সংশোধন
♨ইসলামিক ধারাবাহিক গল্প ♨
৩য়_পর্ব
📃নাস্তা করে, হালকা একটু সাজলাম, জাস্ট হালকা! যেন মুখে কিছুই দেয়নি এমন তবে দেখতে ফ্রেশ লাগবে। আমার বোন তানহা মহা ফাজিল, সে কীভাবে যেন বুঝে গেলো আমি সেজেছি, মায়ের সামনে বললো,
: কী ব্যপার আপু, তুমি এই টাইমে এমন সুন্দর করে সাজছো কেন? আজকাল তোমার মনে এতো রঙ লেগেছে কেন? নিশ্চয় প্রেমে পড়েছ? মা, মা, দেখো তোমার মেয়ে যে কিনা সবসময় বলে, আমি এমনিতেই সুন্দরি আমার সাজগোজের দরকার নেই, সে কীভাবে এত সাজলো!
--দিবো একটা থাপ্পড়, সাজলাম কোথায়? চোখে আজকাল একটু বেশিই দেখিস।
মা'ও আমাদের সাথে কথায় যোগ দিয়েছে বললো,
: কোথাও যাবি?
--মা একটু নয় তলায় যাবো। তাসনির সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। বারবার যেতে বললো।
তানহা আবার বললো,
: হ্যা, হ্যা, ওই বাসায় একটা ছেলেও আছে।
--তানহা তুই চুপ করবি?
বলে উঠে ইয়াসিরের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, দরজা টোকা দেওয়ার সাথে সাথেই দরজা খুলে দিলেন মায়াবি চেহারার এক বয়স্ক মহিলা, বুঝতে পারলাম ইনি ইয়াসিরের মা। আমাকে দেখেই হাসিমুখে সালাম দিয়ে, বললেন,
: আসো মা, আসো,
তো কেমন আছ? বাসার সবাই কেমন আছে?
চেয়েছিলাম আমি উনাদের সালাম দিয়ে একটু ইমপ্রেস করবো কিন্তু ইনিই আগে সালাম দিয়ে দিলেন।
--জ্বী ভালো, আপনার শরীর কেমন?
: আমিও আলহামদুলিল্লাহ, তুমি বসো মা; আমি তাসনিকে ডেকে দিচ্ছি।
মনে মনে বললাম, আমি তো ইয়াসিরের কাছেই এসেছি। উনাকেই ডেকে দিন।
ইয়াসিরের আম্মা কী যেন ভেবে বললেন,
: আচ্ছা তুমি বরং তাসনির রুমেই বসো।
আমি উনার সাথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তাসনির রুমে ইয়াসিরের রুমের সামনে দিয়েই যেতে হয়। ইয়াসিরের রুম বুঝতে পারলাম, রুমের দরজা হালকা খোলা ছিলো, ভিতর থেকে কোরান তেলওয়াতের আওয়াজ আসছিলো। আমি কৌতুহল বশত জিজ্ঞাস করলাম,
--আন্টি এই টাইমে কোরান তেলওয়াত করছেন কেন?
: আসলে মা, ইয়াসির এই টাইমে অফিসেই থাকে, ওর বাবাকে ব্যবসায় হেল্প করে। আজ ওর শরীরটা তেমন একটা ভালো নয় তাই বাসায়। আর মাগরিবের নামাজের পর সুরা ওয়াকিয়া পড়াটা ভালো।
জানি না কেন ইয়াসির অসুস্থ শুনে আমার মনটা ধক করে উঠলো। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো একটু ইয়াসিরের রুমে যেতে, উনাকে দেখতে, একটু কথা বলতে!
আন্টি আমাকে তাসনির রুমে দিয়ে চলে গেলেন। তাসনি সালাম দিয়ে সাধারণ কিছু কথাবার্তার পর দুইটা বই হাতে দিয়ে বললো,
: আপু, এই বই দুটি ভাইয়া আপনাকে দিয়েছেন।
--শুকরিয়া, আমাকে তুমি করেই বলিও। আপনি করে বললে কেমন পর পর লাগে।
: ঠিক আছে আপু।
পুরো বাসাটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। আমার অভ্যাসটা এমনই কারো বাসায় গেলে বাসাটা কীভাবে সাজিয়েছে দেখতে ইচ্ছে করে, চমৎকারভাবে গুছানো, পরিপাটি! জানালায়, বেসিনে, রান্নাঘরে সবখানে মানি প্ল্যান্ট! বেশ শৌখিন মানুষ যিনি ঘরটা সাজিয়েছেন হয়তো তাসনি। ইয়াসির আর তাসনির বেডরুমের মাঝখানে দুইটি খালি দেয়াল, বড় একটা অংশ খালি জায়গা, দুই দেয়ালেই দুইটা বুক শেলফ; ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত। দেশ, বিদেশের অসংখ্য বই। ঠিক বুক শেলফের সামনে এসেই আমি থমকে দাঁড়ালাম! চমৎকার মোহনিয় পরিবেশ, ইচ্ছে হচ্ছিলো এখানে বসে আমিও বই পড়ি!
তাসনি বললো,
: পুরো বাসাটা ভাইয়াই সাজিয়েছে। আমরা বাসায় আসার আগে ভাইয়া বাসাটা নিজের মতো করে গুছিয়েছে।
আমি কিছুটা সুযোগ পেয়ে গেলাম ইয়াসিরকে দেখার। সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। বললাম,
--তো যিনি এতো সুন্দর করে ঘরটা সাজিয়েছে উনার রুমটা কেমন দেখতে পারি?
: কেন নয়! চল আপু,
ইয়াসিরের রুমে গিয়ে দেখলাম উনি চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম করছিলেন। উনি হটাৎ আমাকে দেখে শুয়া থেকে উঠে বসলেন, সালাম দিয়ে বললেন,
: আপনি ভালো আছেন তো?
--আমি তো আছি, কিন্তু আপনি তো ভালো নেই।
তাসনি: ভাইয়া তোমরা গল্প করো আমি নাস্তা নিয়ে আসতেছি।
বলেই তাসনি চলে গেলো,
যদিও ইয়াসির তাসনিকে বলেছিলো,
: উনাকে নিয়ে যাও, ড্রয়িংরুমে বসাও।
তাসনি শুনেনি না কি না শুনার ভাণ করে চলে গেলো বুঝতে পারলাম না।
আমি জানি উনার গায়ে হাত দিয়ে জ্বর উঠেছে কি না দেখাটা উনি পছন্দ করবেন না। তাও আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম,
--শুনেছি আপনি অসুস্থ,
বলে কপালে হাত দিতে নিছিলাম, উনি পিছনে সরে যাওয়াতে আমি উনার গায়ের উপর পড়ে গেলাম। উনি খুব বেশি বিব্রত হয়ে পড়েন। আমাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন; আমি একটু রাগ দেখিয়ে বললাম,
--এখান থেকে উঠবো না, সরে যেতে চেয়েছেন তাই এমন হয়েছে। একদম সরব না। জানেন না আমি কতটা জিদ্দি মেয়ে।
তাসনির আসার আওয়াজ পেয়ে, বেচারা ইয়াসিরের চেহারা এমন ভীতু হয়ে গিয়েছিলো, আহা! খুব মায়া লাগছিলো।
বললেন,
: উঠুন দয়া করে, তাসনি দেখলে কী মনে করবে? আর এটা অনুচিত।
--কী অনুচিত? হু, কি অনুচিত? একদম উঠবো না। তাসনি দেখুক।
এটা বললেও মনে মনে সংকোচ হচ্ছিলো। একপাশে গিয়ে বসলাম। বেচারা ইয়াসির যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো!
ইয়াসিরের ঘরটা দেখে আরো বেশি ইয়াসিরের প্রেমে পড়ে গেছি, কী দারুণ গুছানো। পড়ার টেবিল, টেবিলের বই, খাট, একদম সবকিছুই। আমি নিজে কিছুটা অগোছালো কিন্তু একজন পুরুষ এতো পরিপাটি কীভাবে হয়।
খুব সন্তর্পণে উনার নাম্বারটা নিয়েছি, উনারই মোবাইল থেকে। ইচ্ছে হচ্ছিলো একটা ছবি তুলে রাখি।
তাসনি নাস্তা নিয়ে আসার পর ইয়াসির বললেন,
: তাসনি উনাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে যা।
আমি: কিন্তু আমাকে যে জন্য আসতে বললেন, তার কিছুইতো বললেন না।
: বই দুটো পড়লেই বুঝতে পারবে।
--বইগুলো কি ফেরৎ দিতে হবে?
: না, এগুলো তাসনির পক্ষ থেকে গিফট।
: ভাইয়া তুমি নিজে কিনে আমার নাম দিচ্ছ কেন?
আহা! যেন চুরি করে ধরা পড়েছেন মতো করে উনার মুখটা একেবারে শুকিয়ে গেলো।
সেদিন বাসায় এসে, ইয়াসিরের এসব কথা মনে পড়ে মুচকি মুচকি হাসছিলাম। মা সেটা লক্ষ্য করে বললো,
: কী রে এভাবে মুচকি হাসছিস কেন?
-- না মা এমনিতেই।
মনে হচ্ছে ইয়াসিরের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। এমনিতেই উনার উপর আমি ক্রাশ খেয়েছি। এখন মনে হচ্ছে আরো গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছি। উনার ব্যক্ত্বিত্ব, জোড়া ভ্রু, চওড়া বুক, লম্বা হাইট, সুন্দর ঠোঁটের মিষ্টি হাসি, শ্যামলা গায়ের রঙ, সুন্দর আচরণ, উনাদের বাড়ির পরিবেশ সবকিছুই আমাকে উনার প্রতি গভীর ভালোবাসায় পাগল করে দিচ্ছিলো।
আমি বারবার উনার সাথে দেখা করার বাহানা খুঁজতাম। আমি উনার প্রতি যতই আগ্রহী হই, উনি তার চেয়ে দ্বিগুণ অনাগ্রহে পিছিয়ে যায়। এক দুইদিন পর পর উনাকে কল দিতাম, অংকগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রথমে বেশ কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু সেদিন আমি উনার বাসায় গিয়ে উনার মায়ের সামনেই বললাম,
--আপনি আমাকে এই অংকগুলো একটু বুঝিয়ে দিবেন? আমি আসলে পরিসংখ্যানে খুব কাঁচা, যদি নিয়ম করে একটু পড়াতেন উপকৃত হতাম।
: দেখুন, আমার সময় হয়ে উঠে না। খুব ব্যস্থ থাকি।
আন্টি বললেন,
: একটু সময় বের কর না বাবা, মেয়েটা এত করে বললো একটু শিখিয়ে দিলে কি এমন হয়?
: মা তুমি জানো, আমি খুব কম সময় পাই।
: একটু চেষ্টা কর বাবা।
: আচ্ছা, ঠিক আছে, ভোর ছয়টার দিকে পারবেন?
হায় আল্লাহ বলে কি, ছয়টায় মা ছাড়া বাসায় কেউ ঘুম থেকেই উঠে না। কি বলবো? অনেক কষ্টেই তো উনি রাজী হয়েছেন। এখন কি করি? হঠাৎ করেই বলে ফেললাম,
--আচ্ছা, তাহলে আমি আগামীকাল থেকে আসি?
: আচ্ছা ওকে।
ইচ্ছে হচ্ছে খুব জোরে একটা লাফ দিই। বাসার বাইরে এসে ইয়া হু বলে চিৎকার দিলাম। কেউ দেখলে নির্ঘাত আমাকে পাগল বলবে।
রোজ উনার বাসায় আসতাম, কিন্তু কখনো উনাকে একা পেতাম না। প্রতিদিন তাসনিও আমাদের সাথেই পড়তো। উফফ খুব বিরক্ত লাগতো। তাসনি কোচিংয়ে চলে গেলেও ইনি আন্টিকে ডেকে আনতেন।
একদিন ভার্সিটি ফেরার পথে লিফটে উনাকে পেয়ে গেলাম, আমাকে দেখলেই উনি কেমন যেন ইতস্তত করতে থাকেন। বিশেষ করে যখন আমি আর উনি ছাড়া কেউ থাকে না। প্রতিদিনের ক্ষোভ একসাথে এসে আমার মাথা আগ্নেয়গিরির মতো অগ্লোৎপাত হচ্ছিলো। যে কোন সময় বিস্ফোরণ হতে পারে।
উনাকে নিয়ে আবার নীচের দিকে নিয়ে গেলাম, উনি আপত্তি করেছিলেন, বললাম,
--কোন কথা বলবেন না, চুপচাপ আমার সাথে চলুন।
বেচারা আরো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। ইশ! উনার এই ধরণের অবস্থার চেহারাটা দেখলে দারুণ লাগে। ইয়াসির কিছু না বলে আমার পিছুপিছু লিফট থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো।
বাগানে বসার মত বেঞ্চ দেওয়া আছে, ওইখানে বসে, উনাকে বসতে বললাম,
উনি বললেন,
: সমস্যা নেই, আমি দাঁড়াচ্ছি আপনি বলুন।
--আচ্ছা, আপনি কি আমাকে ভয় পান? না আন্টিকে বা তাসনিকে বেশি ভালোবাসেন তাই আমাকে পড়ানোর সময় কাউকে না কাউকে বসিয়ে রাখেন।
ইয়াসির আচমকা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
: ভয় পাবো কেন?
--আমিও তো সেটাই বলছি কেন ভয় পান আমাকে? আমি বাঘ না ভাল্লুক?
: আসলে ভয় পাই বলা যায় তবে আপনাকে নয়; ভয় পাই আল্লাহর বিধানকে, রাসুল (সঃ) এর বিধানকে।
--এখানে আবার আল্লাহ, রাসুল (সঃ) কীভাবে আসলেন? কী যে বলেন আপনি ইয়াসির! আমার মাথায় আসে না।
: শুনুন, হাদীসে আছে, রাসুল (সঃ) বলেন,
মাহরাম পুরুষ ছাড়া যেন কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে মিলিত না হয়।”
[সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৪১]
রাসূল (সা

আরো বলেন, সাবধান! কোন (পর)
পুরুষ যেন কোনো (পর) নারীর সাথে নির্জনে
অবস্থান না করে। কেননা যখনই তারা (নিরিবিলিতে)
মিলিত হয়, শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয় এবং
(উভয়কে) কুকর্মে লিপ্ত করানোর প্রচেষ্টায়
সে তাদের পিছু লেগে যায় ( তিরমিজি শরিফ)।
.
বুঝতে পেরেছেন? কেন মা বা তাসনিকে সাথে রাখি। আমি সবে মাত্রই দ্বীনে ফিরেছি। আমার ঈমান এখনো মজবুদ হয়নি। শয়তান উৎপেতে আছে আমাকে যে কোন সময় বিপথগামী করার জন্য। আমি শয়তানকে সুযোগ দিতে চাই না
উফফ এই পাগল কী বলে, আমি উনার প্রেমে যে হাবুডুবু খাচ্ছি। সেটা কী উনি একটুও বুঝেন না। না কি বুঝেও না বুঝার ভাণ ধরেন বা ধর্মীয় বিধি নিষেধ উনাকে বাধা দিচ্ছে? যাই হউক আমি আল্লাহর কাছে কিছুই চাইনি, সবকিছু না চাইতেই পেয়ে গেছি। কিন্তু এখন আল্লাহর কাছে ইয়াসিরকে চিরজীবনের জন্য পেতে চাই।
:
:
;
চলবে,,,
. উপস্থাপনা: আল-মামুন রেজা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।