সংশোধন
ইসলামিক ধারাবাহিক গল্প
রোমান্টিক> পর্ব-৯
📃বিয়ের পর বুঝতে পেরেছি ইয়াসির খুব স্নেহপরায়ণ স্বামী। ওকে আমি যতটুকু আবেগহীন মনে করেছি আসলে সে ছিলো তার পুরোটায় উল্টো। এই ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানে না টাইপের মানুষটির মধ্যে এত ভালোবাসা, আবেগ বুঝতেই পারিনি।
বিয়ের রাতেই ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মাথায় কারো ভালোবাসার স্পর্শ পেলাম, খুব স্নেহময়ী কণ্ঠে ডাকতে লাগলো,
: সুমু, এই সুমু উঠো, আজানের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠলেই আমরা তাহাজ্জুদ নামাজটা পড়তে পারবো।
-- ক'টা বাজে?
: এই তো, আজানের সময় হয়ে এলো। নামাজের পরে আবার ঘুমাতে পারবে। একটু কষ্ট করে উঠো, দেখবে বেশ ভালো লাগবে।
-- তোমার সাথে কষ্ট তো কষ্টই না। তোমায় নিয়ে আমি আগুনেও ঝাপ দিতে পারবো।
: এভাবে বলো না। বলো, তোমায় নিয়ে আমি জান্নাতে যাবো। ইন শা আল্লাহ। জানো হাদীসে কি আছে?
হজরত আবু হুরায়রা (রা)বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.)বলেন: ‘আল্লাহ তাআলা সেই স্বামীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং তাঁর স্ত্রীকে জাগান। যদি তিনি উঠতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁর মুখমণ্ডলে পানির ছিটা দেন। আল্লাহ তাআলা সেই স্ত্রীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং তাঁর স্বামীকে জাগান। যদি তিনি উঠতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁর মুখমণ্ডলে পানির ছিটা দেন। (আবু দাউদ ও নাসায়ি, আলফিয়্যাহ, হাদিস: ৪০৭)।
আমরা চাইলেই কিন্তু এমন স্বামী স্ত্রী হতে পারি। কি পারি না?
-- হুম জনাব, এই উঠলাম।
বলে আবার ইয়াসিরের হাতটা জড়িয়ে ধরে ঘুমের ভান ধরে থাকলাম।
: সুমু, নামাজের পর আমাকেও পাবে, এখন কিন্তু শুধু হাতটাই পাচ্ছ।
বলেই সে হেসে উঠলো। ইয়াসিরের হাসিটা যে এত মিষ্টি ইচ্ছে করে ওই হাসিতেই নিজেকে লুকিয়ে রাখি। হারিয়ে যাই ওই হাসির গভীরে। আগে তো কখনো ওর হাসিটা দেখিনি।
তাহাজ্জুদ নামাজের পর আযান হলে, সে মসজিদে চলে যায়। যাওয়ার সময় বলে গেলো তুমিও নামাজ পড়ে নাও।
ইয়াসির এসে বললো, চলো সুমু কোরান তেলাওয়াত করি।
আমি একটু ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে বললাম,
-- না আমার ঘুম আসছে, আমি ঘুমিয়ে পড়ি? প্লীজ প্লীজ প্লীজ। কাল থেকে পড়বো।
:!শুধু একটু খানি পড়লে হবে। মাত্র কয়েক আয়াত, কোন সমস্যা নেই।
কারণ কোরানে আছে,
সূর্য ঢলে পড়ার সময় থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করুন এবং ফজরের সময় কোরআন তেলয়াওয়াত (জারি রাখবে)। নিশ্চয় ফজরের কোরআন পাঠ (সহজে) পরিলক্ষিত হয়।------সূরা বনী ইসরাঈল:৭৮
-- এখানে তো জারি রাখার কথা বলা হয়েছে,
: তুমি একেবারে না পড়ার চেয়ে নিয়মিত কয়েক লাইন পড়ো সেটাই উত্তম।
কারণ হাদীসে আছে,
রাসুল ( সা)বলেন, আল্লাহ্ তা'আলার নিকট প্রিয় ঐ আমল যা নিয়মিত করা হয় যদিও তা পরিমাণে কম হয়। সহীহ বুখারীঃ ৪১ , ৬০২০
সুতরাং ফজরের নামাজ পড়ে কয়েক লাইন কোরান তেলাওয়াত করে আমরা বিশ্রাম নিতেই পারি।
ওর কথায় যাদু ছিলো, না পড়ে পারলাম না।
বিয়ের পরের দিন সকাল আট টায় ইয়াসির আমাকে আস্তে আস্তে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললো, : সুমু উঠো, তোমার পরীক্ষার কিন্তু মাত্র পনের দিন বাকী। উঠে পড়তে বসো।
আমি জেগেই ছিলাম, ওর আতরের সুগন্ধি মাখানো লোমশ বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে বেশ লাগছিলো। তাই জেগেও শুয়েই ছিলাম।
আমিও উঠতে যাবো সেই মুহুর্তে ইয়াসিরের বোন তানহা নাস্তা করার জন্য ডাকতে আসলো।
ইয়াসিরের পরিবারে শাড়ী পরার তেমন রীতি নেই ফোল হাতা, বড় ওড়না সহ থ্রী পিস পড়ে সবাই। আমিও হালকা কমলা কালারের থ্রীপিস পড়ে বাইরে বের হলাম। দেখলাম তাসনি নাস্তা নিয়ে এসে বললো,
: ভাবী, মা বললো তোমরা তোমাদের রুমেই নাস্তা করো।
আমি আর ইয়াসির দুজনেই প্রায় একসাথেই বলে উঠলাম,
--না না, আমরা আসতেছি,
: আসতে হবে না, নাস্তা হাজির।
বলেই রুমে নাস্তা দিয়ে গেলো।
ইয়াসিরের দিকে তাকিয়ে দেখি, ইনি মুচকি মুচকি হেসে যাচ্ছেন। ইয়াসিরের ঠোঁটের এই হাসির জন্য আমি পাগল। বললাম,
-- এভাবে হেসে যাচ্ছো কেন?
: না এমনিতেই,
-- বলো কেন? নয়তো,,,,,,
: আচ্ছা বলছি, আসলে আমার বউটাকে আরো কিছুক্ষণ প্রাণ ভরে দেখতে পারবো তাই হাসছি।
-- দেখতে হবে না, আগে আমাকে খাইয়ে দাও। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে গতকাল দুপুরেই ভাত খেয়েছিলাম। এরপর হালকা কিছুই। খাইয়ে দাওনা,,,,,
একটু আহ্লাদী স্বরে বললাম। ইয়াসির প্লেট হাতে নিয়ে পরম মমতায় আমাকে খাইয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ইয়াাসির আর আমার বয়সের ব্যবধান খুব বেশি নয়। তবুও সে আমাকে এমন ভাবে ট্রিট করে যেন আমি খুব বাচ্চা কেউ, খুব স্নেহের কেউ।
সে আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর আমি তার নুরানি, নিষ্পাপ, পবিত্র চেহারার দিকে অবাক নয়নে তাকিয়ে আছি। ওই চেহারায় এত মায়া কেন? কেন আমাকে এত টানে? ওর উজ্জ্বল, শ্যামলা রঙয়ের দাড়িওয়ালা মায়াবী চেহারা আমাকে পাগল করে তুলে। ওর লোমশ বুকে মাথা রেখে অন্ততকাল কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
দুজন নাস্তা সেরে, ইয়াসির এক প্রকার জোর করেই পড়তে বসালো। কিন্তু পড়াই কি আমার মন বসবে?! আমি ওর মধ্যেই মত্ত!!
টেবিলে বসলাম, সবচেয়ে কঠিন সাবজেক্ট, পরিসংখ্যান নিয়ে বসালো। সে আমাকে অংকগুলো করতে দিয়ে পাশে বসে আছে। ওর ভালোবাসায়, ওর উপস্থিতিতে আমি অংকের 'অ'ও করতে পারলাম না। সে খানিকটা মিষ্টি বিরক্তের ভাণ করে আবার আমাকে বুঝাতে লাগলো। আর আমি এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। আমার মাথায়, এই মুহুর্তে শুধু ইয়াসির ছাড়া কেউই নেই।
শেষে বলেই ফেললাম,
--আজ পড়বো না, কাল থেকে শুরু করি।
: নাহ, আজ থেকেই পড়তে হবে।
আমি ন্যাকা কান্না কেঁদে বললাম,
-- দুনিয়াতে কোন বর বিয়ের পরের দিনই বউকে পড়তে বসাইছে কি না আমার জানা নেই। তুমি এমন আনরোমান্টিক, নিষ্টুর কেন?
তুমি কী বুঝ না? আমার মন তোমার সাথে সময় কাটানোর জন্য অস্থির হয়ে আছে। তোমার ভালোবাসার জন্য পাগল হয়ে আছে!
: আমাকে এমন করতে হয় কারণ আমি, তোমার বরের পাশাপাশি তোমার টিচারও। তোমার ভালো রেজাল্টেরও দায়িত্ব আমার উপর।
---আচ্ছা বাবা, কাল থেকেই পড়বো।
ইয়াসির আমাকে একটা বই গীফট করলো,
"মওলানা আশারাফ আলী থানবির স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন"
বললো,
: সময় পেলে পড়িও।
দুপুরে আমি আর ইয়াসির বারান্দায় বসে বসে গল্প করছিলাম, জুহুরের আজানের পরপরই ইয়াসির আমায় বললো,
: সুমু জুহুরের নামাজ পড়ে নাও, আমি মসজিদে গেলাম।
-- অহ, ইয়াসির, কোথায় নতুন বিয়ে করা সুন্দরি বউকে নিয়ে সময় কাটাবে, তুমি মসজিদে চলে যাচ্ছ? বাসায় নামাজ পড়া যায় না!? আর এত তাড়াতাড়ি পড়তে হবে কেন? মাত্রই তো আজান হলো, একটু পরেও পড়া যায় না?
কোরানে আছে,
-“তোমরা নামায পড়ো নামাযিদের সাথে।” অর্থাৎ তোমারা জামাতসহকারে নামায পড়ো। (সূরা বাকারা)
রাসুল (স)বলেন,
- “জামাতের সাথে নামাযে সাতাশ গুণ বেশি পূণ্য নিহিত রয়েছে। ” (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি)
তিনি আরো বলেন,- “একা নামায পড়া অপেক্ষা দু’জনে জামাতে নামায পড়া উত্তম। দু’জন অপেক্ষা বহুজন মিলে জামাতে নামায পড়া আল্লাহর কাছে আরো বেশি পছন্দনীয় এবং উত্তম। ” (আবু দাউদ)
“রসূল (স.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমল সমূহের মধ্যে কোন আমল সর্বাধিক উত্তম? তিনি উত্তরে বলেন, আউয়াল ওয়াক্তে সলাত আদায় করা।” - সূনান আবূ দাউদ হা-৪২৬
আমাদের উচিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুল (স)এর সুন্নাতের অনুসরণ করা।
--আচ্ছা বুঝলাম। ওকে তুমি যেভাবে শিখিয়ে দিবে সেভাবে হবে।
সেদিন রাত্রে শাশুড়ি আম্মা আমাকে, ১০ ভরি ওজনের স্বর্ণের কমপ্লিট সেট উপহার দিলেন। যা আমার দেন মোহরের বাইরে। আমার দেন মোহর খুব কমই ছিলো, বর্তমান সময়ের দেন মোহরের চার ভাগের একভাগও না। যা বিয়ের রাতেই ইয়াসির পরিশোধ করে দেন।
আমার আত্নীয়দের মধ্যে অনেকেই বলেছিলেন, আমাকে ঠকানো হচ্ছে, উনাদের তো সামর্থ্য আছে চাইলেই দেন মোহর বাড়িয়ে দিতে পারেন! কিন্তু সুযোগ পেয়ে ইচ্ছে করেই দিচ্ছেন না।
আমার আপত্তি ছিল না বলেই সবাই চুপ হয়ে ছিলেন।
সেদিন ঘুমাতে বিছানায় যাওয়ার আগে ইয়াসির বললেন,
: সুমু তোমার কি মন খারাপ হয়, তোমার দেন মোহর কম বলে?
আমার বাবা মায়ের সামর্থ্য আছে তোমাকে যত ইচ্ছা তত দিতে পারে কিন্তু আমার সামর্থ্য নেই।
উনারা তোমাকে যত খুশি গিফট করুক। আমার যখন সামর্থ্য হবে আমিও তোমাকে যত ইচ্ছা গিফট করবো। পরীর মত করে তোমাকে সাজাবো।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“এবং তোমরা নারীদেরকে দাও তাদের মোহর খুশি মনে। এরপর তারা যদি স্বেচ্ছায় স্বাগ্রহে ছেড়ে দেয় কিছু অংশ তোমাদের জন্য তাহলে তা স্বাচ্ছন্দে ভোগ কর।” (সূরা নিসা)
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান বলেন, আমি আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, নবী (স)কী পরিমাণ মোহর দিয়েছেন? তিনি বললেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদেরকে সাড়ে বারো উকিয়া অর্থাৎ পাঁচ শ’ দিরহাম মোহর দিয়েছেন। (মুসলিম ১৪২৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২১০৫; সুনানে নাসায়ী ৬/১১৬, ১১৭)
উম্মুল মুমিনীনদের মাঝে উম্মে হাবীবা রা.-এর মোহর বেশি ছিল। তাঁর মোহর ছিল চার হাজার দিরহাম। হাবশার বাদশাহ নাজাশী তাঁকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন এবং মোহরও তিনিই পরিশোধ করেছিলেন।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২১০৭; সুনানে নাসায়ী ৬/১১৯
রাসুল (স)বলেন,
"সে বিয়ে অধিক বরকতময়, যে বিয়েতে খরচ কম হয়"
তাই মোহর অধিক হওয়া উচিত নয় যাতে খুশিমনে পরিশোধ করা যায় তেমনটাই হওয়া উচিত।
আমি অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছি, কোন মানুষ কি করে এত ভালো হতে পারে। এত সুন্দর করে বলতে পারে।
ইয়াসির আমাকে নিয়ম করে সকাল সন্ধ্যা দুইবার পড়াতে বসায়, আমি পড়ার দিকে খেয়াল কম ওর দিকে বেশি তাকিয়ে থাকি। সেদিন বললো,
: এত অমনোযোগী কেন? পড়তে বসালে খেয়াল কোথায় থাকে?
--কেন তুমি বুঝ না? আমার সমস্ত মনযোগ তোমার মধ্যেই আটকে থাকে। তুমিই তো বলেছিলে,
রাসূল (সা)বলেছেন, "যখন স্বামী - স্ত্রী একে অপরের দিকে প্রেম এবং মহব্বতের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে তখন আল্লাহ তায়ালা ও তাদের উভয়ের প্রতি রহমতের দৃষ্টি বর্ষণ করেন ।
[বুখারীঃ ৬১৯, তিরমীযিঃ১৪৭৯]
তবে এখন তাকাতে নিষেধ করছো কেন? বকা দিচ্ছো কেন?
বলে খানিকটা মন খারাপ করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
ইয়াসির বই, খাতা বন্ধ করে হাতটা ধরে বিছানায় নিয়ে এসে বললো,
: আচ্ছা ঠিক আছে, এবার বসো,
বলেই অপলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো, বললাম,
-- এভাবে কী দেখছো?
: আল্লাহর রহমত পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তুমিও দেখ যত খুশি তত। দেখ, এরপর কিন্তু পড়ালেখা।
-- অহ, পড়ালেখার কথা এখন বাদ দাও, এখন শুধু ভালোবাসা।
: শুধু দেখে কিন্তু ভালোবাসা হয় না, ভালোবাসার জন্য অনেক কিছুর দরকার হয়। আর অনেক কিছু লাগবে।
বলে সে আমার কাছে আসতে চাচ্ছিলো,
--আর কিছুই পাবে না,
বলে দৌড়ে পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম,,,,,,
:
:
:
চলবে,
উপস্থাপনায় : আল-মামুন রেজা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।