১. পরিবারের বড় ছেলে
গ্রামের নাম শ্যামপুর। খুব বড় কোনো গ্রাম নয়। গ্রামের এক পাশ দিয়ে সরু পাকা রাস্তা চলে গেছে বাজারের দিকে। রাস্তার দুপাশে ধানখেত, মাঝেমধ্যে পুকুর, আর কিছু পুরোনো বাড়ি। বর্ষায় রাস্তাটার অনেকখানি ডুবে যায়। শীতকালে সকালে ঘাসের ওপর শিশির জমে থাকে। সন্ধ্যা নামলে দূরের মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসে।
এই গ্রামেই বাস করত রফিকদের পরিবার।
পরিবার বলতে বাবা, মা, তিন ভাইবোন আর রফিক নিজে। বাবা আবদুল কাদের একসময় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। খুব বেশি বেতন ছিল না, কিন্তু সম্মান ছিল। সেই সম্মান নিয়েই তিনি সংসার চালাতেন। মা রহিমা বেগম ছিলেন ঘরোয়া মানুষ। সংসারের প্রতিটি জিনিসের হিসাব তাঁর নখদর্পণে। চালের হাঁড়িতে কতটুকু চাল আছে, ছোট মেয়ের স্কুলের বেতন কবে দিতে হবে, ছেলের জামাটা আর কতদিন পরা যাবে—সবই তাঁর জানা।
রফিক ছিল পরিবারের বড় ছেলে।
ছোটবেলা থেকেই সে একটু চুপচাপ স্বভাবের। অন্য ছেলেরা যখন বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলত, রফিক তখন কখনো বাবার সঙ্গে বাজারে যেত, কখনো মায়ের কাজে হাত লাগাত। তবে সে খেলতে ভালোবাসত। তারও ইচ্ছা হতো বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ছুটে বেড়াতে, বৃষ্টিতে ভিজতে, নদীর ধারে বসে গল্প করতে।
কিন্তু সংসারের বড় ছেলে হওয়ার একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। ছোটবেলাতেই তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, সে আর শুধু নিজের জন্য বেঁচে নেই।
একদিনের কথা।
রফিক তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা রেখে মায়ের কাছে গিয়ে বলল,
—মা, কাল স্কুলে বনভোজন। সবাই যাবে। আমিও যাব।
মা তখন রান্নাঘরে বসে ডাল বাছছিলেন। কথাটা শুনে একটু থামলেন।
—কত টাকা লাগবে?
—একশো টাকা।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
—আচ্ছা, দেখি বাবা এলে বলব।
রফিক জানত, এই 'দেখি' কথাটার মানে কী। তবু তার মনে একটা আশা রয়ে গেল।
সেদিন রাতে বাবা বাড়ি ফিরে খাওয়ার পর মাকে জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে?
মা বললেন,
—রফিকের কাল স্কুলে বনভোজন। একশো টাকা লাগবে।
বাবা ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে ছেলের দিকে তাকালেন।
—বনভোজনে গিয়ে কী হবে? পড়াশোনায় মন দাও। সামনের পরীক্ষাটা ভালো করতে হবে।
রফিক আর কিছু বলল না।
পরদিন সকালে সে যথারীতি স্কুলে গেল। বন্ধুরা যখন নতুন জামা পরে, হাতে খাবারের ব্যাগ নিয়ে বাসে উঠছিল, রফিক তখন ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে ছিল। জানালা দিয়ে সে তাদের চলে যাওয়া দেখল।
সেদিন প্রথমবার সে বুঝেছিল, সব ইচ্ছের দাম টাকা দিয়ে মেটানো যায় না। আর কিছু ইচ্ছেকে তো সংসারের হিসাবের খাতায় তোলাই যায় না।
বছর পেরিয়ে গেল। রফিক বড় হতে লাগল। তার সঙ্গে বড় হতে লাগল পরিবারের প্রত্যাশাও।
২. বাবার স্বপ্ন
আবদুল কাদের ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, রফিক একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, ভালো চাকরি করবে, তারপর পরিবারের দুঃখগুলো দূর হয়ে যাবে।
তিনি প্রায়ই বলতেন,
—দেখিস রফিক, তোর জীবনটা যেন আমার মতো না হয়। আমি সারাজীবন স্কুলের বেতন দিয়ে সংসার চালিয়েছি। অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সব পূরণ করতে পারিনি। তুই পড়াশোনা করবি। মানুষের মতো মানুষ হবি।
রফিক বাবার কথা মন দিয়ে শুনত।
সে জানত, বাবার পকেটে টাকা না থাকলেও স্বপ্নের কোনো অভাব নেই।
এসএসসি পরীক্ষায় রফিক ভালো ফল করল। গ্রামের সবাই প্রশংসা করল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবাকে বললেন,
—কাদের সাহেব, আপনার ছেলে অনেক দূর যাবে। ছেলেটাকে পড়াশোনা করান।
বাবার মুখে সেদিন যে হাসি ফুটেছিল, রফিক তা কোনোদিন ভুলতে পারেনি।
কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ই প্রথম সমস্যাটা দেখা দিল। শহরের কলেজে পড়তে হলে থাকা-খাওয়ার খরচ লাগবে। যাতায়াতের খরচও কম নয়।
বাবা নিজের পুরোনো সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা বের করলেন। মা নিজের বিয়ের সময় পাওয়া একটি ছোট সোনার আংটি বিক্রি করার কথা বললেন।
বাবা রাজি হলেন না।
—ওটা বিক্রি করতে হবে না। আমি ব্যবস্থা করছি।
কিন্তু ব্যবস্থা করার মতো আর কিছুই ছিল না।
শেষ পর্যন্ত গ্রামের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নেওয়া হলো। রফিক শহরে চলে গেল।
শহরে এসে সে বুঝল, পড়াশোনার বাইরেও একটা জীবন আছে। সেই জীবনের নাম খরচ।
মাসের শুরুতে বাড়ি থেকে টাকা আসত। প্রথম সপ্তাহে মেসের ভাড়া, খাবার, যাতায়াত আর বই কেনার পর হাতে তেমন কিছু থাকত না। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসতে ইচ্ছে করত, কখনো নতুন একটা শার্ট কিনতে ইচ্ছে করত। কিন্তু সে নিজের ইচ্ছেগুলোকে হিসাবের বাইরে রাখত।
একদিন মা ফোন করে বললেন,
—বাবা, তোর ছোট বোনের স্কুলের বেতনটা দিতে হবে। তুই এই মাসে একটু কম খরচ করিস।
রফিক হেসে বলল,
—আমার কোনো সমস্যা নেই মা। আমি ভালো আছি।
ফোন রেখে সে মেসের জানালার পাশে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
তার কাছে তখন মাত্র চল্লিশ টাকা ছিল। পরদিন দুপুরের খাবার খাবে কীভাবে, সে জানত না।
তবু সে মাকে বলেছিল, ভালো আছে।
কারণ বড় ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই শিখে যায়, নিজের কষ্টের কথা বললে মায়ের মন খারাপ হয়।
৩. একটি পুরোনো শার্ট
কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় রফিক একটি টিউশনি পেল। ক্লাস ফাইভের একটি ছেলেকে পড়াতে হতো। মাসে দেড় হাজার টাকা দিত।
টাকাটা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু রফিকের কাছে সেটাই ছিল স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ।
সেই টাকা দিয়ে সে নিজের খরচ চালানোর চেষ্টা করত। বাড়িতে টাকা পাঠানোর মতো সামর্থ্য তখনো হয়নি।
একদিন শীতের সকালে কলেজে যাওয়ার আগে সে আলমারি খুলে একটি শার্ট বের করল। নীল রঙের শার্ট। শার্টটির কলারের পাশে কাপড় উঠে গেছে। হাতার কাছেও ছোট একটা ছেঁড়া দাগ।
মেসের বন্ধু সুমন বলল,
—দোস্ত, তোর আরেকটা শার্ট নেই?
রফিক হেসে বলল,
—আছে তো। এই একটা, আরেকটা।
—তাহলে নতুন একটা কিনিস না কেন?
—কিনব। একদিন কিনব।
সুমন আর কিছু বলল না।
সেদিন বিকেলে রফিক বাজারে গিয়েছিল। একটি দোকানে সুন্দর সাদা শার্ট দেখে দাঁড়িয়ে গেল। দাম ছিল সাতশো টাকা।
শার্টটা তার খুব পছন্দ হয়েছিল।
কিন্তু পকেটে হাত দিয়ে দেখল, দেড় হাজার টিউশনির টাকা থেকে মেসের বাকি ভাড়া দেওয়ার পর আর বেশি কিছু নেই।
সে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
বাড়ি ফেরার পথে ছোট বোনের ফোন এল।
—ভাইয়া, আমার স্কুলে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। একটা নতুন জামা কিনে দেবে?
রফিক বলল,
—অবশ্যই দেব। তুই পছন্দ করে রাখিস।
ফোন রেখে সে একটু হাসল।
তার নিজের শার্ট কেনা হলো না। কিন্তু বোনের নতুন জামার কথা ভেবে তার মন ভালো হয়ে গেল।
এভাবেই রফিকের জীবন চলছিল। নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে অন্যের প্রয়োজনকে সামনে আনার মধ্যেই সে যেন এক ধরনের শান্তি খুঁজে পেত।
তবে সে তখনো জানত না, এই অভ্যাস একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
৪. বাবার অসুস্থতা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্নটা রফিকের পূরণ হয়েছিল। তবে তার পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়া হয়নি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে সে কাছের একটি কলেজে ভর্তি হয়েছিল।
একদিন দুপুরে ক্লাস চলাকালে মায়ের ফোন এল।
মায়ের কণ্ঠ কাঁপছিল।
—বাবা, তোর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়।
রফিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—কী হয়েছে মা?
—বুকটা ব্যথা করছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নিয়ে গেছে।
রফিক আর কিছু শুনল না। ব্যাগটা নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে গেল।
বাসে বসে তার মনে হচ্ছিল, সময় যেন এগোচ্ছে না। জানালার বাইরে গাছপালা, দোকানপাট, মানুষজন সবকিছুই আগের মতো ছিল। অথচ তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা হঠাৎ বদলে গেছে।
হাসপাতালে পৌঁছে সে দেখল বাবা একটি বেডে শুয়ে আছেন। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে। মা পাশে বসে কাঁদছেন।
ডাক্তার জানালেন, বাবার হৃদ্রোগের সমস্যা হয়েছে। আরও পরীক্ষা করতে হবে। নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। আপাতত বিশ্রাম দরকার।
রফিক ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল,
—কত টাকা লাগবে ডাক্তার সাহেব?
ডাক্তার কিছু পরীক্ষা লিখে দিলেন।
সেদিন রাতে হাসপাতালের বারান্দায় বসে রফিক হিসাব করছিল। হাতে যা টাকা ছিল, তা দিয়ে প্রাথমিক খরচ মেটানো যাবে। কিন্তু পরের দিনগুলো কীভাবে চলবে?
বাবা তাকে কাছে ডাকলেন।
—রফিক।
—জি, বাবা।
—তুই পড়াশোনাটা বন্ধ করিস না।
রফিক বাবার হাত ধরে বলল,
—আগে তুমি সুস্থ হও। পড়াশোনা পরে হবে।
বাবা একটু হাসলেন।
—জীবনে সবকিছু একসঙ্গে হয় না রে বাবা।
সেই রাতেই রফিক সিদ্ধান্ত নিল, পড়াশোনার পাশাপাশি একটা স্থায়ী কাজ খুঁজবে।
কিছুদিন পর বাবাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু তিনি আর আগের মতো কাজ করতে পারতেন না। স্কুল থেকে অবসর নেওয়ার বয়সও কাছাকাছি এসে গিয়েছিল।
সংসারের উপার্জনের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠল রফিক।
তার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নটা তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, স্বপ্নের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে ওষুধের খরচ, বাজারের টাকা আর ছোট ভাইবোনের পড়াশোনা।
৫. চাকরি আর নতুন দায়িত্ব
রফিক একটি ছোট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব সহকারীর চাকরি পেল। বেতন বারো হাজার টাকা।
শুনতে খুব বেশি কিছু নয়। কিন্তু সেই সময় তার কাছে বারো হাজার টাকা মানে ছিল একটা পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
প্রথম বেতন পাওয়ার দিন সে অফিস থেকে ফেরার পথে বাজারে গেল। বাবার জন্য ওষুধ কিনল, মায়ের জন্য একটি শাড়ি, ছোট বোনের জন্য স্কুলের ব্যাগ আর ভাইয়ের জন্য একটি জ্যামিতি বক্স।
নিজের জন্য কিছুই কিনল না।
বাড়িতে ফিরে মায়ের হাতে বেতনের বাকি টাকা দিয়ে বলল,
—মা, এই মাস থেকে আর তোমাদের চিন্তা করতে হবে না।
মা টাকাগুলো হাতে নিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—তোর নিজের খরচ আছে না বাবা?
—আমার আবার কী খরচ? অফিসে খাই, বাড়িতে এসে খাই। হয়ে যায়।
মা কিছু বললেন না। শুধু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
রাতের খাবারের সময় বাবা বললেন,
—তুই অনেক কষ্ট করছিস, রফিক।
রফিক হাসল।
—কষ্ট কিসের বাবা? তোমরা আছ, এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
বাবা চুপ করে গেলেন।
তিনি জানতেন, ছেলেটা অনেক কিছু ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু কীভাবে তাকে বোঝাবেন যে বাবারও কষ্ট হয়?
কিছুদিন পর সংসারের দায়িত্ব আরও বাড়ল। ছোট ভাই সজীব কলেজে ভর্তি হলো। ছোট বোন মিতুর এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু হলো।
বাড়ির চালের খরচ, বিদ্যুৎ বিল, ওষুধ, পড়াশোনা, যাতায়াত—সবকিছু মিলিয়ে বারো হাজার টাকা আর যথেষ্ট হচ্ছিল না।
রফিক অফিসের পর সন্ধ্যায় আরেকটি টিউশনি শুরু করল।
রাত দশটার দিকে বাড়ি ফিরত। খেয়ে শুয়ে পড়ত। ভোরে আবার উঠতে হতো।
কখনো শরীর খারাপ করত। কখনো মাথাব্যথা হতো। তবু সে ছুটি নিত না।
কারণ সে জানত, একদিনের বেতন কেটে গেলে সেই টাকায় হয়তো বাবার ওষুধ কেনা যাবে না।
৬. নীলার সঙ্গে পরিচয়
মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে, যাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মনে হয়, জীবনটা হয়তো এত কঠিন হওয়ার কথা ছিল না।
রফিকের জীবনেও এমন একজন এসেছিল।
তার নাম নীলা।
একই অফিসের পাশের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত নীলা। প্রতিদিন দুপুরে অফিসের কাছের ছোট চায়ের দোকানে তাদের দেখা হতো।
প্রথম দিকে শুধু চোখাচোখি হতো। পরে একদিন বৃষ্টির মধ্যে একই ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পরিচয়।
নীলা বলেছিল,
—আপনি প্রতিদিন এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যান?
রফিক হেসে বলেছিল,
—বাড়ি।
—বাড়িতে কি কেউ অপেক্ষা করে?
রফিক একটু থেমে বলেছিল,
—হ্যাঁ। অনেকেই।
নীলা তখন বুঝতে পারেনি, কথাটার ভেতরে কতগুলো মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।
ধীরে ধীরে তাদের কথা বাড়তে লাগল। কখনো চা খাওয়া, কখনো অফিসের গল্প, কখনো বৃষ্টির দিনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলা।
নীলা একদিন বলেছিল,
—আপনি নিজের কথা কখনো বলেন না কেন?
রফিক বলেছিল,
—নিজের কথা বলার মতো তেমন কিছু নেই।
—সব মানুষেরই নিজের একটা গল্প থাকে।
রফিক হেসেছিল।
—আমার গল্পটা একটু লম্বা। শুনলে হয়তো বিরক্ত হয়ে যাবেন।
নীলা বলেছিল,
—শোনার সময় থাকলে গল্প লম্বা হলেও সমস্যা নেই।
সেদিন রফিক প্রথমবার নিজের পরিবারের কথা বলেছিল। বাবার অসুস্থতা, মায়ের কষ্ট, ভাইবোনের পড়াশোনা, নিজের চাকরি—সব।
নীলা মন দিয়ে শুনেছিল।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছিল,
—আপনি অনেক দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু নিজের জন্যও তো একটু বাঁচা দরকার।
রফিক উত্তর দেয়নি।
সে জানত, নিজের জন্য বাঁচার কথাটা বলা যত সহজ, বাস্তবে তা করা তত সহজ নয়।
একদিন নীলা তাকে জিজ্ঞেস করল,
—আপনার কোনো স্বপ্ন নেই?
রফিক বলল,
—ছিল।
—এখন?
—এখন আমার পরিবারের স্বপ্নগুলোই আমার স্বপ্ন।
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
—মানুষের নিজের একটা জীবনও থাকা উচিত, রফিক সাহেব।
রফিক সেদিন কথাটা শুনে হেসেছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।
অনেকদিন পর তার মনে হয়েছিল, কেউ একজন তার নিজের কথাও ভাবছে।
৭. যে ভালোবাসা সংসারের কাছে হেরে গেল
নীলার সঙ্গে সম্পর্কটা ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠেছিল। তারা একে অপরকে ভালোবাসত। তবে কেউ কখনো খুব বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
নীলা জানত, রফিকের সংসারের অবস্থা ভালো নয়। রফিকও জানত, নীলার পরিবার তার জন্য অপেক্ষা করবে না অনন্তকাল।
একদিন নীলা বলল,
—বাড়িতে আমার বিয়ের কথা বলছে।
রফিক চুপ করে রইল।
—তুমি কিছু বলছ না কেন?
—কী বলব?
—তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও না?
রফিক মাথা নিচু করল।
—চাই।
—তাহলে?
রফিক অনেকক্ষণ পর বলল,
—আমার বাবার চিকিৎসার খরচ আছে। সজীবের পড়াশোনা আছে। মিতুর বিয়ে দিতে হবে একদিন। এখন আমি তোমাকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করলে তোমার ওপরও কষ্ট চাপবে।
নীলার চোখ ভিজে উঠল।
—তুমি কি মনে করো, আমি শুধু ভালো সময়ের জন্য তোমার পাশে থাকতে এসেছি?
রফিক উত্তর দিতে পারল না।
নীলা বলল,
—সব দায়িত্ব কি তোমার একার? তোমার ভাই নেই? বোন নেই? বাবা-মা নেই? তারা কি কখনো তোমার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করবে না?
রফিকের গলাটা ভারী হয়ে এল।
—আমি জানি না, নীলা। শুধু জানি, আমার পেছনে তাকালে অনেকগুলো মুখ দেখতে পাই। আমি তাদের ছেড়ে সামনে যেতে পারি না।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তাহলে তোমার জীবনে আমার জায়গাটা কোথায়?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর রফিকের কাছে ছিল না।
দিন পেরিয়ে গেল। নীলার বাড়িতে বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো।
শেষবার দেখা করার দিন নীলা একটি ছোট কাগজে কিছু লিখে রফিকের হাতে দিল।
লেখা ছিল,
"তুমি ভালো থেকো। তোমার জীবনে হয়তো অনেক মানুষের দায়িত্ব আছে। শুধু একবার নিজের দিকেও তাকিয়ো। সব মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।"
রফিক কাগজটা পকেটে রাখল।
নীলা চলে যাওয়ার সময় একবার পেছনে তাকিয়েছিল। রফিকও তাকিয়ে ছিল।
কেউ কাউকে ডাকেনি।
সেদিন রাতে রফিক বাড়ি ফিরে বাবার ওষুধ কিনে আনল, মিতুর পড়ার খোঁজ নিল, সজীবের কলেজের বেতন দিল।
তারপর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
পকেট থেকে কাগজটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
তারপর বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদল।
সেদিন তার কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পায়নি।
পরদিন সকালে আবার অফিসে যাওয়ার সময় সে আগের মতোই হাসছিল।
সংসারে বড় ছেলের কান্নার জন্য আলাদা কোনো সময় বরাদ্দ থাকে না।
৮. ছোট ভাইয়ের স্বপ্ন
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। রফিকের বয়স বাড়তে লাগল। সঙ্গে বাড়তে লাগল তার দায়িত্ব।
সজীব কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রফিকের ইচ্ছা ছিল, ভাই যেন ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।
সজীব একদিন বলল,
—ভাইয়া, ঢাকায় কোচিং করতে হবে। মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা লাগবে।
রফিক একটু চিন্তা করল।
—আচ্ছা, ব্যবস্থা করছি।
সজীব বলল,
—কিন্তু তোমার তো অনেক খরচ। না হলে আমি পরে চেষ্টা করব।
রফিক ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল।
—তুই শুধু পড়াশোনা কর। টাকার চিন্তা আমার।
সেই মাসে রফিক নিজের মেসের পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা বাদ দিল। নতুন জুতা কেনার কথা ছিল, সেটাও বাদ দিল। অফিসের সহকর্মীর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিল।
সজীব কোচিংয়ে ভর্তি হলো।
কয়েক মাস পর সে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল।
বাড়িতে সেদিন আনন্দের শেষ ছিল না। মা প্রতিবেশীদের মিষ্টি খাওয়ালেন। বাবা বিছানায় শুয়ে ছেলেকে দোয়া করলেন।
সজীব আনন্দে বলল,
—ভাইয়া, তোমার জন্যই হয়েছে সবকিছু।
রফিক হেসে বলল,
—এখনো অনেক পথ বাকি। ভালো করে পড়াশোনা করিস।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ কম ছিল না। থাকা, খাওয়া, বই, যাতায়াত—সব মিলিয়ে রফিকের ওপর নতুন চাপ তৈরি হলো।
কখনো সজীব ফোন করে বলত,
—ভাইয়া, এই মাসে একটু বেশি টাকা লাগবে। বন্ধুরা একটা শিক্ষা সফরে যাবে।
রফিক বলত,
—যা, ঘুরে আয়।
সজীব বলত,
—তোমাকে কষ্ট করতে হবে না তো?
—না রে। আমি ভালো আছি।
সজীব হয়তো বিশ্বাস করত।
সে জানত না, ভাইয়া অনেক দিন ধরে দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে ভাত না খেয়ে শুধু চা আর বিস্কুট খেয়ে কাটাচ্ছে।
সে জানত না, রফিকের জুতার তলা উঠে গেছে।
সে জানত না, নিজের বেতনের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পর রফিককে মাসের শেষ সপ্তাহে ধার করতে হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, সে জানত না—তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তার বড় ভাইয়ের নিজের পড়াশোনা, নিজের ভালোবাসা, নিজের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো অনেক আগেই কোথাও হারিয়ে গেছে।
৯. মিতুর বিয়ে
মিতু ছিল পরিবারের সবচেয়ে ছোট। ছোটবেলা থেকে রফিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অন্যরকম।
মিতু কোনো কিছু চাইলে রফিক না বলতে পারত না। ছোটবেলায় মিতু তাকে ভাইয়া বলে ডাকত আর পেছন পেছন ঘুরত। স্কুলে যেতে না চাইলে রফিক তাকে বুঝিয়ে নিয়ে যেত।
মিতু যখন বড় হলো, তখন তার বিয়ের কথা উঠল।
একটি ভালো পরিবার থেকে সম্বন্ধ এসেছিল। ছেলেটি চাকরি করে। পরিবারের অবস্থাও ভালো।
মা খুব খুশি হলেন।
—রফিক, মেয়েটার বিয়েটা ভালোভাবে দিতে পারলে আমার আর কোনো চিন্তা থাকবে না।
রফিক মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল।
—তুমি চিন্তা করো না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু বিয়ের খরচের হিসাব শুনে তার মাথায় হাত পড়ল।
পাত্রপক্ষ সরাসরি কিছু দাবি করেনি। তবু বিয়ের আয়োজন, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, অতিথি আপ্যায়ন—সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা দরকার।
রফিক নিজের সঞ্চয় ভাঙল। অফিস থেকে অগ্রিম বেতন নিল। পরিচিত কয়েকজনের কাছ থেকে ধার করল।
বাবা একদিন তাকে বললেন,
—বাবা, এত খরচ করিস না। সামর্থ্যের মধ্যে বিয়ে দে।
রফিক বলল,
—মিতুর বিয়ে তো বাবা। একটু ভালোভাবে না দিলে কি হয়?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোর নিজের ভবিষ্যৎটাও তো আছে।
রফিক হেসে বলল,
—আমার ভবিষ্যৎ পরে দেখা যাবে।
বিয়ের দিন বাড়িতে অনেক মানুষ। উঠানে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। রান্নার লোকজন ব্যস্ত। মিতুকে সাজানো হচ্ছে।
রফিক বাইরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।
একসময় মিতু তাকে ডাকল।
—ভাইয়া, একটু এদিকে আসো।
রফিক ঘরে ঢুকতেই মিতু তার হাত ধরে বলল,
—তুমি আমার জন্য এত কিছু করেছ। আমি কোনোদিন তোমার ঋণ শোধ করতে পারব না।
রফিক হেসে বলল,
—ভাইয়ের কাছে ঋণ থাকে নাকি?
মিতু কাঁদতে শুরু করল।
—তুমি নিজের জন্য কিছুই করো না কেন ভাইয়া?
রফিক তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—তুই ভালো থাকলেই আমার সবকিছু হয়ে যায়।
কথাটা সে অনেকবার বলেছে। কিন্তু সেদিন কথাটা বলতে গিয়ে তার নিজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠেছিল।
রাতের শেষ দিকে মিতু চলে গেল।
গাড়ি যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল, মা দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।
রফিক মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল।
মা বললেন,
—বাড়িটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল, বাবা।
রফিক বলল,
—আবার আসবে মা। মেয়েরা কি আর বাবার বাড়ি ভুলতে পারে?
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—তুইও একদিন নিজের সংসার করিস, বাবা।
রফিক হাসল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ছিল।
তার নিজের সংসারের কথা কেউ আর তেমন করে ভাবেনি।
১০. মায়ের চোখে বড় ছেলে
বছর কয়েক পর রফিকের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেল। মাথার সামনে কয়েকটি চুল সাদা হয়ে উঠেছে। চোখের নিচে কালচে দাগ। শরীরও আগের মতো নেই।
তবু মা তাকে এখনো ছোটবেলার মতোই দেখতেন।
মাঝে মাঝে মা বলতেন,
—বাবা, তুই একটু বিয়ে কর। ঘরে একজন মানুষ থাকলে তোরও ভালো লাগবে।
রফিক বলত,
—এখনো সময় হয়নি মা।
—সময় হবে কবে? তোর বয়স তো কম হলো না।
রফিক হেসে বিষয়টা এড়িয়ে যেত।
মা বুঝতে পারতেন, ছেলের বিয়ে না করার পেছনে শুধু টাকার অভাব নেই। কোথাও একটা পুরোনো কষ্টও রয়ে গেছে।
একদিন দুপুরে মা ছেলের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে আলমারির ভেতর একটা পুরোনো খাম পেলেন। খামের ভেতরে একটি ছোট কাগজ। নীলার সেই চিঠি।
মা কাগজটা পড়লেন।
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
সন্ধ্যায় রফিক বাড়ি ফিরলে মা তাকে ডাকলেন।
—বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—বলো মা।
—তোর কি কাউকে পছন্দ ছিল?
রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ছিল মা।
—তাহলে বিয়ে করলি না কেন?
—সবকিছু তো ইচ্ছেমতো হয় না।
মা ছেলের হাত ধরে বললেন,
—আমাদের জন্য তুই নিজের জীবনটা নষ্ট করে ফেললি না তো বাবা?
রফিক একটু হেসে বলল,
—কী যে বলো মা! তোমাদের জন্য কিছু করতে পারলে আমার জীবন নষ্ট হবে কেন?
মায়ের চোখ ভিজে উঠল।
—সব মা-বাবা চায় তাদের সন্তান ভালো থাকুক। কিন্তু আমরা তোকে শুধু দায়িত্বের মধ্যে আটকে রাখিনি তো?
রফিক মায়ের হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,
—না মা। তোমরা আমাকে কখনো আটকে রাখোনি। আমি নিজেই থাকতে চেয়েছি।
মা আর কিছু বলতে পারলেন না।
কিন্তু সেই রাতে তিনি অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেননি।
ছেলের ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। ভেতরে আলো জ্বলছিল। মা জানতেন, রফিক হয়তো হিসাব করছে—কোন মাসে কার টাকা দিতে হবে, বাবার ওষুধ কতদিন চলবে, সজীবের নতুন চাকরির জন্য কী করা যায়।
তিনি ভাবছিলেন, যে ছেলেটি ছোটবেলায় নতুন জামার জন্য আবদার করত, সে এখন নিজের জন্য কিছু চাওয়াই ভুলে গেছে।
১১. বাবার শেষ রাত
একদিন গভীর রাতে বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।
রফিক ঘুম থেকে উঠে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার জানালেন, অবস্থা ভালো নয়।
মা হাসপাতালের করিডরে বসে কাঁদছিলেন। সজীব তখন ঢাকায়। খবর পেয়ে রওনা দিয়েছে।
রফিক বাবার পাশে বসে ছিল।
আবদুল কাদের অনেক কষ্টে চোখ খুললেন।
—রফিক।
—আমি আছি বাবা।
—তুই অনেক কষ্ট করেছিস রে।
—এমন কথা বলো না বাবা। তুমি ভালো হয়ে যাবে।
বাবা মাথা নাড়লেন।
—আমার হয়তো আর বেশি সময় নেই।
রফিক বাবার হাত শক্ত করে ধরল।
—চুপ করো বাবা। এসব কথা বলবে না।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তোর পড়াশোনাটা শেষ করতে পারলাম না। তোর জীবনটাও গুছিয়ে দিতে পারলাম না।
রফিকের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—তুমি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছ বাবা। তুমি আছ, এটাই অনেক।
বাবা তার হাতের ওপর হাত রাখলেন।
—তোর ছোট ভাইবোনদের দেখিস। তবে একটা কথা মনে রাখিস, সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিস না। মানুষকে নিজের দায়িত্ব নিজেকেও নিতে হয়।
রফিক মাথা নাড়ল।
বাবা আবার বললেন,
—আর নিজের জন্যও একটু বাঁচিস।
কথাগুলো বলার পর বাবা চোখ বন্ধ করলেন।
ভোরের দিকে তিনি চলে গেলেন।
রফিক বাবার হাত ধরে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই হাতটা একসময় তাকে ধরে রাস্তা পার করিয়েছে। স্কুলে নিয়ে গেছে। পরীক্ষার আগে মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছে।
আজ সেই হাত আর নড়ছে না।
মা যখন বাবার মৃত্যুর খবর শুনলেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
রফিক মাকে জড়িয়ে ধরল।
—মা, তুমি শক্ত হও।
নিজের বাবাকে হারিয়ে যে ছেলেটির পৃথিবী ভেঙে পড়েছে, তাকেই তখন সবাই শক্ত থাকতে বলছিল।
সেদিনও সে কাঁদতে পারেনি।
১২. ছোট ভাইয়ের পরিবর্তন
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পরিস্থিতি আরও বদলে গেল।
সজীব বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পেল। তার বেতন রফিকের চেয়েও বেশি।
রফিক ভেবেছিল, এবার হয়তো সংসারের দায়িত্ব একটু ভাগ হবে।
কিন্তু সজীবের জীবন তখন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে।
সে ঢাকায় চাকরি করে। বন্ধুদের সঙ্গে থাকে। নতুন মোবাইল কিনেছে। মাঝে মাঝে ঘুরতে যায়।
একদিন রফিক ফোন করে বলল,
—সজীব, তোর বেতনের কিছু অংশ বাড়িতে পাঠাতে পারবি? মায়ের ওষুধের খরচ বেড়েছে।
সজীব বলল,
—ভাইয়া, এই মাসে একটু সমস্যা আছে। বাসার ভাড়া, নিজের খরচ, কিছু কিস্তি—সব মিলিয়ে টাকা থাকে না। আগামী মাস থেকে দেখব।
রফিক বলল,
—আচ্ছা, সমস্যা নেই।
পরের মাসেও একই উত্তর।
একদিন মায়ের ওষুধ কিনতে গিয়ে রফিকের পকেটে টাকা কম পড়ল। সে সজীবকে ফোন করল।
—ভাই, মায়ের ওষুধটা শেষ হয়ে গেছে। কিছু টাকা পাঠাস।
সজীব বিরক্ত হয়ে বলল,
—ভাইয়া, তুমি সব সময় আমার কাছেই টাকা চাও কেন? আমারও তো নিজের জীবন আছে।
রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—ঠিক আছে। আর বলব না।
ফোন কেটে গেল।
রফিক অনেকক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার মনে পড়ল, একদিন এই ছেলেটার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য সে নিজের দুপুরের খাবার বাদ দিয়েছিল। নিজের জুতা কেনেনি। বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করেছিল।
সজীবের মনে হয়তো সেসব আর নেই।
অথবা আছে, কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় সেগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।
রফিক কাউকে কিছু বলল না।
পরদিন অফিস থেকে ফেরার সময় নিজের জন্য কেনা একটি শার্টের টাকা দিয়ে মায়ের ওষুধ কিনে আনল।
মা ওষুধ দেখে বললেন,
—বাবা, তুই আবার নিজের খরচ বন্ধ করেছিস?
রফিক বলল,
—না মা। আমার অনেক শার্ট আছে।
মা জানতেন, ছেলের কথাটা সত্যি নয়।
১৩. বড় ছেলের বিয়ে
একসময় রফিকের বিয়ের কথা আবার উঠল।
এবার মা বেশ জোর করলেন।
—আমি আর কতদিন থাকব বাবা? তোর একটা সংসার দেখে যেতে চাই।
রফিক মাকে কষ্ট দিতে চাইল না।
এক আত্মীয়ের মাধ্যমে একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। মেয়েটির নাম ফারজানা। সাধারণ পরিবারের মেয়ে। স্নাতক শেষ করেছে। স্বভাব শান্ত।
তাদের বিয়ে হলো।
ফারজানা প্রথম দিকে রফিকের সংসারের সবকিছু বুঝে উঠতে পারেনি। তবে সে চেষ্টা করত।
বিয়ের কিছুদিন পর এক রাতে সে বলল,
—তোমাকে একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি কি কখনো নিজের জন্য কিছু ভাবো?
রফিক হেসে বলল,
—আবার সেই একই প্রশ্ন!
ফারজানা বলল,
—তোমার বেতন পাওয়ার পর প্রায় সব টাকা বাড়িতে চলে যায়। আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কিছু জমাতে হবে না?
রফিক বলল,
—জমাব। একটু সময় দাও। মায়ের ওষুধ, বাড়ির খরচ, সজীবের কিছু দায়িত্ব আছে।
ফারজানা শান্ত গলায় বলল,
—আমি তোমার পরিবারকে নিজের পরিবার মনে করি। কিন্তু আমাদেরও তো একটা জীবন আছে। আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সন্তান হলে তার ভবিষ্যৎ—এসবও ভাবতে হবে।
রফিক এবার একটু বিরক্ত হলো।
—তুমি কি চাও, আমি মাকে একা ফেলে দিই?
ফারজানা অবাক হয়ে তাকাল।
—আমি কি সেটা বলেছি?
কথাটা সেখানেই শেষ হলো।
কিন্তু তাদের সংসারে অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হতে লাগল।
ফারজানা কখনো নিজের জন্য কিছু কিনতে চাইলে রফিক হিসাব করতে বসত। আবার মা কোনো কিছু চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করত।
ফারজানা বিষয়টি বুঝত, কিন্তু তারও তো ইচ্ছা ছিল। তারও কখনো শখ হতো স্বামীর সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যেতে, একসঙ্গে বাইরে খেতে, নিজের ঘরের জন্য কিছু কিনতে।
একদিন ফারজানা বলল,
—আমরা কি কখনো শুধু নিজেদের জন্য কোথাও যাব?
রফিক বলল,
—অবশ্যই যাব। এই মাসটা শেষ হোক।
মাস শেষ হলো। তারপর আরেক মাস। তারপর আরেক বছর।
কিন্তু যাওয়া হলো না।
একদিন ফারজানা খুব শান্তভাবে বলল,
—তুমি খারাপ মানুষ নও, রফিক। কিন্তু তুমি কখনো কাউকে না বলতে শেখোনি। আর তোমার এই না বলতে না পারার অভ্যাসে আমাদের সংসারটাই ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে।
রফিক কিছু বলল না।
সে জানত, কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়।
১৪. একটি ছোট্ট প্রশ্ন
বিয়ের দুই বছর পর তাদের একটি ছেলে হলো। নাম রাখা হলো আরিয়ান।
ছেলেটি যখন প্রথমবার বাবার আঙুল ধরল, রফিকের মনে হলো, এতদিন পর জীবনে সে নিজের বলে কাউকে পেল।
রাত জেগে ছেলের কান্না শুনত। অফিস থেকে ফিরে ছেলেকে কোলে নিত। ছোট্ট হাতের আঙুলগুলো ধরে থাকত অনেকক্ষণ।
একদিন আরিয়ানের বয়স চার বছর।
সন্ধ্যায় রফিক অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে। ছেলেটি দৌড়ে এসে বলল,
—বাবা, তুমি আমার সঙ্গে খেলবে?
রফিক তখন মায়ের ওষুধের হিসাব করছিল।
—একটু পরে বাবা।
আরিয়ান পাশে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর আবার বলল,
—বাবা, এখন খেলবে?
—আরেকটু পরে।
ছেলেটি এবার চুপ করে গেল।
রাতের খাবারের পর রফিক দেখল, আরিয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশে খেলনাগুলো ছড়িয়ে আছে।
সে ছেলের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল নিজের শৈশবের কথা। সেই বনভোজনের দিন। বন্ধুরা বাসে উঠেছিল, আর সে স্কুলের শেষ বেঞ্চে বসে ছিল।
সে কি নিজের ছেলেকেও একই অপেক্ষার মধ্যে বড় করছে?
পরদিন সকালে আরিয়ান ঘুম থেকে ওঠার আগেই রফিক অফিসে চলে গেল।
বিকেলে ফিরে ছেলেকে কোলে নিয়ে বলল,
—চল, আজ আমরা মাঠে যাব।
আরিয়ান আনন্দে হাততালি দিল।
সেদিন তারা অনেকক্ষণ মাঠে খেলেছিল। ছেলেটি বাবার হাত ধরে দৌড়াচ্ছিল।
ফেরার পথে আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, তুমি প্রতিদিন আমার সঙ্গে খেলতে আসবে?
রফিক হাসল।
—চেষ্টা করব বাবা।
আরিয়ান বলল,
—চেষ্টা না। আসবে।
রফিক ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
তার মনে হলো, জীবনের কোনো এক জায়গায় হয়তো সে নিজের শৈশবের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আবার ফিরে পাচ্ছে।
কিন্তু সংসারের দায়িত্ব মানুষকে খুব বেশি সময় এক জায়গায় দাঁড়াতে দেয় না।
১৫. একটি অদৃশ্য ক্লান্তি
রফিকের বয়স তখন ছত্রিশ। চাকরিতে পদোন্নতি হয়েছে, বেতনও কিছু বেড়েছে। কিন্তু খরচের পরিমাণ তার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে।
মায়ের নিয়মিত চিকিৎসা, নিজের সংসার, ছেলের স্কুল, গ্রামের বাড়ির মেরামত—সব মিলিয়ে মাসের শেষে আর তেমন কিছু থাকত না।
সজীবের বিয়ে হয়েছে। সে এখন আলাদা সংসার করে। মিতুও স্বামীর বাড়িতে ভালো আছে।
তবে তাদের প্রয়োজন হলে ফোন আসে রফিকের কাছেই।
কখনো মিতুর স্বামীর চাকরির সমস্যা, কখনো সজীবের বাসা পরিবর্তনের খরচ, কখনো গ্রামের জমির কাগজপত্র—সবকিছুর জন্য বড় ভাইয়ের কাছে পরামর্শ ও সাহায্য চাওয়া হয়।
রফিক কাউকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।
একদিন অফিসে কাজ করতে করতে তার মাথা ঘুরে গেল। সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
ডাক্তার বললেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাবার ও ঘুমের অভাবের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিয়ম মেনে চলতে হবে।
ডাক্তার যখন জিজ্ঞেস করলেন,
—আপনি কি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেন?
রফিক একটু হেসে বলল,
—চেষ্টা করি।
—কাজের চাপ বেশি?
—হ্যাঁ।
—বাড়িতে কেউ নেই আপনার?
রফিক বলল,
—আছে। মা আছেন, স্ত্রী আছে, ছেলে আছে।
ডাক্তার বললেন,
—তাহলে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বটাও তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিন।
রফিক কোনো উত্তর দিল না।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে সে ভাবছিল, এতগুলো মানুষ তার ওপর নির্ভর করে, অথচ সে নিজে অসুস্থ হলে কয়েক দিনের বেশি বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও নেই।
রাতে ফারজানা বলল,
—তোমাকে এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না।
রফিক বলল,
—আর কী করব বলো? সবাই তো আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ফারজানা বলল,
—সবাই তাকিয়ে আছে বলে কি তোমার ভেঙে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে?
রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কেউ তো বুঝতে চায় না।
ফারজানা তার পাশে এসে বসল।
—আমি বুঝি, রফিক। কিন্তু তুমি নিজেও তো কাউকে তোমার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দাও না। সবকিছু নিজের হাতে রাখতে চাও।
রফিক চুপ করে রইল।
সত্যি বলতে, সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারত না যে তারা দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করবে। বহু বছর ধরে সে নিজেই সব করেছে। ফলে অন্য কাউকে কিছু ছেড়ে দেওয়া তার কাছে ভয়ংকর কঠিন হয়ে উঠেছিল।
১৬. যে ফোনটি আর করা হলো না
এক শুক্রবার দুপুরে রফিক অফিসে ছিল না। বাড়িতে মায়ের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিল।
মা হঠাৎ বললেন,
—বাবা, তোর একটা কথা মনে আছে?
—কী কথা মা?
—তুই ছোটবেলায় বলতিস, বড় হয়ে আমাকে শহরে নিয়ে যাবি। একটা বড় বাড়ি কিনবি। আমাকে আর রান্না করতে হবে না।
রফিক হেসে বলল,
—মনে আছে তো।
—কই, কিছুই তো হলো না।
মা কথাটা মজা করে বলেছিলেন। কিন্তু রফিকের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সে বলল,
—একদিন হবে মা। এখনো সময় আছে।
মা ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।
—তোর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে কত গল্প করতিস। এখন তো তোর সঙ্গে ঠিকমতো কথাই বলা হয় না।
রফিক মায়ের হাত ধরে বলল,
—আমি তো আছি মা।
মা বললেন,
—থাকিস। তবে শুধু শরীর নিয়ে থাকিস না। মন নিয়েও একটু থাকিস।
কথাটা শুনে রফিক মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই কথাগুলোই হয়তো সে সারাজীবন শুনতে চেয়েছিল।
সেদিন বিকেলে সজীবের ফোন এল।
—ভাইয়া, গ্রামের জমির একটা কাগজ দরকার। তুমি একটু দেখে দিও।
—আচ্ছা, পাঠিয়ে দিস।
—আর একটা কথা, আগামী সপ্তাহে একটু টাকা লাগবে। একটা কাজ আছে।
রফিক বলল,
—কী কাজ?
—একটা পুরোনো ঋণ শোধ করতে হবে।
রফিক বলল,
—দেখি কী করা যায়।
ফোন রেখে সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
মা বললেন,
—কী হয়েছে?
—কিছু না মা।
মা ছেলের মুখ দেখে বুঝলেন, কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু তিনি আর প্রশ্ন করলেন না।
বড় ছেলেরা অনেক সময় নিজের কষ্ট লুকাতে লুকাতে এমন হয়ে যায় যে, তাদের মুখের নীরবতাও পরিবারের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।
১৭. মায়ের চলে যাওয়া
এক শীতের সকালে মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
বয়স হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্ত নেই। কয়েক দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন।
রফিক ডাক্তার দেখাল। ওষুধ আনল। অফিস থেকে ছুটি নিল।
কিন্তু মায়ের অবস্থা ভালো হচ্ছিল না।
এক রাতে মা রফিককে কাছে ডাকলেন।
—বাবা, একটু বস।
রফিক বিছানার পাশে বসল।
—কিছু লাগবে মা?
—না। তোর সঙ্গে একটু কথা বলব।
—বলো।
মা ছেলের হাত ধরে বললেন,
—তুই ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করেছিস। আমি তোকে কখনো কিছু দিতে পারিনি।
রফিক বলল,
—আবার এসব বলছ কেন মা?
—শোন। তোর বাবার পর তুই আমার সব ছিলি। তুই না থাকলে এই সংসারটা এতদিন চলত না।
রফিকের চোখ ভিজে উঠল।
মা আবার বললেন,
—কিন্তু বাবা, একটা কথা মনে রাখিস। তোর জীবনটা শুধু অন্যদের জন্য না। তোরও একটা জীবন আছে। নিজের ছেলেটার সঙ্গে সময় কাটাস। ফারজানাকে সময় দিস। নিজের শরীরের যত্ন নিস।
রফিক মায়ের হাত নিজের কপালে ঠেকাল।
—তুমি ভালো হয়ে ওঠো মা। তোমার সব কথা শুনব।
মা একটু হাসলেন।
—তুই ছোটবেলায় যখন অসুস্থ হতি, আমি সারারাত জেগে থাকতাম। আজ তুই আমার পাশে বসে আছিস। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।
সেই রাতেই মা ঘুমিয়ে পড়লেন।
ভোরের দিকে তাঁর শ্বাস ধীরে ধীরে থেমে গেল।
রফিক মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
মায়ের হাতটা ধরে সে অনেকক্ষণ বসেছিল। সেই হাত একদিন তাকে ভাত খাইয়ে দিয়েছে, জ্বরের সময় কপালে পানি দিয়েছে, স্কুলের জন্য জামা গুছিয়ে দিয়েছে।
আজ সেই হাত আর তাকে ছুঁবে না।
বাড়ির উঠানে মানুষজন জড়ো হলো। আত্মীয়স্বজন এল। মিতু এল কাঁদতে কাঁদতে। সজীবও এল।
সবাই মায়ের জন্য কাঁদছিল।
রফিক কাঁদছিল না।
লোকজন তাকে বলছিল,
—শক্ত হও। তুমি বড় ছেলে।
কেউ বলছিল,
—তোমাকেই তো সব সামলাতে হবে।
রফিক সব শুনছিল।
তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা আজ হারিয়ে গেল।
যে মানুষটির কাছে সে কোনো হিসাব ছাড়াই ফিরে যেতে পারত, সেই মানুষটি আর নেই।
সেদিন রাতে বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেলে রফিক মায়ের ঘরে গেল।
মায়ের বিছানায় এখনো তাঁর পুরোনো চাদর পাতা। বালিশের পাশে চশমা। টেবিলে ওষুধের বাক্স।
রফিক চশমাটা হাতে নিল।
তারপর বিছানার পাশে বসে ফিসফিস করে বলল,
—মা, আজ আমি কার কাছে যাব?
কোনো উত্তর এল না।
১৮. সংসারের হিসাব
মা চলে যাওয়ার পর বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল।
আগে যে বাড়িতে রান্নাঘর থেকে মায়ের ডাক শোনা যেত, এখন সেখানে নীরবতা। সকালে কেউ আর জিজ্ঞেস করে না, রফিক খেয়েছে কি না। রাতে কেউ দরজার শব্দ শুনে বলে না,
—রফিক এসেছে?
বাড়ির অনেক কাজ এখন ফারজানাই সামলায়। কিন্তু রফিকের মনে হয়, বাড়িটা যেন আর আগের মতো বাড়ি নেই।
কিছুদিন পর সজীব বলল,
—ভাইয়া, গ্রামের বাড়িটা বিক্রি করে দিলে কেমন হয়? আমি ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট দিতে চাই।
রফিক অবাক হয়ে তাকাল।
—বাড়িটা বিক্রি করবি?
—হ্যাঁ। এখন তো মা-বাবা কেউ নেই। বাড়ি রেখে লাভ কী?
রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—এই বাড়িতে আমাদের বাবা-মা ছিলেন। আমাদের শৈশব কেটেছে। তুই এসব ভুলে গেলি?
সজীব বলল,
—স্মৃতি দিয়ে তো জীবন চলে না ভাইয়া।
রফিকের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে বলল,
—জীবন স্মৃতি দিয়ে চলে না, ঠিক। কিন্তু স্মৃতিরও তো একটা মূল্য আছে।
সজীব বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুমি সবকিছু আবেগ দিয়ে দেখো। বাস্তবতা বুঝতে হবে।
রফিক আর কিছু বলল না।
সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ বারান্দায় বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, যে বাড়ির জন্য সে বছরের পর বছর টাকা পাঠিয়েছে, মেরামত করেছে, বাবার চিকিৎসার সময় রাত কাটিয়েছে, সেই বাড়িটাও এখন তার কাছে শুধু একটি সম্পত্তি।
মানুষ বড় হয়ে যায়। তার সঙ্গে বদলে যায় সম্পর্কের সংজ্ঞা।
একসময় যে বাড়িতে সবাই একসঙ্গে খেত, সেখানে এখন জমির ভাগ নিয়ে আলোচনা হয়।
রফিক বুঝল, সংসারের হিসাব কখনো শেষ হয় না। শুধু মানুষ বদলে যায়।
১৯. আরিয়ানের প্রশ্ন
একদিন সন্ধ্যায় রফিক অফিস থেকে ফিরে দেখল, আরিয়ান পড়ার টেবিলে বসে আছে। স্কুলের খাতায় একটি রচনা লিখছে।
রচনার বিষয়—'আমার বাবা'।
রফিক কাছে গিয়ে বলল,
—কী লিখছিস?
আরিয়ান বলল,
—আমার বাবা খুব ভালো। বাবা অনেক কাজ করে। আমাকে ভালো স্কুলে পড়ায়। আমার জন্য খেলনা কিনে দেয়।
রফিক ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—আর কিছু লিখেছিস?
আরিয়ান একটু ভেবে বলল,
—লিখেছি, বাবা সব সময় ব্যস্ত থাকে। আমি বাবার সঙ্গে খেলতে চাই, কিন্তু বাবা সময় পায় না।
রফিকের হাত থেমে গেল।
সে ছেলের পাশে বসে পড়ল।
—তোর কি খুব খারাপ লাগে?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। আমার বন্ধুর বাবা ওকে স্কুল থেকে নিয়ে যায়। তুমি তো পারো না।
রফিকের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এল।
সে ছেলেকে কোলে টেনে নিল।
—আমি চেষ্টা করব বাবা। এবার থেকে সময় বের করব।
আরিয়ান বলল,
—তুমি কি দাদুর মতো অনেক কাজ করো?
রফিক অবাক হয়ে তাকাল।
—তুই দাদুর কথা জানিস?
—দাদি বলত, দাদু তোমাকে অনেক পড়াত। তুমি নাকি দাদুর স্বপ্ন ছিলে।
রফিক কিছু বলল না।
আরিয়ান আবার বলল,
—তুমি কি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছ?
প্রশ্নটা শুনে রফিকের চোখ ভিজে উঠল।
সে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—সব স্বপ্ন পূরণ হয় না বাবা।
আরিয়ান সরল গলায় বলল,
—তাহলে তুমি আমার স্বপ্ন পূরণ করে দিও।
রফিক হেসে বলল,
—তোর স্বপ্ন কী?
—আমি বড় হয়ে তোমার মতো হব।
রফিক এবার ছেলেকে একটু দূরে সরিয়ে তার চোখের দিকে তাকাল।
—না বাবা। আমার মতো হবি না। আমার চেয়ে ভালো মানুষ হবি। নিজের জীবনটাও সুন্দর করে গড়বি।
আরিয়ান কিছু বুঝল না। সে শুধু বাবার গলা জড়িয়ে ধরল।
সেদিন রাতে রফিক অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি।
সে বুঝতে পারল, বড় ছেলে হওয়ার যে দায়িত্ব সে সারাজীবন পালন করেছে, সেই দায়িত্বের ভার যেন তার ছেলের কাঁধে কোনোদিন না পড়ে।
২০. একটি পুরোনো খাতা
মা মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর পর গ্রামের বাড়ির পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে রফিক একটি খাতা পেল।
খাতাটি বাবার।
পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কালি ছড়িয়ে আছে। খাতার প্রথম কয়েক পাতায় সংসারের হিসাব লেখা।
চাল, ডাল, তেল, স্কুলের বেতন, ওষুধের খরচ।
একটি পাতায় লেখা ছিল—
'রফিকের কলেজে ভর্তি—৩৫০০ টাকা।'
আরেক পাতায়—
'সজীবের কোচিং—৪৫০০ টাকা।'
আরেকটি পাতায়—
'মিতুর বই—৮৫০ টাকা।'
রফিক পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
এক জায়গায় বাবার হাতের লেখা একটি ছোট্ট বাক্য চোখে পড়ল।
'বড় ছেলেটা অনেক কিছু বুঝে গেছে। ওর কাছে কখনো কিছু চাইতে হয় না।'
রফিকের হাত কেঁপে উঠল।
আরেকটু নিচে লেখা ছিল—
'আজ রফিকের জন্য একটা নতুন শার্ট কিনতে চেয়েছিলাম। কিনতে পারলাম না। ও নিজেই বলল, তার পুরোনো শার্ট আছে। ছেলেটা বোধহয় বড় হয়ে যাচ্ছে।'
রফিক খাতাটা বুকের কাছে টেনে নিল।
এতদিন সে ভেবেছে, শুধু সে-ই পরিবারের জন্য নিজের ইচ্ছেগুলো বিসর্জন দিয়েছে।
আজ বুঝল, তার বাবাও একসময় একইভাবে নিজের ইচ্ছেগুলোকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
বাবা হয়তো তাকে সব দিতে পারেননি। কিন্তু ছেলের জন্য তাঁরও অনেক অপূর্ণতা ছিল।
রফিকের চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল।
সে খাতার পাতায় হাত বুলিয়ে বলল,
—বাবা, তুমি আমাকে অনেক কিছু দিতে চেয়েছিলে। আমি বুঝতে পারিনি।
সেদিন সে প্রথমবার অনুভব করল, বড় ছেলে হওয়ার গল্প শুধু তার একার নয়। প্রতিটি প্রজন্মে কেউ না কেউ এই দায়িত্বের ভার কাঁধে তুলে নেয়।
কখনো বাবা, কখনো ছেলে।
আর এভাবেই একটি পরিবারের স্বপ্নগুলো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যায়।
২১. নিজের জন্য একটি সকাল
বয়স এখন চল্লিশের কাছাকাছি।
রফিক আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। অফিসে কাজ করে, বাড়ি ফিরে ছেলের পড়াশোনা দেখে, ফারজানার সঙ্গে সংসারের কথা বলে।
তবে সে কিছু পরিবর্তন এনেছে।
সজীবকে স্পষ্ট করে বলেছে, মায়ের চিকিৎসার মতো পরিবারের কিছু দায়িত্ব সবার ভাগ করে নিতে হবে। মিতুকেও বলেছে, প্রয়োজন হলে সে পাশে থাকবে, কিন্তু সবকিছু একা বহন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রথম দিকে অনেকে মন খারাপ করেছে। কেউ কেউ বলেছে, রফিক বদলে গেছে।
রফিক কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেনি।
সে শুধু বুঝেছে, ভালোবাসা মানে নিজের সবকিছু শেষ করে দেওয়া নয়। ভালোবাসা মানে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো।
এক শুক্রবার সকালে সে অনেক দিন পর একা হাঁটতে বের হলো।
শীতের সকাল। রাস্তার পাশে কুয়াশা। পুকুরের পানিতে সূর্যের আলো পড়েছে। দূরে কয়েকজন কৃষক মাঠে যাচ্ছে।
রফিক হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের পুরোনো স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াল।
এই স্কুলেই সে পড়েছিল। একসময় বনভোজনে যেতে না পারার কষ্ট নিয়ে যে ছেলেটি জানালার পাশে বসে ছিল, সেই ছেলেটি আজও কোথাও তার ভেতরে বেঁচে আছে।
স্কুলের মাঠে কয়েকটি শিশু খেলছিল।
তাদের একজনের হাতে ফুটবল। অন্যরা চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে।
রফিক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তাদের দেখল।
তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় সে-ও এমন খেলতে চেয়েছিল।
তারপর নিজের অজান্তেই হাসল।
হয়তো জীবনের কিছু আনন্দ ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু সেগুলোকে মনে রেখে পরের প্রজন্মকে আনন্দ দেওয়া যায়।
বাড়ি ফিরে সে আরিয়ানকে ডাকল।
—বাবা, আজ কোথাও ঘুরতে যাবি?
আরিয়ান দৌড়ে এসে বলল,
—সত্যি?
—হ্যাঁ। আজ শুধু আমরা ঘুরব। কোনো কাজ নেই।
ফারজানা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসল।
—তাহলে আমিও যাব।
রফিক বলল,
—তুমিও যাবে। অনেক দিন তো কোথাও যাওয়া হয়নি।
সেদিন তারা তিনজন শহরের একটি পার্কে গেল। আরিয়ান খেলল, ফারজানা বেঞ্চে বসে গল্প করল। রফিক দুজনের ছবি তুলল।
খুব বড় কোনো আনন্দ ছিল না সেখানে। দামি রেস্টুরেন্ট ছিল না, বিলাসবহুল ভ্রমণ ছিল না।
ছিল শুধু একসঙ্গে কাটানো কয়েকটি ঘণ্টা।
বাড়ি ফেরার সময় ফারজানা বলল,
—আজ তোমাকে অনেক দিন পর হাসতে দেখলাম।
রফিক বলল,
—হয়তো নিজের জন্য একটু সময় বের করা দরকার ছিল।
ফারজানা তার হাত ধরল।
—এখন থেকে বের করবে।
রফিক মাথা নাড়ল।
২২. বড় ছেলে আসলে কেমন মানুষ?
রাত হয়েছে।
আরিয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। ফারজানা ঘরের কাজ শেষ করে শুয়ে আছে।
রফিক বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
দূরে কোথাও একটি ট্রেনের শব্দ শোনা গেল।
তার মনে পড়ল বাবার কথা, মায়ের মুখ, নীলার সেই চিঠি, মিতুর বিয়ের দিন, সজীবের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার খবর।
কতগুলো বছর চলে গেছে।
একসময় তার মনে হতো, জীবন মানে শুধু দায়িত্ব পালন করা। সংসারের সবাইকে ভালো রাখা। নিজের ইচ্ছেগুলোকে ভুলে যাওয়া।
এখন সে বুঝতে পারে, দায়িত্বের কোনো শেষ নেই। আজ একজনের প্রয়োজন মিটবে, কাল আরেকজনের। আজ যে সমস্যার সমাধান হবে, কাল তার জায়গায় নতুন সমস্যা আসবে।
তাই নিজের জীবনকে পুরোপুরি স্থগিত রেখে অন্যদের জন্য বেঁচে থাকা হয়তো কোনো সমাধান নয়।
একজন বড় ছেলে তার পরিবারের জন্য অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু সে তো মানুষ। তারও ক্লান্তি আসে, তারও মন খারাপ হয়, তারও ভালোবাসার প্রয়োজন হয়।
তারও ইচ্ছে করে কেউ একদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করুক,
'ভাই, তুমি কেমন আছ?'
কেউ বলুক,
'তোমার কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে জানিয়ো।'
কেউ তার জন্মদিন মনে রাখুক।
কেউ তার পুরোনো শার্ট দেখে বলুক,
'এটা আর পরতে হবে না। তোমার জন্য একটা নতুন শার্ট কিনেছি।'
কেউ তার কষ্ট না বললেও বুঝে ফেলুক।
বড় ছেলে বলে কি তার কোনো অভিমান থাকতে নেই?
বড় ছেলে বলে কি তার চোখে পানি আসতে নেই?
বড় ছেলে বলে কি সে কখনো ভেঙে পড়তে পারে না?
মানুষ তাকে শক্ত ভাবে। কারণ সে সবার সামনে শক্ত থাকার অভিনয় করেছে। মানুষ তাকে নির্ভরযোগ্য ভাবে। কারণ সে কখনো কাউকে ফিরিয়ে দেয়নি।
কিন্তু এই শক্ত মানুষেরও একটা ভেতরের ঘর থাকে। সেই ঘরে জমে থাকে অনেক না-পাওয়া, অনেক পুরোনো স্মৃতি, অনেক অপূর্ণ ইচ্ছা।
কেউ সেই ঘরের দরজা খুলে দেখে না।
রফিক এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ঘরে ঢোকার আগে মায়ের পুরোনো ছবিটার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াল।
ছবিতে মা হাসছেন।
রফিক খুব আস্তে বলল,
—মা, আমি এখন নিজের জন্যও একটু বাঁচার চেষ্টা করছি।
তারপর বাতি নিভিয়ে ঘরে চলে গেল।
---
শেষ দৃশ্য: বড় ছেলের জন্য কেউ অপেক্ষা করে?
পরদিন সকাল।
রফিক ঘুম থেকে উঠে দেখল, ফারজানা চা বানিয়েছে। টেবিলে তার জন্য একটি কাপ রাখা।
আরিয়ান স্কুলের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে।
—বাবা, আজ তুমি আমাকে স্কুলে দিয়ে আসবে?
রফিক ঘড়ির দিকে তাকাল। অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাবে। তবু সে বলল,
—চল, আজ আমি দিয়ে আসব।
আরিয়ান আনন্দে বাবার হাত ধরল।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ফারজানা বলল,
—ফিরে আসার পথে নিজের জন্য একটা শার্ট কিনে এনো। তোমার পুরোনো শার্টগুলো আর পরার মতো নেই।
রফিক একটু অবাক হলো।
—আচ্ছা, আনব।
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ান বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, তুমি ছোটবেলায় কী হতে চাইতে?
রফিক একটু হেসে বলল,
—আমি অনেক কিছু হতে চেয়েছিলাম।
—কী কী?
—বড় হয়ে অনেক দূর পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। ভালো চাকরি করতে চেয়েছিলাম। একটা সুন্দর বাড়ি বানাতে চেয়েছিলাম।
—হয়েছ?
রফিক ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—সব হয়নি বাবা। কিছু হয়েছে, কিছু হয়নি।
আরিয়ান আবার জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে তুমি এখন কী হতে চাও?
রফিক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—আমি এখন এমন একজন মানুষ হতে চাই, যার কাছে তার পরিবারের মানুষগুলো নির্ভয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে। আর যে নিজের কথাও বলতে পারে।
আরিয়ান কথাটা বুঝল কি না জানা নেই। সে শুধু বাবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
স্কুলের সামনে পৌঁছে রফিক ছেলেকে নামিয়ে দিল।
আরিয়ান ভেতরে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল।
—বাবা, বিকেলে কিন্তু খেলবে!
রফিক হেসে বলল,
—অবশ্যই।
ছেলেটি দৌড়ে স্কুলের ভেতরে চলে গেল।
রফিক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে অফিসের পথে হাঁটতে শুরু করল।
আজ তার পকেটে একটি ছোট্ট কাগজ ছিল। সেখানে লেখা—
'এই মাসে নিজের জন্য একটি শার্ট, ফারজানার জন্য একটি শাড়ি, আর আরিয়ানের সঙ্গে একদিন ঘুরতে যাওয়া।'
অনেক বছর পর রফিক নিজের জন্য কিছু কেনার পরিকল্পনা করেছে।
এটা খুব বড় কোনো অর্জন নয়। পৃথিবীর কাছে এর কোনো মূল্যও নেই।
কিন্তু যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের ইচ্ছের পাশে নিজের ইচ্ছেগুলোকে চাপা দিয়ে রেখেছিল, তার কাছে এই ছোট্ট তালিকাটুকু অনেক বড়।
হয়তো বড় ছেলে হওয়ার অর্থ সবকিছু একা বহন করা নয়।
হয়তো বড় ছেলে হওয়ার অর্থ, নিজের মানুষগুলোর পাশে থাকা, আবার নিজের অস্তিত্বটাকেও বাঁচিয়ে রাখা।
তবু সমাজের অসংখ্য রফিকের জীবনে এই উপলব্ধি আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়।
কেউ বাবার চিকিৎসা করতে করতে নিজের যৌবন হারায়। কেউ ভাইবোনকে মানুষ করতে করতে নিজের সংসার গড়তে ভুলে যায়। কেউ মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের চোখের পানি লুকায়। কেউ ভালোবাসার মানুষটিকে হারায়, কেউ নিজের স্বপ্নটাকে কবর দেয়।
তারপর একদিন সবাই বলে,
'বড় ভাইটা সত্যিই অনেক ভালো মানুষ ছিল।'
কিন্তু সেই ভালো মানুষটির জীবনে কতগুলো রাত নির্ঘুম কেটেছে, কতগুলো ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গেছে, কতবার সে কাউকে কিছু না বলে কেঁদেছে—সেই হিসাব আর কেউ রাখে না।
বড় ছেলে মানেই সংসারের ভরসা।
কিন্তু ভরসারও তো কখনো ভরসা দরকার হয়।
কেউ কি কখনো বড় ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বলেছে,
'এবার একটু বিশ্রাম নাও। বাকিটা আমরা সামলে নেব।'
খুব কম পরিবারেই হয়তো এমন কথা শোনা যায়।
তাই আজও কোনো এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট্ট ঘরে, রাত গভীর হলে, একজন বড় ছেলে হিসাবের খাতা খুলে বসে আছে।
মাসের বেতন এসেছে। ওষুধের খরচ, বাড়িভাড়া, বাজার, ভাইয়ের প্রয়োজন, বোনের আবদার, সন্তানের স্কুলের বেতন—সবকিছু বাদ দিয়ে সে নিজের জন্য কিছু টাকা রাখতে চায়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিসাব মেলে না।
সে খাতাটা বন্ধ করে দেয়।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
হয়তো মনে মনে ভাবে, আগামী মাসে নিজের জন্য কিছু একটা কিনবে।
কিন্তু আগামী মাসেও নতুন কোনো প্রয়োজন এসে দাঁড়ায় দরজায়।
আর সেই মানুষটি আবার নিজের ইচ্ছেটাকে সরিয়ে রাখে।
কারণ সে পরিবারের বড় ছেলে।
forumbd24
যে মানুষটি সবার স্বপ্ন পূরণ করতে করতে নিজের স্বপ্নের কথা ভুলে যায়, তার গল্পটা কেউ লিখে রাখে না।
অথচ প্রতিটি পরিবারের বড় ছেলেটির জীবনেই এমন একটি গল্প লুকিয়ে থাকে, যা একবার মন দিয়ে পড়লে চোখের পানি আটকে রাখা কঠিন।