ভাইয়া, মানুষ এই সাধারণ জিনিসটা বুঝতে পারে না—এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে তাদের বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাভাবনা আর মানসিকতার গঠন প্রক্রিয়ায়। প্রতিটি মানুষের চিন্তা, বোধ, অনুভূতি আসলে প্রভাবিত হয় তার চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, শিক্ষা, পরিবার, মিডিয়া এমনকি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির দ্বারা। তাই প্রকৃত সত্য বোঝা সহজ মনে হলেও, বাস্তবে তা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ছোটবেলায় আমাদের মধ্যে যে স্বচ্ছ মানসিকতা থাকে, যেখানে অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছে নেই, যেখানে ‘প্রয়োজন’ আর ‘চাওয়া’কে আলাদা করে বোঝা যায়—বড় হতে হতে সেই স্বচ্ছতা নানা প্রভাবে ম্লান হয়ে যায়। সমাজ আমাদের শেখায় প্রতিযোগিতা করতে, অন্যের সাথে তুলনা করতে। মিডিয়া আমাদের শেখায় 'সবার চেয়ে বেশি পাওয়াই শ্রেষ্ঠত্ব'। ফলে আমাদের বুদ্ধিমত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে—যা আমাদের সত্যিকার প্রয়োজন বুঝতে না দিয়ে শুধু 'আরো চাই, ওর সমান চাই, ওর থেকে বেশি চাই' এর দিকে ধাবিত করে।
এই নেতিবাচক প্রভাবই মানুষকে ভুল বোঝায়। তারা ভাবে সমঅধিকার মানে সমান পাওয়া। অথচ আসল সমঅধিকার মানে যার যা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী পাওয়া। এই সহজ সত্যটাই তারা ধরতে পারে না, কারণ তাদের বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাভাবনা, মানসিকতা ইতিমধ্যেই ভুল শেখায় পরিপূর্ণ।
এভাবে মানুষ অযাচিত প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে। তারা ভাবে 'সে পেল, তাই আমিও পেতেই হবে।' অথচ তারা একবারও ভাবে না, 'আমার কি আসলেই তার সমান দরকার?' এই ভুল ধারণা থেকে আসে পরিস্থিতির, মিডিয়ার, সমাজের, ক্ষমতাবানদের তৈরি করা ষড়যন্ত্রমূলক মানসিকতা।
কারণ, ক্ষমতাবান গোষ্ঠী চায় আমরা নিজেদের মধ্যে এই ভুল প্রতিযোগিতায় আটকে থাকি। তারা চায় আমরা একে অপরকে শত্রু ভাবি, যাতে আমরা কখনোই তাদের অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য, লুকিয়ে থাকা স্বার্থ দেখতে না পারি। আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে তারা নিজেদের লাভবান হয়।
তাহলে মানুষ কেন এই সহজ জিনিসটা বোঝে না? কারণ—
১. তাদের মানসিকতা ছোটবেলা থেকে প্রভাবিত ও বিকৃত হয়।
২. তাদের শেখানো হয় প্রতিযোগিতা, তুলনা আর হিংসা।
৩. মিডিয়া, সমাজ, শক্তিশালী গোষ্ঠী তাদের মনে ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেয়।
৪. ক্ষমতাবানরা চায় আমরা নিজেদের মধ্যে লড়ি, যাতে তাদের ভুলগুলো চোখ এড়িয়ে যায়।
৫. আমরা নিজেদের প্রকৃত প্রয়োজন ভুলে যাই, অন্যের মাপে নিজেকে মাপতে শুরু করি।
ফলে যে সহজ সত্যটা (যার যতটুকু দরকার, সে ততটুকুই পাবে, এটাই সমঅধিকার) বুঝতে আমাদের বুদ্ধিমত্তা যথেষ্ট ছিল, সেই বুদ্ধিমত্তাই আসলে দূষিত হয়ে গেছে। তাই মানুষ বোঝে না।
আর আমরা যদি এই ভুল প্রতিযোগিতায় মগ্ন থাকি, তাহলে কখনোই বুঝতে পারব না কে আমাদের আসল শত্রু। আমরা ব্যস্ত থাকব একে অপরকে টেনে নামাতে, একে অপরকে দোষ দিতে। ফলে ক্ষমতাবানরা আড়ালে থেকে যাবে, তাদের অন্যায়গুলো আড়াল হবে, তারা চুপিচুপি আমাদের অধিকার কেড়ে নেবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমরা আমাদের প্রকৃত শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলব। আমরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করব, কিন্তু যাদের হিসাব চাওয়া উচিত, তাদের কখনো চ্যালেঞ্জ করতে পারব না।
তাই আজও সময় আছে—নিজেকে জানি, অন্যকে বোঝি, প্রকৃত সত্যকে বুঝতে শিখি। না হলে এই ভুল প্রতিযোগিতার শেষ গন্তব্য হবে পরাজয়, বিভাজন, আর একেকজন শাসকের হাসি।