বসন্তের রঙ হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করছে হৃদয়ের ঋতুতরঙ্গে। বাতাসে কেমন এক আদিম চেনা সুর—যেন বহুদিনের পথচলায় হঠাৎ কারও নতুন পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে শহর। শৈত্য শেষে নিখুঁত এক নীরবতা বিরাজমান আমার মনের বিধ্বস্ত ফাল্গুনে। ফাল্গুনী মন বরণ করতে চায় মহিমান্বিত এক বসন্তের সন্ধিক্ষণ। কোথা থেকে ভেসে আসে কোকিলের স্নিগ্ধ নরম ডাক। বৃক্ষের নগরে মহা আমেজ, মহা জাগরণ, নতুনত্বের ধুম। শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ায় প্রস্তুতি—সুখমন বিলাসের ক্ষণ গোনে তারা। থেমে নেই প্রকৃতির আয়োজন।
তবু এই কোমল আবহাওয়ার স্পর্শে মনোদ্যান কোথায় যেন থমকে থাকে। অচেনা জীবনযাপনের এক চিরাচরিত যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে হঠাৎ তুমুল একাকিত্ব ঘিরে ধরে—বাহ্যিক কোলাহলে বিভোর ক্লান্ত দুপুরের ঝিমধরা মনে। হিম ও বসন্তের এই সন্ধিক্ষণে কালক্ষেপণ চললেও, অদ্ভুতভাবে কষ্ট দেয় বর্ষার স্মরণ। মন চায়—এই বুঝি তুমুল একচুরা বৃষ্টি নেমে আসবে, জলসিঞ্চন করে যাবে কতোকালের খরাজমা বদনে। কিন্তু না, বৃষ্টি আর আসে কই! ঋতুর অমোঘ রাজ্যে এখন বসন্তেরই প্রাধান্য।
একটা বসন্তময় রমাদান কেটে যায় আমার অযাচিত খেরোখাতার পাতা হয়ে। সাহরির পর নীরবতায় গলে যায় মধ্যদুপুর; চরম আলস্য, চরম উদাসীন অরাজকতা। স্বীয় প্রবৃত্তির বশে ভাগ্যকে অভ্যঞ্জন করি নতুন পত্র-উত্থানের এই বসন্তদিনে। নিশুতি রাতের কাব্যরথে যে অকিঞ্চিকর সুখ অঘোষিত নীরবতায় হৃদচত্বরে উন্মোচিত হয়,আমি তাকে স্থায়ীভাবে পরানবন্দি করতে পারি না।
গদ্য লিখি না কতদিন! আজকাল কাব্যরথেই পথচলা। ভাবলাম, মুক্তগদ্যের ছলে হলেও অস্বস্তির খানিক মুক্তি খুঁজি। কে জানে—হয়তো মিলেও যেতে পারে প্রশান্তির কোনো প্রসবণ।
স্মৃতির পুণ্যভূমি ঠনারপাড় আনোয়ারুল উলুম। কত বসন্তের প্রথম প্রহরে কদম রেখেছি সেখানকার ধূলোকায়। কত রঙিন ফাগুন গুজরান করেছি ঠনারপাড়ের ভাঙা রাস্তার মোড়ে কারও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। বহুদিন পর জীবনযাত্রায় খানিক বিরতি নিয়ে ডুবে ছিলাম সেই ধূসর স্মৃতি রোমন্থনে। অতঃপর আবার বিরতিহীনের পথে।
ঠনারপাড় ছেড়েছি আজ দুদিন হলো, তবু সহপাঠীদের সঙ্গহীনতা আমাকে বেচাইন করে তোলে। মহিমান্বিত সব চেনা মুখের ভৌগোলিক দূরত্ব মানসিক চাপে জর্জরিত করে।এইযে মুক্তগদ্যের নামে দুকলম তাদের স্মরণ—হাজার বচ্ছর পরের কোনো নিঃসঙ্গ সন্ধ্যারাতে স্মৃতিবিলাসের জন্য এ-ও বা কম কীসে!
মন ভীষণ মুখিয়ে আছে ফাল্গুনী বসন্তের মলাট উন্মোচনে। স্নিগ্ধ রমাদানের বুক চিরে যদি ভয়ংকর সুন্দর এক বসন্তের রঙে জীবনটা রঙিন প্রচ্ছদে প্রচ্ছাদিত হয়—তাতে ক্ষতি কী!
তবু শেষপর্যন্ত বুঝি—ঋতুরা কেবল বাহ্যিক নয়, অন্তরেও তাদের অবাধ যাতায়াত। বসন্ত আসে, বর্ষা স্মরণ করায়, শীত শূন্যতা শেখায়—সব মিলিয়েই জীবন তার পূর্ণ পরিক্রমা সম্পন্ন করে। হয়তো বৃষ্টি এখনই নামবে না, হয়তো একাকিত্বও একদিনে ঘুচবে না; তবু প্রতিটি ঋতুই কোনো না কোনো বীজ বপন করে যায় অন্তর্লোকে।
এই বসন্তও হয়তো নিঃশব্দে রোপণ করে দিচ্ছে নতুন সহিষ্ণুতা, নতুন প্রতীক্ষা, নতুন প্রার্থনা। রমাদানের সংযম, স্মৃতির অনুরণন আর বর্তমানের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক অন্যরকম স্থিতি।
সম্ভবত জীবন মানেই এই—অপূর্ণতার মাঝেও রঙ খোঁজা, অনুপস্থিতির ভেতরেও সঙ্গ অনুভব করা, আর ক্ষণিক সুখকে চিরস্থায়ী করতে না পারলেও তার স্বাদটুকু হৃদয়ে রেখে দেওয়া।
হয়তো আগামী কোনো প্রহরে, কোকিলের সুর আর নীরব সাহরির মধ্যবর্তী এক স্নিগ্ধ মুহূর্তে, আমি বুঝতে পারব—এই বসন্ত বৃথা যায়নি। আমার ভেতরেও কোথাও এক নবপত্র ইতোমধ্যে উন্মীলিত হয়েছে।
৪·৩·২৬ | বুধবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।