আন্তোনিও গ্রামশির হাজিমনি (Hegemony) তত্ত্ব
কাল মাক্সপন্থি বাম রাজনীতিতে আন্তোনিও গ্রামশি এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) ছিলেন একজন ইতালীয় মার্কসবাদী দার্শনিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনির সরকার তাঁকে ১৯২৬ সালে গ্রেপ্তার করে। কারাগারে থাকাকালীন তিনি তাঁর বিখ্যাত Prison Notebooks (কারাগারের নোটবই) লেখেন। এই বইগুলিতেই তিনি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলো উপস্থাপন করেন। আমার জীবনে তার দর্শন ও তত্ত্ব সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। বাম রাজনীতিতে দেশ, সমাজ ও ফ্যাসিবাদ বোঝার ক্ষেত্রে তার তত্ত্বগুলো অনেক প্রাসঙ্গিক। তাই আজকে আমরা তার তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব।
প্রথমেই আমরা তার কয়েকটা তত্ত্ব সম্পর্কে জানব তারপর ধারাবাহিক পর্ব আকারে প্রত্যেক তত্ত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করব। গ্রামশির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো:
সাংস্কৃতিক হাজিমনি (Cultural Hegemony)
সিভিল সোসাইটি (Civil Society)
অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল (Organic Intellectual)
ওয়ার অব পজিশন (War of Position)
ওয়ার অব ম্যানুভার (War of Manoeuvre)
প্যাসিভ রেভল্যুশন (Passive Revolution)
এর মধ্যে হাজিমনি (Hegemony) তত্ত্বই সবচেয়ে বিখ্যাত। তাই আজকে আমাদের মূল পয়েন্ট হলো গ্রামশির হাজিমনি তত্ত্ব।
গ্রামশির মতে, ক্ষমতা কেবল বন্দুক, পুলিশ, সেনাবাহিনী বা আইনের মাধ্যমে টিকে থাকে না। একটি শাসক শ্রেণি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে তখনই, যখন সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাদের মূল্যবোধ, ধারণা ও নেতৃত্বকে স্বাভাবিক, যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেয়।
এই স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতাকেই তিনি হাজিমনি (Hegemony) বলেছেন।
সহজ ভাষায়,
"হাজিমনি হলো এমন এক ধরনের আধিপত্য, যেখানে মানুষকে জোর করে নয়, বরং তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে শাসন করা হয়!"।
এখন প্রশ্ন হলো হাজিমনি কীভাবে তৈরি হয়?
গ্রামশি বলেন, শাসক শ্রেণি মানুষের চিন্তা গঠনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এই আধিপত্য তৈরি করে, যেমন: শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম,সাহিত্য, সিনেম, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ইত্যাদি।
এগুলোর মাধ্যমে কিছু ধারণা বারবার প্রচারিত হয়। ধীরে ধীরে মানুষ সেগুলোকে "কমন সেন্স" বা স্বাভাবিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি সমাজে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় যে "বর্তমান ব্যবস্থার বাইরে কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই", তাহলে মানুষ সেই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন না করেই মেনে নিতে পারে। এটাই হাজিমনির কাজ।
গ্রামশির আরও বলেন যে ক্ষমতার দুটি স্তম্ভ
১. Coercion (জবরদস্তি)
আইন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত ইত্যাদির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ।
২. Consent (সম্মতি)
মানুষের স্বেচ্ছাসম্মতি অর্জন করে নিয়ন্ত্রণ।
গ্রামশির মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে দ্বিতীয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি ফলদায়ক। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজরা আমাদেরকে তাদের পোষাক, ভাষা ও অনেক সংস্কৃতি দিয়ে গিয়েছে । আজ ভারতে ব্রিটিশ শাসন নেই কিন্তু তাদের পোষাক, ভাষা আমরা এখনও ব্যবহার করে যাচ্ছি। আপনি যদি কোনো জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে চান তাহলে জবরদস্তি এর চেয়ে ভালো কৌশল হলো তাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করুন।
গ্রামশির এই তত্ত্ব আমরা আমাদের দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশেও প্রয়োগ করতে পারি, যেমন: দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে গ্রামশির তত্ত্ব বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়েছে।
১. ভাষা ও শিক্ষা
ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজি ভাষা, পাশ্চাত্য শিক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে স্বাধীনতার পরও এগুলোর অনেক অংশ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে থেকে যায়। এটি সাংস্কৃতিক হাজিমনি বিশ্লেষণের একটি পরিচিত উদাহরণ।
২. গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি
দক্ষিণ এশিয়ায় বড় আকারের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও বিনোদন শিল্প আঞ্চলিক সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও মিডিয়া মানুষের রুচি, জীবনধারা এবং "আধুনিকতা" সম্পর্কে ধারণা গঠনে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রামশির তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন। এগুলো বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা, সর্বজনস্বীকৃত সত্য নয়।
১. সংবাদমাধ্যম
গণমাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোন বিষয়কে কম গুরুত্ব দেওয়া হবে, বা কোন ভাষায় উপস্থাপন করা হবে, তা মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে গ্রামশির হাজিমনি ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে।
২. সাংস্কৃতিক প্রভাব
বাংলাদেশে ভারতীয় চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, গান এবং ডিজিটাল কনটেন্টের প্রভাব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষক যুক্তি দেন যে এটি আঞ্চলিক সফট পাওয়ার বা সাংস্কৃতিক প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে গ্রামশির সাংস্কৃতিক হাজিমনি ধারণা দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়। তবে এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে।
৩. সামাজিক মূল্যবোধ
সমাজে "ভালো নাগরিক", "সফল মানুষ", "সম্মানজনক পেশা", "উন্নত জীবন" ইত্যাদি সম্পর্কে যে প্রচলিত ধারণাগুলো তৈরি হয়, সেগুলোও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। গ্রামশির ভাষায়, এগুলোই এমন "কমন সেন্স" যা হাজিমনির অংশ হতে পারে।
তো আমরা দেখতে পাচ্ছি যে গ্রামশির তত্ত্ব আমাদের বাস্তব চিন্তাধারা ও সমাজ বুঝার ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক। যখন আমরা হাজিমনি তত্ত্বকে আরও গভীরভাবে বুঝতে শুরু করব তখন আমরা এর মাধ্যমে আমাদের সমাজ কেও বুঝতে পারব। গ্রামশির এই তত্ত্ব আমাদের শিখায় যে বিপ্লব একদিনে হয় না বরং বিল্পবের দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব বজায় রাখতে চাইলে সেটার উপর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে । ১৯৭১ এর রাজাকাররা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছে বার বার কিন্তু কিন্তু তারা তাতে কখনো সফল হতে পারে নি কেননা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিক্ষা সংস্কৃতি তাদের পাকিস্তানপন্থি হাজিমনি এর চেয়ে অনেক শক্তিশালী । আমাদের মুক্তিযুদ্ধপন্থি বুদ্ধিজীবীরা যদি পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে কলম না ধরত তাহলে আজ হয় তো আমরা সম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের স্বাধীনতার চেতনা হারিয়ে ফেলতাম.......।
পরবর্তীতে আমরা আন্তোনিও গ্রামশি এর অন্য তত্ত্বগুলোও বিশ্লেষণ করব এবং সেগুলোর প্রয়োগও দেখাব।
লেখা উৎসর্গ -
সকল মুক্তমনাদের যারা স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে ভালোবাসেন ❣️
প্রিন্স ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।