সংশোধন
ইসলামিক ধারাবাহিক _গল্প
১০ম_এবং_শেষ_পর্ব
________________________________________
📃👉সেদিন ডাক্তারের কাছে কিছু পরীক্ষা করতে গিয়েছিলাম। ডাক্তার আমার নাম জিজ্ঞাস করাতে আমি নিজের নাম সুমাইয়া ইয়াসির বলি তখনই ইয়াসির আমার অরজিনাল নাম সুমাইয়া আহমেদ বলে। আমার কিছুটা খারাপ লেগেছিল। যেহেতু সবাই বিয়ের পর বরের নামেই নাম দেয়, স্বাভাবিকভাবে আমিও তাই চাইতেই পারি, তাছাড়া আমি ইয়াসিরকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।
বাসায় পৌছার পর বলি,
--কেন তোমার নামের সাথে আমার নাম দিলে না?
: কারণ এভাবে দেওয়া ঠিক নয়, হাদীসে নিষেধ আছে। নিজের পিতা ছাড়া অন্য কারো নাম দেওয়া নাজায়েজ।
--কিন্তু আমি তো, জাস্ট প্রেসক্রিপশনে দিয়েছি, আমার সার্টিফিকেট, কাবিননামা সবকানেই তো আমার আসল নামটাই আছে। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি বলেই দিয়েছি।
: তার মানে তুমি তোমার বাবাকে ভালোবাস না?
বা আমার চেয়ে কম ভালোবাস?
--না কখনোই না। বাবাকেও প্রচণ্ড ভালোবাসি, বাবা আমার হৃদপিন্ড হলে তুমি সেই হৃদপিন্ডের নিশ্বাস। এভাবে তুলনা করাটা ঠিক নয়।
অনেকটা রেগেই গেলাম।
ইয়াসির খুব ঠান্ডা আওয়াজে, আমার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বললেন,
--আচ্ছা ওইসব বাদ দিই, একটা কথা বলি, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হলেন রাসুল (স)আর উনাকে উনার স্ত্রী আর সাহাবীদের থেকে বেশি কেউই ভালোবাসতে পারবে না। উনার স্ত্রীরা কেউ কি নিজেদের নামের সাথে উনার নাম যুক্ত করেছেন? অথচ উনার স্ত্রীদের কাছে দুনিয়ার সবকিছু থেকেই উনি প্রিয় ছিলেন।
উম্মুল মোমিনিনদের জন্য তাদের স্বামী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু তারা নামের পরিবর্তন আনেননি আমরা কেন করবো? আমাদের ভালোবাসা তো তাদের চেয়ে খাটি কখনোই হতে পারে না।
সবচেয়ে ইনপর্টেন্ট ধর কেউ বিয়ের পর স্বামীর নামের সাথে নাম লাগিয়ে দিয়েছে, তাদের ডিভোর্স হলে পুনরায় আগের নাম মানে পিতা প্রদত্ত নামে ফিরে যেতে হবে। কি দরকার শুধু শুধু নাম চেইঞ্জ করার।
তুমি যে বললে, সার্টিফিকেটে চেইঞ্জ করনি, শুধুই প্রেসক্রিপশনে চেঞ্জ করেছ, এটাও উচিৎ হবে না। কারণ ওই প্রিয় নবিজীর আমলে কিন্তু সার্টিফিকেট ছিল না তাও তারা বদলায়নি।
.
---আচ্ছা বুঝলাম, ইয়াসির তুমি আমার জীবনে না এলে আমার জীবনটাই অপূর্ণ থেকে যেতো। আমার জীবনে কতকিছু যে জানার আছে। আমরা অধিকাংশ মানুষ ধার্মিকতা বা ধর্ম বলতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা রোজাকেই বুঝি এর বাইরেও যে কত কিছু জানার আছে।
হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো, সাধারণত এই সময়ে বৃষ্টি হয়না বললেই চলে। গ্রামের দিকে হালকা শীত পড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টি আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি, প্রচণ্ড। এদিকে আমার সাইনাসের প্রব্লেম। সাইনাসের প্রব্লেম বেড়ে যাওয়ার আশংকায় হয়তো ইয়াসির আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে নিষেধ করবে। কিন্তু আমি তো মহা জিদ্দি, ইয়াসিরের কথা শুনবই না। ইয়াসিরকে ছাদে যাওয়ার অনুরোধ করার আগেই সে বললো,
: সুমু চলো, ছাদে যাই। মওসুমের মজা নিই। এই সময় ছাদে কেউ থাকে না। দুজনে মিলে বৃষ্টি বিলাস করবো
-- উফফ ইয়াসির, আমি পাগল হয়ে যাবো আজ খুশিতে।
আমি ভাবতেও পারছি না তুমি বৃষ্টি ভালোবাস।
: হুম অবশ্যই আমি বৃষ্টি ভালোবাসি, বৃষ্টি আল্লাহর রহমত স্বরুপ।
হাদীসে আছে,
আনাস (র)বর্নিত, তিনি বলেন,
"আমরা রাসুল (স)এর সঙ্গে থাকাকালে একবার বৃষ্টি নামল। রাসুল (স)তখন তাঁর পরিধেয় প্রসারিত করলেন, যাতে পানি তাকে স্পর্শ করতে পারে। আমরা বললাম, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি বললেন, কারণ তা আমার রবের পক্ষ থেকে এই মাত্রই এসেছে।" (মুসলিম:৮৯৮)
বৃষ্টির দোয়া:
"আল্লাহুম্মা সায়্যিবান নাফি'আন।"
হে আল্লাহ! মুষলধারায় উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।(বুখারী, ২/৫১৮)
রাসূল (সা.) বলেছেন, দুই সময়ের দোয়া কখনো ফেরত দেওয়া হয় না। কিংবা তিনি এভাবে বলেছেন যে, দুটি সময় রয়েছে, যখন দোয়া করলে তা খুব কমই ফেরত দেওয়া হয়- এক. আজানের সময় যে দোয়া করা হয়।
দুই. বৃষ্টি চলাকালীন সময়ে যে দোয়া করা হয় । অন্য বর্ণনায় এসেছে, রণাঙ্গণে শত্রুর মুখোমুখি হওয়া কালের দোয়া। [আবু দাউদ : ২৫৪০]
.
দোয়া কবুলের এত সহজ মাধ্যমকে আমারা কীভাবে হেলায় ফেলে নষ্ট করতে পারি? বলো?
--ওহ ইয়াসির, কী শুনালে, আমি তো আমার ইসলামকে আরো বেশি ভালোবেসে ফেলেছি এবং বৃষ্টিকেও।
: শুধু আমিই বাদ, সবাই ভালোবাসা পায় আমি ছাড়া।
--উফফ ইয়াসির তোমার লম্বা দাড়িওয়ালা অবয়বকে তো আমি এত এত বেশি ভালোবেসেছি, বুঝাতে পারব না।
অথচ জানো যখন তুমি প্রথম দাড়ি রেখেছিলে আমার মোঠেও ভালো লাগেনি।
একদিন আমার এক বান্ধবী তার বরকে নিয়ে এফবিতে পিক দিলো, দেখলাম ওর বর দাড়ি রেখেছে। কৌতূহল বশত জিজ্ঞাস করলাম। ওর উত্তর শুনে আমি থ হয়ে গেলাম। সে বললো, আজকাল দাড়ি ছাড়া ছেলেদের নাকি আনস্মার্ট লাগে, মেয়ে মেয়ে লাগে। অথচ আমার ইসলাম আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্ব থেকেই স্মার্ট।
আমার ইয়াসিরকে নিয়ে আমার বুকটা ভরে গেলো। স্মার্টনেসের জন্য, দাড়ি না রেখে রাসুল (স)এর খুশির জন্য পরিপূর্ণ সুন্নতি দাড়ি রেখেছ। জানো তো, ইসলামকে যতই জানতেছি ততই ইসলামকে ভালোবেসে ফেলতেছি।
--তা তো অবশ্যই, তুমি যতই ইসলাম নিয়ে লেখাপড়া করবে ততই জানতে পারবে। আর যত ইসলামকে জানবে ততই ইসলামকে ভালোবাসবে।
সেই অনেক অনেক বছর আগের ইসলাম মানব জাতির জন্য কমপ্লিট জীবন বিধান।
কী নেই তাতে? সাংসারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় সব।
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম,
--রাজনৈতিক?
: হুম রাজনৈতিক। জানো, দুনিয়ার সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান হলো "মদিনার সনদ"
--কী বলো ইয়াসির, আমার ইসলাম এত পরিপূর্ণ?
ইয়াসির, তোমার কসম করে বলছি, তোমাকে আমার নিজের জীবন, নিজের সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমার কোন ভালো কাজ আল্লাহর পছন্দ হয়েছে বলেই তোমার মত একজন স্বামী পেয়েছি। আমি ধন্য।
: তোমাকে একটা হাদীস বলি,
রাসুল (স)বলেছেন,
সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। কারো যদি শপথ করতেই হয়, তবে সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে’।(বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৪০)
অপর হাদীসে রাসুল (স) বলেছেন,
যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে কসম করল, সে শিরক করল’।(আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৩৪১৯)
অপর এক হাদীছে রাসুল (স) বলেছেন,
‘যে আমানত বা গচ্ছিত দ্রব্যের নামে কসম করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।
(আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৪২০)
---কিন্তু ইয়াসির, আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেককেই সন্তানের মাথায় হাত রেখে, স্বামীর মাথায় হাত রেখে কসম খেতে দেখেছি। তারা খুব সহজেই এই ধরণের কসম করে।
: এই এরা নিজের অজান্তে শিরকের মত গুনাহে লিপ্ত। আল্লাহ সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন আমিন।
: আমিন।
এই এভাবেই ইয়াসির এমনকি উনার পরিবারের কাছ থেকেও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীন শিখে যাচ্ছি। আমার দৃষ্টিতে এই পরিবারের প্রতিটি অনু পরমাণুতে রাসুলের সুন্নত পরিলক্ষিত হয়। তাও উনাদের দেখি আরো বড় হাদিস গ্রন্থ পড়তে। বলেন, এখনো দ্বীনের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের বালু পরিমাণ জ্ঞানও অর্জন করতে পারলাম না। সুবহানাল্লাহ।
আজ অনেকগুলো বছর কেটে গেলো এই গোঁড়া পরিবারটার সাথে। এবং আমি নিজেই সাথে আমার মা বোনও যারা আগে বাইরে বের হওয়ার সময় নিজেকে কত সুন্দর দেখানো যায় প্রতিযোগিতা করতাম তারা আজ পুরোপুরি খালাম্মা সেজে( মানে ঢিলাঢালা বোরখা) পড়ে চলাফেরা করি।
আমাদের সুখের সংসার আর এই নির্লোভ মানুষগুলোকে দেখে আমার পরিবার ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করে। সত্যিকারের দ্বীনদার শুধু নিজে দ্বীনদার থাকে না। পুরো পরিবারের মধ্যেই পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে সেটা জোর করে বা কারো সাথে অথবা কোন পরিবারের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য নয়। মহান রবকে ভালোবেসেই নিজেদের জীবনে পরিবর্তনটা চলে আসে।
আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে আমার দ্বিতীয় সন্তান সাত মাসের পেটে ছিলো। একদিকে প্রথম সন্তানের বয়স মাত্র আড়াই বছর অন্যদিকে সাত মাসের প্রেগন্যান্সি। আমার বড় সন্তানের পুরো দায়িত্বটাই আমার শাশুড়ি মা পালন করেছিলেন। হ্যা, ইনিই হয়ে গিয়েছিলেন আমার সন্তানের মা। তাকে খাওয়ানো, গোসল, ঘুম পাড়ানো সব। এমন সিচিউশনে আমি অনেককে দেখেছি বাবার বাড়িতে চলে যায়। যদিও আমার বাবার বাসা নয় তলাতেই ছিলো, তাও আমার শাশুড়ি আমার সন্তানকে মা'য়ের কাছে রেখে আসেনি। আর ইয়াসির তো এমনিতেই আমাকে রাণী বানিয়ে রেখেছিলো। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সে আমাকে এত বেশি সহয়তা করতো নিজেকে সত্যি সত্যি রাণী ভাবতাম।
মেয়েরা নাকি নিজের বরের মধ্যে বাবার ছায়া খুঁজে। আমি বলবো সত্যিকারের ইসলাম মানা, নবীর (স)অনুসরণ কারী স্বামীর চেয়ে উত্তম কেউ হতে পারে না।
আমার রবের শুকরিয়া কীভাবে আদায় করবো? আমার মত উচ্ছৃঙ্খল, জিদ্দি এক মেয়েকে পরিপূর্ণ দ্বীনের পথে আনার জন্য আমার জীবনে এমন একটি পরিবারের সাক্ষাত দিয়েছেন।
আমাদের এই একটুখানি সংসার জীবনেও অনেক অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি। যখনই পরীক্ষা এসেছে একে অপরকে সাহারা, শক্তি
মানসিক সাপোর্ট দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। যতবারই পরীক্ষা এসেছে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেছি। কারণ যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন পরীক্ষা না আসে,
মনে হয় আল্লাহ আমাদের প্রতি নারাজ নয়তো।
.
(একজন বোনের দ্বীনে ফেরার বাস্তব গল্প)
:
:
.সমাপ্ত..........🔴
✔পুরো গল্পটা কেমন লাগলো পুরো গল্পটা জন্য একটা কমেন্ট চাই
যদি পারেন একটু কষ্ট করে বলবেন গল্প টা থেকে কি কি শিখতে পারলেন?
লেখা ও উপস্থাপনা: আল-মামুন রেজা 🖊
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।