সংশোধন
ইসলামিক ধারাবাহিক _গল্প
৫ম_পর্ব
উনার এসব শুনে, আমি রাগ করে চলে যাচ্ছিলাম, উনি লিফটে উঠার মুহুর্তে বললেন,
: পর্দাতেই নারীর সৌন্দর্য্য আর নিরাপত্তা। আর প্রথমে সালাম প্রদানকারী অহংকার থেকে মুক্ত। খুব ভালো লাগলো এভাবে দেখে আর আগে সালামের চেষ্টা করাতে
আমি না শুনার মতো করে লিফটে উঠে পড়লাম। অন্য সময় হলে উনাকে সাথে নিয়েই উঠতাম, যদিও প্রতিবার উনি আসতে চান না। আমি হাত ধরবো, এই ভয়ে চুপচাপ আমার কথা মেনে নেন।
কিন্তু এই মুহুর্তে মনটা খুব খারাপ, আমার জীবনসঙ্গী দাঁড়িওয়ালা! না, না ভাবতেই পারছি না। সবাই আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করবে। এমনিতেই অনেক কথা শুনতে হচ্ছে, মাথায় কাপড় দিচ্ছি, বড় ওড়না পড়তেছি। মা বাবা, তানহা সবাই বেশ অবাক হলেও কেউ কিছু জিজ্ঞাস করছে না। কিন্তু তানহা একটু করে বলেছিলো,
: কী ব্যপার আপু, তুমি এত বড় ওড়না পড়ে বুড়ি সেজেছ কেন? তোমার এতো সাধের চুলগুলো কাউকে দেখাচ্ছ না?
বলে অনেক হেসেছিলো, আমি কঠিন দৃষ্টি দিয়ে তাকানোতেই চুপ হয়ে আছে। নয়তো বান্ধবীদের ব্যঙ্গানোর চেয়ে তানহার যন্ত্রণায় বাসায় থাকা যেতো না।
কিন্তু একটি দাঁড়িওয়ালা ছেলে আমার সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে, কেমন বিশ্রী ব্যাপারটা। উফফ ভাবতে পারছি না। কিন্তু ইনি ছবি তুলবেন তো।
কী, কী ভাবছি! এখনো প্রেমের প্রস্তাবই দেয়নি, আবার বিয়ে।
কিন্তু প্রেম কীভাবে করবো?! কেউ ইয়াসিরের পিক দেখতে চাইলে, দাঁড়িওয়ালা দেখে কী কী প্রতিক্রিয়া সব একে একে ওদের চেহারাসহ মাথায় আসতে লাগলো। যেন ভিডিও দেখতেছি সব স্পষ্ট চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে গেলো।
না, না বলে চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু ইয়াসিরকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না। যাক দেখি আগে উনাকে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়াই তারপর না হয়, দাড়ি কেটে ফেলার ব্যপারে বলবো। আমাকে খুব ভালোবেসে ফেললে, আমার কথা না রেখে যাবে কোথায় হুহ।
পরেরদিন সকালে পড়তে যাইনি। কেন যেন মাথায় আসলো, এতোদিন উনার কাছে পড়েছি, দুষ্টু, মিষ্টি অনেক কথাই হয়েছে। উনি কি আমাকে একটুও মিস করবেন না। যদিও আমার খুবই কষ্ট হবে উনাকে না দেখে থাকতে। নিজেকে শক্ত করলাম, উনার সাথে লুকোচুরি খেলা খেলতে ইচ্ছে হচ্ছে।
এভাবে তিনদিন না যাওয়ার পর, একদিন বিকালে তাসনি বাসায় আসলো। বললো,
: ভালো আছ তো আপু? ছাদেও যাও না। তানহা বললো তুমি কিছুটা অসুস্থ। মনমরা হয়ে থাক। ওইদিকে ভাইয়া বললো, সামনে তোমার পরীক্ষা তোমার পড়া মিস যাচ্ছে। তুমি আসছ না কেন?
আমাকে গতকালও বলছিলো, তোমার সাথে দেখা করে যেতে। মাগরিবের আজান দিয়ে দেওয়াতে আর আসা হয়নি।
--আমি ভালো আছি, তিনি চাইলেই কি আমাকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতে পারতেন না। আমার নাম্বার তো ছিলোই।
: আপু তুমি জানো তো ভাইয়া কেমন। উনি ধর্মের প্রতিটি বিধানকে খুব কঠোরভাবে মানার চেষ্টা করেন। প্রায় একবছর হলো আমাদের পরিবার ধর্মকে মানতে শুরু করেছে। এর আগে সাধারণ অন্য আধুনিক পরিবারের মতোই ছিলো। ভাইয়া, সবসময় দুশ্চিন্তা করেন, আবার শয়তানের ধোঁকায় পড়ে দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে না পড়েন। বিশেষ করে মেয়েদের ব্যাপারে ভাইয়া খুব কঠোর। তিনি সবসময় বলেন, শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো নারী। একজন পুরুষ যতই কঠোর হউক না কেন, নারীর মিষ্টি কথার কাছে পরাজয় হয়ে যায়।
--তাই বলে, উনার স্টুডেন্ট তিন দিন ধরে যায়নি কেন, সেটারও খোঁজ নিতে পারেন না?
: তাই তো আমাকে পাঠালো। যদি বিকল্প না থাকতো মানে আমি না থাকতাম তাহলে অবশ্যই খোঁজ নিতেন।
কাল থেকে আসবে তো আপু? মা'ও তোমার কথা জিজ্ঞাস করছিলো।
--আচ্ছা, দেখি আগামীকাল একটু ভালো লাগলে আসবো।
আজকাল খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়, যেনো রুটিন হয়ে গেছে। ফজরের নামাজটাও লুকিয়ে পড়ে ফেলি, যেনো কেউ না দেখে। লজ্জা পাবো বলে! মনটা ছটপট করছিলো যাওয়ার জন্য, দুইবার যাওয়ার জন্য বের হয়েও যাইনি। কেন যেন আমার বিশ্বাস ছিলো, তিনি আমাকে কল করবেন। ছয়টা থেকে বার বার মোবাইলের দিকে দেখতেছি, আধা ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরও যখন কল আসছে না ইচ্ছে হচ্ছে নিজেই কল দিয়ে ইচ্ছামতো ঝগড়া করি। কিন্তু তাও না দিয়ে মোবাইলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। সাতটার দিকে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে চোখ লেগে আসছিলো অমনি কল আমি এক লাফে, মোবাইল হাতে নিয়ে হ্যালো বলতেই,
ওইপাশ থেকে ইয়াসির বললেন,
: আই লাভ ইউ, তুমি কেন বুঝ না, তোমাকে একদিন না দেখলে আমার সারাদিনই মন খারাপ থাকে! আমি ভালো থাকি না, আমার দিন ভালো যায় না। কেন আমাকে কষ্ট দাও? কেন বুঝ না তোমাকে না দেখতে পেলে আমি পাগল হয়ে যাবো। প্লীজ এক্ষুণি চলে আসো!!
আমি কি ভুল শুনতেছি? মোবাইলের দিকে আবার তাকালাম, হুম নাম্বার ঠিকি আছে। খুশিতে এক লাফ দিতেই খাট থেকে পড়ে গেলাম।
উফফ, এতক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম। আমি মনে হচ্ছে হাসতে হাসতে পাগল হয়ে যাবো। স্বপ্নেই হউক না, ইয়াসির আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে তো। আমাকে না দেখতে পেয়ে ইয়াসিরের অস্থিরতা স্বপ্নে হলেও দেখেছি। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কল, মোবাইল হাতে নিতেই ইয়াসির! আবার কী স্বপ্ন দেখতেছি? কেন জানি না আমার হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো। এতোক্ষণ যাকে নিয়ে এতো স্বপ্ন দেখছিলাম, তার কল রিসিভ করতেও যেন ভয় পাচ্ছি!
--হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।
: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওরাহমাতুল্লাহ। কী ব্যপার? আসোনি কেন? সামনে পরীক্ষা ভুলে গেছ?
--আমি গেলেও কী? না গেলেও কী? পরীক্ষায় ভালো করলেও কী? খারাপ করলেও কী? কারো কী কিছু এসে যায়?
আর পরীক্ষার জন্যই বুঝি কল দিয়েছ? নয়তো বেঁচে আছি কী মরে গেছি তার খবরও নিতে না, তাই তো?
: মা জিজ্ঞাস করছিলেন, তুমি আসছ না কেন?
--শুধুই কী আন্টি জিজ্ঞাস করছে বলে কল দিয়েছ?
: তোমার পরীক্ষার ক্ষতি হবে,
--সিলেবাস তো কবেই শেষ!
: ঠিক আছে , দেখি কতটুকু কী হলো? আগামীকাল প্রস্তুতি নিয়ে এসো পরীক্ষা নিবো।
--না আসবো না!
: সে কাল দেখা যাবে, আমি জানি তুমি আসবেই!
বলে সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিলো।
খুব রাগ হলো। আসলে রাগ নয় অভিমান! সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামীকালও যাবো না। কেন জানি না, প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
বিকালে ইয়াসিরের মা আর তাসনি বাসায় আসলেন। মা, ইয়াসিরে মা'কে দেখে খুবই অবাক হলেন! এমন অবাক যে লুকাতে পারেননি। হয়তো মায়ের অবস্থা বুঝে আন্টি বললেন,
: আসলে সুমাইয়া অসুস্থ। ইয়াসিরের কাছে পড়তে যাচ্ছে না, মনটা কেমন আনছান করছিলো। মেয়েটা বড্ড মায়াবতী, এই কয়দিনেই সবাইকে মায়ায় জড়িয়ে গেলো। দেখতে না এসে পারলাম না!
মা একবার আমার দিকে তাকায়, একবার আন্টির দিকে। আমি তো সুস্থ, পড়তে না যাওয়ার মতো তেমন কিছুই হয়নি। মুখটা করুণ করে মা'কে ইঙ্গিত দেওয়ার পর মা চুপ হয়ে থাকলো। মা আর আন্টির মধ্যে বেশ জমলো। দুইজনই মন ভালো মানুষ, পান খান। একটু পার্থক্য, আন্টি ধার্মিক আর মা একটু ফ্যাশন সচেতন।
আন্টি যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
: কাল এসো মা, তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।
ওরা চলে যাওয়ার পর, মা অগ্নিমূর্তি ধারণ করলো।
: তুই এতোদিন পড়তে যাস নি কেন? এতো ভাল ছেলে, এতো ভালো পরিবার, এতো ভালো মানুষ, ওদেরকে তুই মিথ্যা বললি?
কেন? পড়ার প্রতি কোন মনই নেই। সারাদিন শুধু মোবাইল, মোবাইল আর মোবাইল।
মা আরো কতকিছু যে বললো তার কোন হিসাব নেই।
কিন্তু এই মুহূর্তে মায়ের বকুনিগুলোও আমার বেশ লাগছে। কারণ ইয়াসির, ইয়াসিরের পরিবারকে মা ভালো বলেছে, খুব ভালো বলেছে। মায়ের বকুনির জবাবে মুচকি মুচকি হাসছিলাম। মা আরো অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন,
: সুমু, তোর কী হয়েছে? তুই কী পাগল হয়ে গিয়েছিস? এই মোবাইল তোরে শেষ করলো? বকা দিলেও হাসিছ!
আমি চুপচাপ মুচকি মুচকি হাসছিলাম।
পরেরদিন বই নিয়ে গেলেও, পড়ার উদ্দেশ্যে মোটেও যাইনি! বাসায় ঢুকেই আন্টি বললেন, ভালো আছো তো? যাও মা পড়তে বসো। ইয়াসির রুমে আছে। আজ তাসনিও নেই। গতকাল সন্ধ্যায় আমার ভাই তাসনিকে নিতে আসছিলো। তাসনি মামার সাথে নানুর বাসায় গেছে। তোমার একটু কষ্ট হবে। আমি হাতের কাজটা সেরে আসতেছি।
আরে আন্টি কী বলেন? আমি তো এক লাফে আকাশে উঠে গেছি। যেনো আল্লাহও আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। বাহ! চমৎকার, আমি যা চেয়েছি, সহজেই পারবো! মনের কথা মনে রেখেই বললাম,
--জ্বী আচ্ছা,
ইয়াসিরের রুমে যেতেই, ইয়াসির বিব্রত বোধ করতে লাগলেন। আমি খাতা উল্টিয়ে বসেই বললাম,
--ইয়াসির আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি খুব সাহসী মেয়ে এতোদিনে নিশ্চয় বুঝে গেছো। আমি যেটা বলি খুব ভেবেচিন্তে বলি আর সরাসরি বলতেই ভালোবাসি। হ্যাঁ, আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না, আমি যেটা চাই সেটা আমাকে পেতেই হয়। তোমার ভালোবাসা না পেলে আমি মরেই যাবো জেনে রেখো।
ইয়াসির কোন জবাবই দেয়নি। এমন একটা ভাব যেন আমার কথা শুনতেই পাননি। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
: এখানে প্রশ্ন করে রেখেছি, ঠিক সেভাবে দুই ঘণ্টার মধ্যে আন্সার লিখে শেষ করো।
আমার মেজাজ এবার চরমে, এভাবে আমাকে অপমান, সহ্য হচ্ছে না। আমি বললাম,
--নীচের দিকে তাকাবে না, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এতক্ষণ যা বলেছি তার উত্তর দাও। আর শুন আমি পরীক্ষা দিবো না।
বলে প্রশ্নটা ছিঁড়ে ফেলেছি।
: প্রশ্ন আরো আছে,
কী আজব মানুষ এতো স্বাভাবিক কীভাবে থাকতে পারে। একটা অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে তাকে ভালোবাসে। এটা শুনার পর কোন পুরুষ নিজেকে কীভাবে এতো স্বাভাবিক রাখে। বললাম,
--ইয়াসির তুমি জান না আমি কী কী করতে পারি, আমি আন্সার চাই।
সে আরো নির্লিপ্ত, যেন আমাকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্যই সে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
শেষে ছোট্ট করে বললো,
: আমার পক্ষে এই মুহূর্তে বিয়ে করা সম্ভব না।
--অদ্ভুদ! বিয়ে করতে কে বলেছে? প্রেম, প্রেম করতে বলেছি। তুমি আমাকে পড়াবে আর আমি প্রেম করবো।
: প্রেম করা সম্ভব না।
--তুমি আমাকে ভালোবাস না?
: না, সেভাবে ভাবিনি কখনো।
--তাহলে আজ থেকে ভাবো, আমাকে নিয়েই ভাবো।
বলে উঠে ইয়াসিরের দিকে যাচ্ছিলাম।
এবার তিনি খুব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
: সুমু দাঁড়াও, আর সামনে এগোবে না,
--হাজার বার এগোবো, শুধু এগোব না আরো অনেক কিছু করবো।
আগে বলো ভালোবাসবে না কেন?
: কারণ বিয়ের আগে প্রেম মারাত্মক গুনাহ।
:
:
:
চলবে,,,,,
লেখা উপস্থাপক : আল-মামুন রেজা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।