু বা ভৌত জগৎই মৌলিক; মানুষের চেতনা ও চিন্তা সেই বস্তুজগতের ফল।
এই দ্বন্দ্বই আধুনিক দর্শনের অন্যতম প্রধান বিতর্ক। পরে কার্ল মার্ক্স এই ভাববাদী ঐতিহ্যের অনেক ধারণাকে গ্রহণ করলেও তার ভিত্তিকে বস্তুবাদী রূপ দেন। আর লুকাচ এই দুই ধারার মধ্যকার সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
হেগেলের প্রভাব
লুকাচের ওপর সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন জার্মান দার্শনিক জর্জ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল।
হেগেলের মতে, ইতিহাস কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়; বরং এটি যুক্তিসংগত একটি বিকাশপ্রক্রিয়া। মানুষের সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি এবং চিন্তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন সংঘটিত হয় দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ এবং তার অতিক্রমণের মাধ্যমে। পরবর্তীকালে এই ধারণাকেই সাধারণভাবে "ডায়ালেকটিক" বা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বলা হয়।
লুকাচ ছাত্রজীবনেই হেগেলের রচনাগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। যদিও তিনি তখনও মার্ক্সবাদী ছিলেন না, তবুও হেগেলের ইতিহাসচিন্তা, সামগ্রিকতা (Totality), পরিবর্তনের ধারণা এবং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি তাঁর চিন্তার ভিত তৈরি করে দেয়।
নন্দনতত্ত্বের প্রতি আকর্ষণ
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে লুকাচ মূলত সাহিত্য ও শিল্প নিয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর প্রথমদিকের লেখাগুলোতে উপন্যাস, ট্র্যাজেডি, শিল্প এবং মানুষের অস্তিত্বগত সংকট নিয়ে আলোচনা দেখা যায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো Aesthetics (এস্থেটিক্স; বাংলা: নন্দনতত্ত্ব)।
নন্দনতত্ত্ব হলো দর্শনের সেই শাখা, যেখানে সৌন্দর্য কী, শিল্প কী, একটি শিল্পকর্ম কেন আমাদের প্রভাবিত করে, সাহিত্য বা চিত্রকলার মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হয়, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়। লুকাচের পরবর্তী সাহিত্যতত্ত্ব বুঝতে হলে নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা অপরিহার্য।
মার্ক্সবাদের দিকে যাত্রা
প্রথম জীবনে লুকাচ নিজেকে মার্ক্সবাদী মনে করতেন না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ইউরোপের সামাজিক সংকট এবং ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তাঁর চিন্তায় গভীর পরিবর্তন আনে। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে সমাজকে শুধু নৈতিকতা বা শিল্পের আলোকে ব্যাখ্যা করলে যথেষ্ট নয়; অর্থনীতি, শ্রেণি এবং উৎপাদন সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই উপলব্ধিই তাঁকে ধীরে ধীরে কার্ল মার্ক্সের দর্শনের দিকে নিয়ে যায়। তবে তিনি অন্ধভাবে মার্ক্সকে অনুসরণ করেননি। বরং হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি এবং মার্ক্সের বস্তুবাদকে মিলিয়ে আধুনিক মার্ক্সবাদের এক নতুন ব্যাখ্যা নির্মাণের চেষ্টা করেন। এই কারণেই পরবর্তীকালে জর্জ লুকাচকে পাশ্চাত্য মার্ক্সবাদের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
চলবে...
পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব, লুকাচ যে ইউরোপে বড় হয়েছিলেন, সেই ইউরোপের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং দার্শনিক পরিবেশ কেমন ছিল এবং কেন সেই পরিবেশ তাঁর চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।