সংশোধন
ইসলামিক ধারাবাহিক গল্প
১ম_পর্ব
(
গল্পটিতে অবিবাহিত যুবক ছেলে মেয়েদের জন্য অনেক শিক্ষামূলক বিষয় রয়েছে সম্পূর্ণ গল্প পড়ার অনুরোধ রইল)
(
একজন দীনদার ছেলে ও মর্ডার মেয়ে)
👉আজ আমার বিয়ে! বিয়ে হলে মেয়েদের মনে আলাদা একটা আনন্দ থাকে, ভালোলাগা থাকে, স্বপ্ন থাকে কিন্তু আমার এই মুহুর্তে কোনটায় কাজ করছে না! না, না আমি কাউকে ভালোবাসি না! আমার মন খারাপের কারণ আমি যথেষ্ট সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও কেন যেন মনে হয় আমার বর আমাকে ভালোবাসতে পারেনি। যদিও আমি তাকে অনেক আগেই আমার মনটা দিয়ে বসে আছি!
.
আমার বর ইয়াসির। ইয়াসির আর আমাদের এপার্টমেন্ট একই বিল্ডিংয়ে। ইয়াসির, তার মা-বাবা এক ছোটবোনকে নিয়ে নয়তলায় থাকে। আর আমরা, আমি ছোট বোন আর বাবা- মা সহ ছয় তলায় থাকি। আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, খুবই আদরের মেয়ে এবং খুব জিদ্দি। এক প্রকার নিজে যা বুঝি তাই করি। তবে হ্যাঁ! বাবা মা বলেন আমার মনটা নাকি খুব ভালো! জানি না কথাটা কতটুকু সঠিক।
.
একদিন লিফট দিয়ে নীচে নামার সময় ইয়াসিরের সাথে দেখা। সে এমন একটা ভাব দেখায় যেন লিফটে সে ছাড়া আর কেউ নেই। নীচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে যে একটা সুন্দরি, স্মার্ট মেয়ে আছে সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই! নিজেকে কী মনে করে? আমি খুব অপমানিত বোধ করলাম। যেখানে ভার্সিটির সব ছেলেরা সুমাইয়া বলতে পাগল, সেখানে এই ছেলে আমাকে হাই, হ্যালো করা তো অনেক দূর, ফিরেও তাকালো না!
আমি নিজেই তাকে বললাম,
--হ্যালো আমি সুমাইয়া।
: জ্বী আমি ইয়াসির,
নীচের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলো।
বললাম,
--আমি ছয় তলায় থাকি,
: জ্বী জানি,
--জানেন! কীভাবে?
অনেকটা অবাক হয়েই বললাম!
: আপনি ছয় তলা থেকেই তো লিফটে উঠলেন।
উফফ, রাগে এই সাধারণ বিষয়টাও মাথা থেকে ছুটে গেলো। বললাম,
--আপনি কয় তলায়?
: নয় তলায়।
এতগুলা কথা বললাম, একবারও আমার দিকে দেখলো না। আমার মতো সুন্দরী মেয়ের দিকে মেয়েরাও বারবার ফিরে তাকায়। আর ইনি কি? পুরুষ তো?
লিফট নীচ তলায় নেমে গেলো, আমি ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, ইনি কী করেন? কোথায় যাচ্ছেন জানা হলো না।
যাক, এতটুকু তো অন্তত জানা হলো।
বিল্ডিংয়ের ছাদে খুব সুন্দর বাগান। সব ফ্লাটের বাসিন্দারা এখানে গাছ লাগিয়েছে, বলা যায় সবাই এর পরিচর্যা করে। আমিও একটি মেহেদী গাছ, কিছু ফুলের গাছ, এ্যলোভেরা আর একপাশে কিছু পুদিনা লাগিয়েছি। আমার খুব পছন্দ পুদিনার ঘ্রাণ, এল্যোভেরা আমার রুপচর্চার কাজে লাগাই।
.
প্রতিদিন বিকালে এগুলোতে পানি দিতে যাই।
সেদিন গিয়ে দেখি ইয়াসিরও আছে সেখানে! আমি খুব অবাক হই! এর আগে কখনো তাকে ছাদে দেখিনি। সে বোধহয় আমাকে লক্ষ্য করেনি, কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করলাম,
--কেমন আছেন?
: আসসালামু আলাইকুম, জ্বী আলহামদুলিল্লাহ।
আমি কেমন আছি জানার প্রয়োজন মনে করলো না। চরম অপমান বোধ করলাম। লোকটি এমন আজব কেন?
আবার নিজেই বললাম,
--কী গাছ লাগিয়েছেন?
: আমি লাগাইনি, আমার ছোট বোনের গাছ। আজ সে ছিলো না বলে আমাকে আসতে হলো।
--আপনার ছোট বোন কি তাসনি? একবার কথা হয়েছিলো। বলেছিলো, নয় তলায় থাকে। আগে কখনো দেখিনি আপনাদের!
: আসলে আমরা এখানে এসেছি মাত্র দুই মাস হলো, আগে ভাড়া বাসায় থাকতাম। তাসনির কলেজ কাছে হওয়ায় ফ্লাট তৈরি হওয়ার পরও আসিনি। তাসনির ইন্টার পরীক্ষার পর পরই এখানে চলে আসি। ওকে রেটিনা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিই।
--অহ, আর আপনি কি করেন?
: আমি আপাতত বেকার।
--মানে?
: আসি, বাসায় অনেক কাজ।
বলে সালাম দিয়ে তরতর করে নেমে গেলো! একপ্রকার পালিয়েই চলে গেলো! এতক্ষণে খেয়াল করলাম, আমি গাছে পানি না দিয়ে ইয়াসিরের সাথে কথা বলে যাচ্ছি।
আমি আমার কাজ শেষ করে, বাসায় আসলাম। বাসায় এসে একটুও শান্তি পাচ্ছিলাম না, নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে, আমি মানুষ তো! আমার দিকে একটু তাকালে কী এমন হয়?
আমিও তাকে না দেখার ভান করে চলে যাবো, যদি কখনো দেখা হয়। তার আগে ইয়াসিরের বোনের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। ইয়াসির সম্পর্কে সব কিছু জানতেই হবে। সে নিজেকে কি মনে করে যে, আশেপাশের অন্যদের মানুষই মনে করে না! মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি আমাকে কী করতে হবে।
সময় কিছুতেই কাটতে চাচ্ছে না, মন চাচ্ছে আগামীকাল বিকালটা এক্ষুণি হয়ে যাক। আর আমি ছাদে তাসনির সাথে একটু কথা বলতে পারবো। তাসনি না আসুক ইয়াসিরতো আসবেন। এসেও বা কী লাভ, উনি তো কথা বলতে চান না, নিজেকে নায়ক মনে করেন। তাও আমিই কথা বলবো। পরেরদিন সময়ের একটু আগেই ছাদে চলে গেলাম। আমি যাওয়ার বেশ খানিক সময়ের পর ইয়াসির আসলেন। উনি আসতে দেরী করাতে আমি আগেভাগে গাছে পানি দিয়ে ফেলেছি, চুল খোলা রেখে বিকালের স্নিগ্ধ বাতাস উপভোগ করছিলাম। আমার চোখটা দরজার দিকেই ছিলো, অধৈর্য হয়ে ইয়াসির বা তাসনি কারো জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ইয়াসির হঠাৎ করে ঢুকে কেমন একটু ইতস্তত করে থমকে দাঁড়ালো! উনাকে দেখেই কেমন জানি আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো, জানি না কেন? হয়তো আমাকে এড়িয়ে চলতে চাচ্ছে। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিলো,
: আসসালামু আলাইকুম।
আমার দিকে না তাকিয়েই বললো, আমি সালামের উত্তর দিয়ে বললাম,
--আজ এতো দেরী করলেন কেন?
: আমি এই সময়টাতেই আসি, আসরের নামাজের পরপরই তো আসি। মসজিদ থেকে আসতে একটু দেরী হয়ে যায়। আর তাছাড়া আমি বলেছি তো আমি সবসময় আসি না, তাসনি ব্যস্ত আর আমার পর্যাপ্ত সময় তাই আসা হচ্ছে।
ওহ ইনি তাহলে নামাজও পড়েন। হুম দেখেও খুব ভদ্র, শান্ত মনে হয়। শুনেছি নামাজি ছেলেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালই হয়।
কিন্তু এইবারও ইয়াসির আমার দিকে তাকালো না, খুব রাগ হলো। কিছুটা আওয়াজ বড় করে বললাম,
-- আচ্ছা আপনি নিজেকে কী মনে করেন?
: মানে?
--এই যে এতোবার আপনার সাথে আমার দেখা হলো একবারও আমার দিকে তাকিয়েছেন? যদি কখনো রাস্তায় বিপদে পড়ি তবে চিনতে পারবেন আমাকে? কেন এতো ভাব নেন হুহ?
আর আমার সাথে নিজে থেকে কখনো কথা বলেছেন? আমি কি এতই সস্তা?
: এটা ভাব নয়, ইসলামের বিধান।
--মানে?
: মানে ইসলামের বিধান মতে কোন গায়রে মাহরাম মানে যাদের সাথে বিয়ে হতে পারবে এমন মহিলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা যাবে না।
--আমিও ধর্ম মানি কিন্তু এসব আজব নিয়ম আমার ভালো লাগে না। দেখলে কী হয়? যে দেখাও যাবে না। ইসলামে মেয়েদের এত নিকৃষ্ট করা হয়েছে কেন?
: এটা নিকৃষ্ট করা হয়নি। দামী করা হয়েছে। খুব দামী বলেই যে কেউ দেখতে পারবে না। যে কেউ কথা বলতে পারবে না।
--আচ্ছা, এইজন্য পালিয়ে বেড়ান? যাক এসব কথা, একটু সময় হবে? কিছু জানতে ইচ্ছুক!
: জ্বী বলুন।
--কী করেন বলা যাবে কী?
: জ্বী, মাস্টার্স দিয়ে, বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করছি।
--কোন বিষয় নিয়ে অনার্স করেছেন?
: একাউন্টিং।
--আরে আমিও একাউন্টিং এর ছাত্রী।
বাহ দারুণ!
আমি অনেকটা আনন্দিতো হয়ে বললাম।
কিন্তু ইনি কেমন জানি চেহারা গোমড়া করে ফেলেছেন। মাগরিবের আজান পর্যন্ত আমি উনাকে এটা সেটা বলে আটকে রেখেছি।
উনি আজানের সাথে সাথেই সালাম দিয়ে চলে গেলেন, যাওয়ার সময় বলে গেলেন, মাগরিবের নামাজ পড়ে নিবেন। আর মেয়েদের মাথায় কাপড় থাকলেই নিস্পাপ, পবিত্র, সুন্দর দেখায়।
বয়ে গেছে আমার। আমি এমনিতেই সুন্দর, এর চেয়ে বেশি সৌন্দর্যের দরকার নেই।
কেন জানি না, আপনা আপনিই মাথায় কাপড় দিতে ইচ্ছে হলো। আমি নিজেই খুব অবাক হয়ে গেলাম, সত্যি আমাকে দারুণ লাগছে! আমি জানি আমি সুন্দরী কিন্তু মাথায় কাপড় দিলে যে সে সৌন্দর্য্য আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে তা কখনোই মনে আসেনি। খানিকটা লজ্জা পেয়ে গেলাম।
ইয়াসিরের সাথে লিফটে আবার দেখা, এবারও তিনি বিব্রত! কী অদ্ভুত! আমাকে দেখে এভাবে বিব্রত হওয়ার কী আছে? আমি বাঘ না ভাল্লুক খেয়ে ফেলবো! নীচের দিকে তাকিয়েই থাকলো, এতোদিন পর দেখা কোথায় কেমন আছি জিজ্ঞাস করবে! সালাম দিয়েই চুপ হয়ে গেলো! বরাবরের মতো আমিই বললাম,
--কেমন আছেন? এতোদিন পরে দেখা? বাসায় ছিলেন না বুঝি?
: জ্বী আলহামদুলিল্লাহ, ঢাকায় গিয়েছিলাম। আপনি ভালো আছেন?
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি! আমি কেমন আছি জিজ্ঞাস করতে যেন খুব কষ্ট হলো!
--আমিও ভালো আছি, আমি মনে মনে আপনাকে খোঁজছিলাম।
: কেন?
--আসলে পরিসংখ্যানের অংক গুলোতে আমার কেমন জট লেগে যায়। এই বিষয়ে আপনার কাছে একটু আসতে চাচ্ছিলাম। আপনি কোন টাইমে ফ্রি থাকেন বলেন, আমি ওই টাইমেই আসবো!
: আসলে আমি সারাদিনই ব্যস্ত থাকি। বাসায় ফিরতে রাত দশটা বেজে যায়।
এভাবে কথা বলতে বলতে গাড়ির পার্কিং পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম।
আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, ওইদিনও উনার সাথে এই সময়েই দেখা হয়েছিলো, আজও এই সময়েই। তার মানে উনি এই সময়েই বাসার বাইরে যান।
আমি নিয়মিত ক্লাস না করলেও শুধু উনার সাথে দেখা হওয়ার জন্যই নিয়মিত ক্লাসে যেতে শুরু করলাম, প্রায় সময়ই উনার সাথে দেখা হতো। মাঝেমাঝে দেখা না হলেও আমি পার্কিংয়ে অপেক্ষা করতাম। যখনই উনি নামতেন আমি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতাম, যেন উনাকে দেখিইনি! উনি একপাশ দিয়ে চলে যেতে চাইতেন কিন্তু আমি হাটতে হাটতে উনার পাশে চলে যেতাম, উনি এটা বুঝতে পেরে আরো এক পাশে ঘেসে যেতেন। একবার তো এমন হয়েছিলো, আমি এলোপাথাড়ি হাটতে হাটতে উনার একেবারে গায়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছি উনি কোন সিনেমার নায়কের মতো আমাকে ধরে ফেলবেন; পড়তে দেবেন না। এমনকি আমাকে তোলার জন্য হাতটাও বাড়িয়ে দিলেন না। এমন নির্লিপ্ত মানুষ আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। আমার ভার্সিটির যে কোন ছেলে হলে দৌড়ে আসতো। বরং কে আমাকে হাত এগিয়ে দেবে তার প্রতিযোগিতা করতো। আমার খুব রাগ হলো, বললাম,
--আপনি নিজেকে খুব বড় কেউ মনে করেন? না আমাকে খুব নীচু কেউ মনে করেন। আমার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলে আপনার হাত পচে যেতো!! কী অদ্ভুত মানুষ আপনি!
: দুঃখিতো, আজ খুব বিজি, আসতেছি।
বলে সালাম দিয়ে চলে যাচ্ছিলো, আমি বললাম,
--দাঁড়ান,
:
:
:
.চলবে,,,,,,
লেখা ও উপস্থাপনা : আল-মামুন রেজা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।