গল্পের নাম : আজও সময় আছে, ফিরে এসো রবের পথে 🤲
রায়হান ছিল একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তার মা তাকে নামাজ পড়তে শেখাতেন, কুরআন তিলাওয়াত করতে বলতেন এবং সব সময় ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দিতেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রায়হান দুনিয়ার ব্যস্ততায় এমনভাবে ডুবে গেল যে, ধীরে ধীরে সে তার রবের কথা ভুলে যেতে লাগল।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রাত জেগে মোবাইল চালানো, অর্থ উপার্জনের চিন্তা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছুর জন্যই তার সময় ছিল। শুধু নামাজের সময় হলেই সে বলত, “আজ থাক, কাল থেকে ঠিকমতো নামাজ পড়ব।”
এভাবে একদিন, দুইদিন করতে করতে অনেক মাস কেটে গেল।
তার মা প্রায়ই বলতেন, “বাবা, দুনিয়ার জন্য যতই ব্যস্ত থাকো, আখিরাতের কথা ভুলে যেয়ো না। জীবন কখন শেষ হয়ে যাবে, তা কেউ জানে না।”
রায়হান মায়ের কথা শুনে হাসত। মনে মনে ভাবত, তার সামনে তো অনেক সময় পড়ে আছে। এখন জীবন উপভোগ করবে, বুড়ো হলে ইবাদত করবে।
একদিন তার ছোটবেলার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু হঠাৎ মারা গেল। বন্ধুটি ছিল হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখা একজন মানুষ। আগের দিনও যার সঙ্গে কথা হয়েছে, পরদিন তার জানাজায় দাঁড়াতে হবে—এ কথা রায়হান কল্পনাও করেনি।
বন্ধুর জানাজায় দাঁড়িয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। চারপাশে অসংখ্য মানুষ, সবার চোখে পানি। অথচ যে মানুষটি এত স্বপ্ন দেখত, সে আজ নীরব।
কবরস্থানে মাটি দেওয়ার সময় রায়হানের মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছিল—“আমি যদি আজ মারা যাই, তাহলে আমার প্রস্তুতি কী?”
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, মৃত্যু শুধু বৃদ্ধ মানুষের জন্য অপেক্ষা করে না। মানুষের বয়স, সম্পদ কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা—কোনোটিই মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করতে পারে না।
সেদিন রাতে বাড়িতে ফিরে রায়হান অনেকক্ষণ একা বসে রইল। মায়ের কথাগুলো মনে পড়তে লাগল। সে নিজের জীবনের ভুলগুলো নিয়ে ভাবল। কতবার নামাজের ডাক শুনেও অবহেলা করেছে, কতবার অন্যের মনে কষ্ট দিয়েছে, কতবার তাওবা করার কথা ভেবেও পিছিয়ে গেছে!
অবশেষে সে অজু করল। দীর্ঘদিন পর আন্তরিকভাবে নামাজে দাঁড়াল। সিজদায় গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “হে আল্লাহ, আমি অনেক ভুল করেছি। দুনিয়ার মোহে পড়ে তোমার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমাকে তোমার পথে ফিরে আসার তাওফিক দাও। আমার বাকি জীবনটা যেন তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের পথে কাটাতে পারি।”
সেই রাতেই তার জীবনের সব সমস্যা শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—আর তাওবা করতে দেরি করবে না, নামাজকে অবহেলা করবে না এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করে বাঁচবে না।
পরদিন থেকে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের চেষ্টা শুরু করল। কুরআন পড়তে লাগল, মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে লাগল এবং যাদের মনে কষ্ট দিয়েছিল, তাদের কাছে ক্ষমা চাইল।
আগে যে সময় সে অকারণে নষ্ট করত, সেই সময়ের কিছু অংশ ভালো কাজের জন্য ব্যয় করতে শুরু করল। জীবিকা অর্জনের জন্যও পরিশ্রম করল, তবে হালাল-হারামের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করল।
কয়েক মাস পর তার মা একদিন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা, তোমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখছি। আল্লাহ তোমাকে সঠিক পথে অটল রাখুন।”
রায়হান মায়ের হাত ধরে বলল, “মা, আমি বুঝেছি—আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য আমাদের বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। আমরা জানি না, আমাদের জীবনের শেষ দিনটি কখন আসবে।”
সে এখনো মানুষ, তারও ভুল হয়। কিন্তু ভুল হলে সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করে।
কারণ সে বুঝে গেছে, জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
🌿 গল্পের শিক্ষা
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমরা অনেকেই ভাবি—আরও কিছুদিন পর নামাজ পড়ব, পরে তাওবা করব, বয়স হলে দ্বীনের পথে চলব। কিন্তু আমাদের হাতে যে আগামীকাল আছে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মৃত্যু স্মরণ করার অর্থ জীবন থেকে আশা হারিয়ে ফেলা নয়। বরং নিজের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, ভালো কাজ করা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া।
আজও সময় আছে—নামাজে ফিরে আসুন, ভুলের জন্য তাওবা করুন, মা-বাবার যত্ন নিন, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন এবং হালাল পথে জীবন পরিচালনা করুন।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আন্তরিকভাবে তাঁর দিকে ফিরে আসুন।
মনে রাখবেন: মৃত্যুর পর তাওবা করার সুযোগ থাকবে না। তাই তাওবার জন্য সেই দিনের অপেক্ষা করবেন না, যেদিন হয়তো আর সুযোগই থাকবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আন্তরিক তাওবা করার, নিয়মিত নামাজ আদায় করার এবং ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।🤲
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।