সংশোধন
ইসলামিক ধারাবাহিক গল্প
৮ম_পর্ব
📃বলেতো দিয়েছি পাঁচ দিন, পাঁচ দিন কীভাবে কাটাবো? পরেরদিন ফজরের আগে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আল্লাহকে খুব করে বললাম। আমি আল্লাহর কাছে ইয়াসিরকে চাইনি কিন্তু সে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছিলো সেভাবে দোয়া করেছি।
সে বলেছিল তাহাজ্জুদ এমন এক নফল নামাজ (যেটা না পড়লে গুনাহগার হবে না) যে নামাজ পড়ার কথা আল্লাহ কোরানে বলেছেন।
আল্লাহ বলেন,
"আর রহমানের বান্দা তো তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম। আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও দন্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে (তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে)। আর যারা বলে, হে আমাদের রব, তুমি আমাদের থেকে জাহান্নামের আযাব ফিরিয়ে নাও। নিশ্চয়ই এর আযাব হলো অবিচ্ছিন্ন।
(সূরা আল ফুরক্বান, ৬৩-৬৫)
আল্লাহ আরো বলেন,
"হে নবী! আপনি রাত্রের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করুন। এটা আপনার জন্য নফল (অতিরিক্ত)। হয়ত আপনার প্রভূ এ কারণে আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছে দিবেন।"
তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে দুচোখের পানি ছেড়ে কান্নাকাটি করলে আল্লাহ তার দোয়া অবশ্যই কবুল করেন।
আমিও খুব কান্নাকাটি করে তাকে চেয়েছি। আমি তাকে নির্দিষ্ট করে চাইনি, যদি ইয়াসির আমার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য মঙলের হয় তবে তাকে আমার করে আল্লাহ অবশ্যই দিবেন। যদি তাকে না পাই তবে আমার কোন আফসোস থাকবে না। হুম প্রচণ্ড কষ্ট পাবো কিন্তু ভুলতে পারবো অবশ্যই। আল্লাহ সাহায্য করবেন। সারারাত তো ঘুমাতে পারিইনি দিনের বেলায়ও ঘুমাতে পারিনি। সারাক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়েছিলাম, এইতো ইয়াসির কল করবে। সারাদিনেও সে কল করেনি। আমাকে কল করার সময় হয়নি।
একটা কল আসলেই দৌড়ে ফোনের কাছে গিয়েছি যদি ইয়াসির হয়।
এদিকে মা আমার অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি কিছু একটা করার জন্য মামা খালাদের ডেকে আনলেন। বাসায় এই এক মহা সিরিয়াস অবস্থা। হুজুর ছেলেকে ভালোবেসে আমি মহা অপরাধ করে ফেলেছি! একমাত্র বাবাই আমাকে নিরবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যদিও মুখে কিছু না বললেও আপত্তি করেননি একটি বারের জন্যও। মনে হলো কিছুটা স্বস্তিই পেয়েছেন। মা অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও মুখে আমাকে বাধা দেননি। তার মুখে চিন্তার চাপ স্পষ্ট।
মামা বললেন,
: তোর কলেজ ভার্সিটিতে এত এত ছেলে থাকতে শেষ পর্যন্ত এই অর্থোডক্স ছেলেটাকেই ভালোবাসলি কেন? দুনিয়াতে কী ছেলের অভাব পড়েছিলো?
মামার বলা শেষ না হতেই বড় খালামনি বলে উঠলেন,
: হুজুর হয়েও প্রেম-ভালোবাসা! ছিঃ, ছিঃ কি লজ্জা!
আমি খানিকটা রেগে গিয়ে বললাম,
-- সে আমার সাথে প্রেম করেনি, ভালোওবাসেনি। এখনও আমার দিকে ভালো করে একবার তাকিয়েছে কি না সন্দেহ? হয়তো কোথাও আমাকে দেখলে চিনবেও না।
ছোট মামা বলে উঠলো,
: এমন একটা আনরোমান্টিক ছেলেকে তুই ভালোবাসিস। তাছাড়া সে যদি তোকে ভালো না বাসে তবে তুই বিয়ে করার জন্য এত পাগল হয়েছিস কেন?
--সেসব নিয়ে, তোমাদের না ভাবলেও চলবে। তোমরা কেন একত্রিত হয়েছ? সেই বিষয়ে আলোচনা কর প্লীজ।
মামা শান্ত হয়ে বললো,
: দেখ মা, আমরা তোর থেকে বেশি দুনিয়া দেখেছি। আমরা জানি এসব হুজুর ছেলেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জঙ্গি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই এসব ভালো ভালো কথা বলে। আমরা সবাই তোকে ভালোবাসি, তোর ভালর জন্যই বলতেছি। এসব ছেলেকে বিয়ের চিন্তা মাথা থেকে বাদ দে। নিয়মিত ক্লাস কর, দেখবি ঐখানে তোর স্টেটাসের কাউকে পেয়ে যাবি। দেখিস আমরা তখন আপত্তি করব না।
আমি খুব রেগে গিয়ে বললাম,
-- এই ছেলের সাথে তোমাদের এত আপত্তি কেন? মা, তুমি বলো, তুমি তো ইয়াসির আর তার পরিবারকে দেখেছ। সে কি খারাপ? না তার পরিবার খারাপ?
: না কেউই খারাপ নয়। শুধু ভালো খারাপ দিয়ে জীবন চলে না রে মা। দুইজন মানুষের মধ্যে মানসিক সমঝোতারও খুব বেশি দরকার। যা তোদের মধ্যে নেই। তুই এই ছেলের সাথে কখনোই এডজাস্ট করতে পারবি না।
-- মা, ও মা বলো না। আমি সুখী হলে তুমি খুশি হবে না? আমার সুখের চেয়ে ইনপরটেন্ট কিছু কী আছে?
: তোর সুখের জন্যইতো এইসব বলতেছি রে মা।
-- তোমাদের পছন্দ মতো আধুনিক কাউকে বিয়ে করলে সুখী হওয়ার নিশ্চয়তা তুমি দিতে পারবে মা? যদি পার তবে আমি ইয়াসিরকে বিয়ে করবো না!
মা খানিকটা ইতস্তত করে চুপ করেই থাকলেন। খালা মনি বলে উঠলেন,
: আচ্ছা সেসব নাহয় বাদ দিলাম, তোর বিয়ের পর তোর পড়ালেখার কি হবে?
--সেসব নিয়ে ভেব না, যখন যে সিচিউশন আসে তখনের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই।
পরিবারে মোটামুটি সবাই একপ্রকার আমার ইচ্ছাকে মেনে নিলো। করার কিছুই নেই। ছোট বেলা থেকেই আমি জিদ্দি টাইপের যা চেয়েছি তাই পেয়েছি।
আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেছি, ইয়াসির কি মেনে নিবে তার পরিবারের থেকে ভিন্ন কাউকে নিজের জীবন সাথী হিসেবে মেনে নিতে। প্রতিদিন ফোনের অপেক্ষা করতাম।
কিন্তু আমার খুশি, ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিলো।
তিন দিন পরে মোটেও ভালো লাগছিল না। সন্ধ্যায় ছাদে গিয়ে জ্যোৎস্না দেখছিলাম। হেমন্তের হালকা ঠান্ডা বাতাস পরিবেশ বেশ লাগছিল। এই সুন্দর পরিবেশ আমার মনে মোটেও দাগ কাটতে পারেনি। চোখের অশ্রু কখন অঝর ধারায় গাল বেয়ে নিচে পড়ছিল বুঝতেই পারিনি। জানি আমি যতই দুশ্চিন্তা করি শেষ পর্যন্ত তাই হবে যেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এশার আজান দিয়ে দেওয়ার খানিকটা পর নিচে নেমে এলাম। ছাদ থেকে মসজিদ দেখা যায়। বিশাল বড় মসজিদ, মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়া মুসল্লিদের মধ্যে আমার চোখ দুটো ইয়াসিরকে খোঁজছিলো। জানি তাকে দেখা যাবে না। তাও মনে প্রশান্তি ইয়াসির মসজিদে।
বাসায় এসেই অবাক। ইয়াসিরের আম্মু, ইয়াসিরের বোন মায়ের সাথে কথা বলছে। তাদের চেহারায় মুচকি হাসি। আমাকে দেখে ইয়াসিরের আম্মু পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের চেহারার গম্ভীরতা আমাকে কিছুটা চিন্তিত করলেও আন্টির জড়িয়ে ধরা আমায় পরম শান্তি দিচ্ছিল।
উনারা চলে যাওয়ার পর মা বললেন,
: সুমু আরেকবার ভেবে দেখ মা, তুই এদের সাথে এডজাস্ট করতে পারবি কি না। এদের মত নিজেকে বদলাতে পারবি কি না। ইয়াসিরের মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলো।
মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি, আমি ভাবতে পারছি না। আল্লাহর করুণা আমার কাছে এভাবে আসবে কল্পনাও করিনি। কিন্তু কীভাবে এসব হলো! ইয়াসির তো আমাকে ভালোবাসে না। তার কোন আচরণেই মনে হয়নি সে আমাকে ভালোবাসে।
সে যাই হউক। এসব আমার ভাববার দরকার নেই। এই সুসংবাদ আল্লাহর পক্ষ থেকে। ভেবে এক চিৎকার দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। খুশিতে চোখের পানি যেন বাধ মানছে না। বললাম,
--মা প্লীজ চিন্তা করো না। তোমার মেয়ে ইন শা আল্লাহ অসুখী হবে না। একদিন তুমিই এই সিদ্ধান্তের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে।
মা' ও আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এক হৃদয় বিদারন দৃশ্যের অবতারণা হলো। মা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন,
:কিন্তু এক মাস পরেই তো তোর পরীক্ষা, কত প্রস্তুতি নিয়েছিস। ওরা তো চাচ্ছে এক সপ্তাহের মধ্যেই মানে আগামী শুক্রুবারই বিয়েটা হয়ে যেতে। কালই ইয়াসিরের আব্বু, তোর আব্বুর সাথে কথা বলবে।
কিছুটা অবাক হলাম। কেন এত তাড়াহুড়া। বললাম,
-- মা ওরা যেভাবে চায়, সেভাবেই কর প্লীজ।
রুমে এসে ফোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। আর ইয়াসিরের কথাই ভাবছিলাম। এখন তো বিয়ে হবেই আমার সাথে কথা বলতে নিশ্চয় ইয়াসিরের আপত্তি থাকবে না। ভেবে কল দিলাম।
দুইবার কল দেওয়ার পরও রিসিভ করছে না। মেসেজ দিলাম।
"কেন এমন তুমি? আমার কষ্টটা বুঝ না কেন? তোমার সাথে কথা বলতে চাই। আর কত কষ্ট দিবে? প্লীজ কল রিসিভ কর"
টুং করে মেসেজ আসলো,
"কোন দরকারি কথা না থাকলে, ইন শা আল্লাহ আগামী শুক্রুবারেই কথা বলবো। "
আবার মেসেজ দিলাম,
" কিন্তু এখন তো আমাদের বিয়ে হবে"
"বিয়ে হয়নি তো"
ঠিক আছে এতদিন ধৈর্য ধরেছি আর কটাদিন ধৈর্য ধরবো। নো প্রব্লেম। বলে মোবাইল রেখে দিয়ে, এশার নামাজ আদায় করে শান্তির ঘুম দেওয়ার জন্য বিছানায় গেলাম।
শুক্রুবারে বিয়েটা হয়েই গেলো। বরযাত্রী ছিলো, মাত্র ১০ জন, বরযাত্রীর খাবার ছিল সফট ড্রিঙ্ক আর স্টাটার। আমার পরিবারে এমন বিয়ে হয়নি বলা যায়, সবাই অবাক হয়ে আলোচনা করেছিল এমন বিয়ে কীভাবে সম্ভব!? আর যৌতুক, ইয়াসিরের আম্মা ওয়াদা করেছিল যেন গিফট হিসেবে কিছুই দেওয়া না হয়।
আমার পরিবারে মৌন কিছু বিরোধিত থাকলেও ইয়াসিরের পরিবারের আচরণে মোটামোটি সবাই মানতে বাধ্য হয়েছিল এই পরিবারটা অন্য পরিবার থেকে আলাদা। আমার পরিবারের মত যে পরিবার লোভ সংবরণ (যৌতুকের লোভ তাও না চাওয়ার আগেই) করতে পারে সে পরিবারের অবশ্যই আলাদা আত্মসম্মানবোধ আছে। কারণ আমাদের পরিবারগুলোতে যতই টাকা থাকুক ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু দেওয়াকে গর্বের মনে করা হয়। আবার অনেকেই তো ভিখারির মত খোঁজে নেই।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ইয়াসির যখন রুমে আসলো, আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। কিছুটা ভয়ও কাজ করছিল সে তো আমাকে ভালোবাসে না। কীভাবে, কী হবে? পরিবারের সাথে একপ্রকার জিদ করেই বিয়েটা করেছি। যাই হউক আল্লাহর ইচ্ছাই তো বিয়েটা হয়েছে, সুতরাং সুখ- দুঃখ যাই হউক ভাল কিছুই হবে।
যেন স্বপ্ন দেখছি। এত সহজে আমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ভাবতে পারছি না। ইয়াসির যখন পাশে এসে, ঘোমটা উটাতে যাবে সেই মুহুর্তে খুব দুষ্টুমি ভরা আওয়াজে বললাম,
--তুমি তো আমাকে ভালোই বাস না, তবে বিয়ে করার জন্য এত উথলা হয়েছ কেন? আমার পরীক্ষা পর্যন্তও অপেক্ষা করতে পারলে না।
: কে বললো ভালোবাসি না।
--আমি জানি তো। আচ্ছা, তুমি আমাকে বাইরে কোথাও দেখলে চিনতে পারবে?
: তাই তো তাড়াতাড়ি বিয়ে করেছি, যেন চিনতে পারি। আমাকে চিনার সুযোগ দিতে হবে তো। এখনো নতুন বউয়ের চেহারাটাই দেখতে দিলে না।
-- বাধা দিলো কে?
: অনুমতিও পাইনি তো, তবে দেখার অনুমতি আছে!
আমি চুপ হয়ে থাকলাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে আমার ঘোমটা উঠালো। আমি লজ্জায় চুপসে গেলাম।
সে বললো,
: মা শা আল্লাহ, আমার বউটা এত এত সুন্দরী।
--তা আগে জানতে না বুঝি?
: না তো, এত সুন্দরী জানা ছিলো না তো।
-- তবে তাড়াহুড়া করলে কেন?
: তুমি যে পাগলামি শুরু করেছিলে, ভুলে গিয়েছো? তোমাকে, নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচানোর জন্যই এই তাড়াহুড়ো।
:
:
:
✔চলবে,,, ইনশাআল্লাহ।💕
উপস্থাপক: আল-মামুন রেজা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।