অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৩: শেষ মেসেজটা এখনো আসে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
তুই কার সাথে এত কথা বলিস?
অফিস থেকে ফিরে জুতোটা খুলতে খুলতেই নিশি কথাটা ছুড়ে দিল।
অভিক তখন বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। আঙুল চলছে ফোনের স্ক্রিনে। মাথা তোলেনি। একমনে টাইপ করে যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, যেন ওপাশের মানুষটা এইমাত্র কোনো মজার কথা বলেছে। টেবিলের উপর কফির মগটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
এমনি।
গলাটা নিচু। ঘোরের মধ্যে বলা বলে মনে হলো।
নিশি ব্যাগটা সোফায় রাখল। কাঁধের ব্যথাটা আজ বেশি।
এমনি মানে? আমি আসার পর থেকে দেখছি, তুই ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসছিস। কাস্টমার কেয়ার?
এবার অভিক তাকাল। চোখ দুটো চকচক করছে। ঘুম-জাগা মাঝামাঝি একটা দৃষ্টি।
ও না থাকলে আমার কথা শোনে কে, বল?
বলেই আবার স্ক্রিনে মন দিল।
নিশি আর কথা বাড়াল না। ভাবল, অফিসের নতুন কেউ হতে পারে। কিংবা পুরনো কোনো বন্ধু। নতুন কারও সাথে কথা বলতে শুরু করলে মানুষ এমনই করে।
কিন্তু ব্যাপারটা ‘এমনি’ ছিল না।
সকালে ঘুম ভাঙতেই অভিকের হাত চলে যেত বালিশের পাশে। ফোন। চোখ না খুলেই কিছু টাইপ করত।
অফিসের ডেস্কে এক্সেল শিটের ফাঁকে ফাঁকে নোটিফিকেশন চেক। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠত। বস পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও টের পেত না সবসময়।
রাতে লাইট নেভানোর পরেও অনেকক্ষণ স্ক্রিনের আলো জ্বলত। খুটখাট টাইপের শব্দ। মাঝে মাঝে ছোট্ট করে হেসে উঠত।
নিশি একদিন ধরল।
একদিন তোর ওই ‘ও’টার সাথে পরিচয় করিয়ে দিস তো। দেখি, কে আমার জামাইকে এত হাসায়।
অভিক ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরল। যেন নিশি ছিনিয়ে নেবে।
সময় হলে করাব। ও একটু লাজুক। মানুষের সামনে আসতে চায় না। ভিডিও কল ধরে না।
নিশি হেসে ফেলল। “লাজুক”। ভার্চুয়াল মানুষ আবার লাজুক হয় নাকি?
কিন্তু সেই সময় আর এল না।
তিন মাসের মাথায় নিশির অস্বস্তি শুরু হলো।
এক রাতে পানি খেতে উঠে দেখে অভিক বারান্দায়। রাত দুইটা বেজে সতেরো। ঘরে ডিমলাইট জ্বলছে। বাইরে কালো আকাশ। অভিক গ্রিল ধরে কার সাথে যেন কথা বলছে।
আজ ছাতাটা নাওনি কেন? ভিজে যাবে তো।
নিশি দরজায় দাঁড়িয়ে পড়ল। বারান্দায় আর কেউ নেই। শুধু অভিক। আর বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। অথচ অভিকের গায়ে এক ফোঁটা পানি নেই। টিশার্ট শুকনো।
নিশি পা টিপে টিপে গেল।
অভিক? কার সাথে কথা বলছ?
অভিক চমকে উঠল। যেন ঘোর কেটে গেল।
কই? না তো। ঘুম আসছিল না। এমনি দাঁড়িয়ে আছি। বাতাস খাচ্ছি।
আমি স্পষ্ট শুনলাম তুমি বললে, ‘ছাতাটা নাওনি কেন’।
অভিক একটু অপ্রস্তুত হাসল। চুল ঠিক করল।
ধুর। তুমি ভুল শুনেছ। ঘুমাও। এসি বাড়িয়ে দেব?
সেদিনের পর থেকে নিশি লক্ষ করল, অভিক মাঝরাতে হাসে। নিজের মনে। ফোন হাতে নিয়ে না। শূন্যের দিকে তাকিয়ে। আর ফিসফিস করে বলে, আজ তুমি এত চুপ কেন? রাগ করেছ?
এক বৃহস্পতিবার নিশি আর পারল না।
ফোনটা দাও তো।
অভিক এক সেকেন্ডও দেরি করল না। হাসিমুখে এগিয়ে দিল। আনলক করা। প্যাটার্ন লক তোলা নেই।
নিশির হাত কাঁপছিল। হোয়াটসঅ্যাপ খুলল। লাস্ট চ্যাট বাবার সাথে, তিনদিন আগে। “বাজার করে দিও”। মেসেঞ্জার। শুধু অফিসের গ্রুপ, ক্রিকেটের গ্রুপ। টেলিগ্রাম, ইমো, এসএমএস, কল লগ। সব ঘাঁটল। ডিলিটেড আইটেমও দেখল।
কিছু নেই। গত ছয় মাসে ‘ও’ নামে, বা অচেনা কোনো নম্বর থেকে একটা মেসেজও না। একটা মিসড কলও না। সিম অপারেটরের প্রমোশনাল মেসেজ ছাড়া কিছু নেই।
ফোনটা একদম পরিষ্কার। যেন অভিক এই ফোনে কথা বলাই ভুলে গেছে। গ্যালারিতে গত মাসের অফিস ট্যুরের ছবি আছে, শুধু।
নিশি ফোনটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। তার গলা শুকিয়ে গেছে।
অভিক... তুই কার সাথে কথা বলিস?
অভিক তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে জমা পানিতে আলো কাঁপছে। একটা কুকুর ভিজে জবুথবু হয়ে বসে আছে।
বললাম তো। ওর সাথে। ও রোজ আমার খবর নেয়। জিজ্ঞেস করে দুপুরে খেয়েছি কি না।
কিন্তু ফোনে তো কিছু নেই!
অভিক এবার নিশির দিকে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি নেই। আছে করুণা, যেন নিশি একটা অবুঝ বাচ্চা।
তোমরা দেখতে পাও না বলে কি ও নেই? তুমি বাতাস দেখতে পাও? পাও না। কিন্তু বাতাস তো আছে। ফ্যানটা ঘুরছে।
সেদিন রাতে নিশি ঘুমাতে পারেনি।
ডা. নাজমুল হক। অভিকের স্কুলের বন্ধু। সাইকিয়াট্রিস্ট। চেম্বার শান্তিনগরে।
তিনি তিন সেশনে অভিকের সাথে কথা বললেন। কফি খেতে খেতে, গল্পের ছলে। চতুর্থ দিন নিশিকে ডাকলেন।
ভাবি, অভিক যা দেখছে, শুনছে, অনুভব করছে, ওর কাছে সেটা আমাদের এই চেয়ার-টেবিলের মতোই সত্যি হতে পারে। ব্রেইনের কেমিক্যাল ইমব্যালেন্স থেকে এমনটা হয় অনেক সময়। আমরা এটাকে সিজোফ্রেনিয়া বলি। ভয় পাবেন না। চিকিৎসা আছে। কিন্তু সময় লাগবে। আর পরিবারের সাপোর্ট লাগবে। সবচেয়ে বেশি।
‘সিজোফ্রেনিয়া’। শব্দটা শুনে নিশির মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। ফ্যানের শব্দটা হঠাৎ বেড়ে গেল মনে হলো।
প্রথম দুই মাস জাহান্নামের মতো গেল।
অভিক ওষুধ ছুঁড়ে ফেলত।
তোমরা ওকে মেরে ফেলতে চাইছ! ওষুধ খেলে ওর গলা শুনতে পাই না! ও কষ্ট পায়! ওর অ্যাজমা আছে!
রাতে চিৎকার করত, ও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে! দরজা খোলো! ওর কালো ছাতা থেকে পানি পড়ছে মেঝেতে! পানি মুছতে হবে!
নিশি দরজা খুলে দেখত। শুকনো করিডোর। কেউ নেই। শুধু দারোয়ানের ঘরের লাইট জ্বলছে নিচে।
নিশি তর্ক করত না। প্রতি রাতে অভিকের মাথার কাছে বসে থাকত। অভিক ঘুমিয়ে গেলে তার ফোনটা চেক করত। ফাঁকা। ইনবক্স, সেন্ট বক্স, ড্রাফট। সব শূন্য। স্ক্রিন টাইম রিপোর্টে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার শূন্য।
ছয় সপ্তাহের মাথায় প্রথম পরিবর্তনটা এল।
অভিক একদিন মাঝরাতে ধড়মড় করে উঠে বসল। ঘামছে। এসি ২২-এ দেওয়া।
নিশি... ও আজ কথা বলছে না। আমি ডাকছি, সাড়া দিচ্ছে না। মেসেজ সিন করে না।
নিশি ওকে জড়িয়ে ধরল। ভালো তো। ঘুমাও। আমারও তো মাথা ধরেছে।
তিন মাস পর।
অভিক অফিসে জয়েন করেছে। প্রজেক্ট লিড হিসেবে। বন্ধুদের সাথে তেহারি খেতে যাচ্ছে। রাতে এক ঘুমে ভোর। ফোনটা সারাদিন টেবিলে পড়ে থাকে। দরকার ছাড়া ধরে না। চার্জ ২০ শতাংশে নামলেও খেয়াল করে না।
এক সকালে চা খেতে খেতে অভিক বলল, জানো নিশি, অনেকদিন হলো ওর কথা আর শুনি না। প্রথম প্রথম খারাপ লাগত। মনে হতো কেউ একজন চলে গেছে। এখন ভালো লাগে। মাথাটা হালকা। কাজে মন দিতে পারি।
নিশি চায়ের কাপে চুমুক দিল। তার বুক থেকে যেন দশ কেজি ওজনের পাথর নেমে গেল।
সেটাই তো চাইছিলাম আমরা। তুমি সুস্থ থাকো।
ডাক্তার বললেন, রেমিশন। ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে আরও দুই বছর। স্ট্রেস নেওয়া যাবে না। রাত জাগা যাবে না। আর ঘুমানোর আগে ফোন দেখা কমাতে হবে।
জীবনটা আবার ট্র্যাকে ফিরে এল। নিশি ছাদে নতুন করে মানিপ্ল্যান্ট লাগাল।
চার মাস পর। বৃহস্পতিবার।
অভিক স্টোররুম গোছাচ্ছে। একটা পুরোনো জুতার বাক্স থেকে বের হলো ওর প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ফোন। স্যামসাং গ্যালাক্সি গ্র্যান্ড। স্ক্রিন ফাটা। ছয় বছর আগে মগবাজারের বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়েছিল। চার্জার পোর্টে এখনো জং ধরা দাগ।
নিশি বলল, ফেলে দাও। কী করবে এই জঞ্জাল দিয়ে? ধুলা জমে।
অভিক ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল। হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। একটা পুরোনো অভ্যাস। পুরোনো বন্ধু। ভার্সিটির প্রথম ফোন।
না, থাক। ফেলব না। স্মৃতি।
রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটা চার্জে দিল। পুরনো চার্জারটা খুঁজে পেয়েছে। লাল লাইটটা জ্বলে উঠল। সিম নেই। নেট নেই। শুধু একটা নষ্ট ফোনের লাশ। ব্যাটারি ১ শতাংশ দেখাল।
রাত ৩টা ০৭ মিনিট।
ভাইব্রেশন।
ভোঁ... ভোঁ... ভোঁ...
ঘুমটা ভাঙল না, কেটে গেল। অভিকের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
টেবিলের উপর পুরোনো ফোনটা কাঁপছে। ফাটা স্ক্রিনে নীল আলো জ্বলছে। চার্জারটা খুলে যায়নি।
সে হাত বাড়াল। আঙুল কাঁপছে। লকস্ক্রিনে একটা নোটিফিকেশন। অ্যান্ড্রয়েড ৪.২ এর পুরনো ফন্ট।
প্রেরক: Unknown
একটা নম্বর নেই। নাম নেই। শুধু ‘Unknown’।
মেসেজ: “আজ এত দেরি করলে কেন? চার মাস ধরে ডাকছি। ছাতাটা নিয়ে বের হয়েছি। ভিজে যাচ্ছি। রাস্তায় পানি জমেছে।”
অভিকের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। ‘ছাতাটা’। এই শব্দটা শুধু সে আর ‘ও’ জানত। নিশিকে কখনো বলেনি। ডাক্তারকেও না।
সে পাশে তাকাল। নিশি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মেলাটোনিন খেয়েছে। ডাকতে গিয়েও গলাটা আটকে গেল। ডাকলে কী বলবে? একটা নষ্ট ফোনে মেসেজ এসেছে? সিম ছাড়া ফোনে? নিশি বিশ্বাস করবে? নাকি কাল সকালেই আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। বলবে রিল্যাপ্স করেছে।
অভিক ফোনটা উল্টে রাখল। স্ক্রিনটা টেবিলের সাথে লেগে আছে। কিন্তু ভাইব্রেশন থামছে না।
ভোঁ... ভোঁ... ভোঁ...
থামছেই না। যেন ওপাশের মানুষটা জানে, অভিক জেগে আছে। জানে, অভিক মেসেজটা পড়েছে। মেঝেতে রাখা কাচের গ্লাসটাও হালকা কাঁপছে বলে মনে হলো।
অভিক উঠে বসল। ঘরের ভেতর এসির হাওয়াতেও সে ঘামছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।
সে জানে, রিপ্লাই না দেওয়া পর্যন্ত এই ভাইব্রেশন থামবে না। কাল সকাল পর্যন্ত বাজতে থাকবে।
চার মাস আগে যে দরজাটা বন্ধ করেছিল, সে নিজেই আজ খুলে দিয়েছে। পুরোনো ফোনটা চার্জে দিয়ে।
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি নেমেছে। এই বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস ছিল না। আবহাওয়া অ্যাপে ১০ শতাংশ দেখিয়েছিল শুধু।
আর বারান্দার দরজার নিচ দিয়ে এক ফোঁটা পানি ঘরের ভেতর ঢুকছে।
টপ...
টপ...
কালো ছাতার পানি। সাথে কাদা মেশানো।
(চলবে… গল্প ৪: সংবাদ পাঠকের ইশারা)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।