ঝর্ণার কোলাহলে হারানো নিশ্বাস
️—রফিক আতা—
খৈয়াছড়া:—
জলপ্রপাতের কলতান, পর্বতের
আল্পনা ও সবুজের মায়াবী আহ্বান,
আ্যডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চকর
এক অনবদ্য সফরনামা"
★★★
____________________১.
শৈশব বন্ধুদের অনেকেই গ্রামীন পথের ধুলোমাখা ভালোবাসা কে আচলে বেঁধে চাকরি ও জীবন গল্পের চিত্র আঁকতে রওয়ানা হয়েছে শহরের পথে। শূন্যতা ছড়িয়েছে মহল্লার পরতে পরতে।গ্রাম যেন সঙ্গী হারিয়ে বিলাপ করতে বসেছে। এদিকে আমাকে আচ্ছন্ন করতে শুরু করেছে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার চরম গ্লানি। ঘরে বসে ভোর হচ্ছিলাম। আর দুদিন পরেই মাদ্রাসা খোলা হবে। ভাবলাম—বাড়িতে একা একা ভালো লাগছেনা। আজকেই মাদ্রাসা র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই।
ঈদ আনন্দ অভাবনীয় উপভোগ হলেও হৃদয়ের গভীরে অনুভব করছিলাম চাপা কান্নার করুন প্রার্থনা। বারবার এবং বারবার মানস্পটে ভেসে উঠছিলো পুরোনো দিনের একটি স্মৃতি, একটি দৃশ্যপট, একটি ভালোলাগার মুহূর্ত। প্রায় এক বছর পূর্বে কোন এক বাদলা দিনে আশা জেগেছিল পাহাড়ি রাস্তায় উদাসী হয়ে হাটতে, হারিয়ে যেতে পাহাড়ি অরণ্যে, জলপ্রপাত ঝর্ণার শব্দমুখর স্পন্দনে নিজেকে ভেজাতে। সেই আশাকে নিরাশার স্রোতে না ভাসিয়ে ছুটেও গিয়েছিলাম পার্বত্য চট্টগ্রামে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নামক এক গাংচিল কেড়ে নিলো ভ্রমণের পুরো আনন্দ কে। যদিও বৃষ্টি বাদলের দিনে জলপ্রপাতের অদ্ভুত সৌন্দর্য উপভোগের মজাই আলাদা তবে সমস্যা হচ্ছে বৃষ্টির কারণে গন্তব্যে পৌছুতেই লেট...ফলে স্বপ্নটি কেমন যেন অপূর্ণই রয়ে গেলো।
আচ্ছা— তবে কি সেই পাহাড় ডিঙিয়ে বেড়ানোর স্বপ্নই আমাকে আলতো স্পর্শে মৃদু দোলা দিচ্ছে।তবে কি জলপ্রপাতে গা ভেজানোর পরশ মণ্ডপই আমাকে ডেকে যাচ্ছে বারংবার । অপূর্ণ স্বপ্নের পূরণ প্রত্যাশাই কি তাহলে আমায় হাতছানি দিচ্ছে।যদি আমার এক্সাইটেড ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু সেটিই হয়, যদি আমার স্বপ্ন ও হৃদয়োঠানের শূন্যতার স্থান সেটিই হয়, তবে তো বেরুতেই হয় সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে এবং বেরুতে হয় হৃদয়ের আকুতি ও —সিরূ ফিল আরদ— এর মেসদাক বনাতে।
★★★
___________________২
ভ্রমন হবে অথচ ভ্রমণ বন্ধু থাকবেনা এ কেমন কথা। বরং ভ্রমন ও সফর কে আরো আনন্দঘন চিত্তাকর্ষক করে তুলতে প্রয়োজন ভ্রমন বন্ধু বা সফর সঙ্গীর। মৌলভী বাজার থেকে রশীদিয়ার সিএনজি তে উঠতেই দেখা হয় ক্যাপ্টেন শাহেদ ভাইয়ের সাথে। শাহেদ ভাই গায়ে গতরে শ্যামবর্ণের হলেও বেশ ফানি ও ভ্রমণ বন্ধু হিসেবে বেশ উপযোগী। আমি তাকে প্ল্যাণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতেই তিনিও রাজি হয়ে যান।পরদিন ভোরে, খুব ভোরে, আলতো স্নিগ্ধতায় শীতল বাতাসে বেরিয়ে পড়লাম দুবন্ধু ভ্রমণের নেশায় ও অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের আশায়।
বাসের অপেক্ষায় দাড়িয়ে লালপোল, পোলের নাম লালপোল হলেও এখানে কিন্তু একদমই লালের দেখা নেই বরং এখানে পোলও ঢেকে আছে ধুলোর আঁধারিতে। দূর পাল্লার যাত্রীরা বাসের অপেক্ষায়। যাদের অধিকাংশ চাকুরীজিবি ও ব্যবসায়ী আর কিছু স্টুডেন্ট। সকলের মুখ জুড়ে একরাশ বিষন্নতার আবেশ।
স্বপ্ন যাবে বাড়ি—ঈদ কে সামনে রেখে স্বপ্ন গুলোকে বুকে বেঁধে সবাই ছুটে গিয়েছিল বাড়ির পানে। ঈদ তো শেষ। কিন্তু স্বপ্নেরা যেন পিছু ছাড়ছেনা। হায়! আজ তাদের করার নেই কিছুই। জীবিকার তাগিদে কিংবা জীবনের ভেলা ভাসাতে আজ তাদের ছুটতেই হবে। তাইতো নিখুঁত সে স্বপ্ন গুলোকে দূরে ঠেলে,ছোট ছোট আনন্দ গুলোকে মাটি চাপা দিয়ে দু ফোটা অশ্রু নীরবে বিসর্জন দিয়ে সবাই আজ গন্তব্য পানে।
ব্যস্ত রাস্তাঘাট ফের ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। পথচারি পথিক রাস্তা পার হচ্ছে। মালবাহী ট্রাকগুলো হুইসেল বাজিয়ে চলছে মুখ্য উদ্দেশ্যেের স্রোতে।একটি বাস এলেই নির্দিষ্ট যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে উঠার জন্য। এরই মধ্যে আমাদের বাসও স্টেশনে এসে হাঁক ছাড়লো।আর আমরাও ব্যস্ত হয়ে পড়ি সামনের সিট দখলে।
★★★
______________________৩
আমাদের ভ্রমণ গন্তব্য খৈয়াছড়া ঝর্ণা। যা খুব একটা দূরে নয়। বিদ্ধৎ চট্টলার প্রায় শুরুর অংশেই।গন্তব্যে পৌছুতে একটি সাধারণ মিনি বাসই যথেষ্ট। বাসের জার্নি হবে বারইয়ার হাট পর্যন্ত, এরপর সুজুকি বা ইমা গাড়িতে করে ঝর্ণার শব্দে. গানে, ছন্দে। আমরা বসেছি ডান পাশে। প্রকৃতির সহানুভুতি অনুভব করার জন্য। শাহেদ ভাই জানালার পাশে। তার পাশে আমি।বাস ছেড়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম বারইয়ার হাটের উদ্দেশ্যে।
ফেনী থেকে চট্টগ্রামের রাস্তাটা বেশ উপভোগ্য, বৈচিত্র্যময় ও সমাদৃত।এর কারণ সেই একটাই, প্রভুর নিখুঁত কারুকার্য, দু রাস্তার মাঝে লাগানো জারুল, উইপিন, পাতা বাহারি, ও কৃষ্ণচূড়ার লাল।ভীষণ অদ্ভুত রকমের সৌন্দর্যের প্রতীক যেন এই পথ।
কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া যেসব যাত্রী বিষাদে বিভোর ছিলো, মন খারাপের নিদারুণ এই মুহূর্তে সুখকর এ পরিবেশটা এতক্ষণে হয়তো তাদেরও হৃদয়ে তরঙ্গদোলা সৃষ্টি করেছে। মুখিয়ে তুলেছে এমন হাজারে মাইল পথ জার্নির প্রতি।খোলা বাতায়ন হয়ে ভেসে আসা ভোরের অদৃশ্য হিমেল বাতাস আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলো অচিন কোন এক স্বপ্নের রাজ্যে। মন চাইছিলো ভেসে বেড়াই স্বপ্নের ভেলায় আরো ঈষৎ সময়। কিন্তু বাস্তবতার রাজ্যেই জড়িয়ে আছে এতোটা অনুভূতি-সুন্দর প্রকৃতি! আবার স্বপ্ন!..
★★★
____________________৪
রাস্তার দুধারে বাতাসে নাচতে থাকা শত সহস্র বৃক্ষের ছায়া পিছনে রেখে বাস ছুটে চলেছে তার গন্তব্য অভিমুখে। বৃক্ষের ফাঁকে ফাঁকে পূর্ব দিগন্ত থেকে সদ্য ফোঁটা সূর্য ফুলের রৌশনি এসে সানাই বাজাচ্ছিলো আমার মনের দেওয়ালে।বেশ ভালোই লাগছিলো।
লোকাল বাস। যাত্রী উঠানামার জন্য মাঝে মধ্যে থামতে হচ্ছে। একটি বাজার সামনে। বাস থামলো একটি বটবৃক্ষের পাশ ঘেষে। কতোগুিলো শিকড় উপর পর্যন্ত ঝুলে আছে। একটি বিষয় এখনো বুঝে আসেনা। বটবৃক্ষের শিকড় কেন তার গলাতেও ঝুলে!!
—ও শাহেদ ভাই!
—বল
—একটা শিকড় ছিড়ে দাওনা!
—কেন?
—আরে তুমি দাও ভাই!
আরে ! এতক্ষণ যে শিকড় গুলোকে বড় শুকনো, বিশীর্ণ, জরাজীর্ণ মনে হচ্ছিল। ছিড়তে গিয়ে বুঝা গেল আসলে ততোটা শুকনো বিশীর্ণ নয়। অনেক শক্ত আর মজবুত। তবুও একটি শিকড় মুচড়ে ছিড়ে আমার হাতে দিলো শাহেদ ভাই।
অনেকটা দার্শনিক দৃষ্টি ভঙ্গিতে শিকড়টি নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। বড় অবাক করা ব্যাপার। আসলেই! শিকড়টি দেখতে যতোটা জরাজীর্ণ মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম না একদমই। প্রকোট শক্ত আর তাজা এখনো কেমন কষ বের হচ্ছে! এখান থেকে কোন একটা শিক্ষনীয় চিন্তা-জাগানিয়া কোন বিষয় খুজে বের করার চেষ্টায় সচেষ্ট থাকলাম। এক সময় লক্ষ্য করলাম, আমার ভাবনার করিডোরে একটি অসামান্য শিক্ষার আলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে—
★গাজার মুজাহিদীন ও ইসরায়েলি হায়েনাদের মাঝে যুদ্ধ যখন প্রকট আকার ধারণ করেছিলো, তখনকার এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য—যা ইতিহাসে বন্দি হয়ে গেছে এক ফটোগ্রাফে। থমথমে চারপাশ, নিস্তব্ধতা যেন গা ছমছম করে। একটি সুনসান পথ, যে পথ ধরে ধাতব দানবের মতো ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক এগিয়ে আসছে।
গাজার একটি শিশু—যেন সদ্য ফুটে ওঠা পুষ্প, অথচ ধুলো-মলিন, ক্লান্ত চেহারা। চোখেমুখে ক্ষুধার ছাপ, কিন্তু সেই সঙ্গে হিমালয়সম সাহসের দুর্লভ দীপ্তি। হয়তো ওর বাবা-মা কেউই আর এই মাটিতে নেই; বহু আগে শহীদ হয়েছেন।
শিশুটি হঠাৎ ছুটে গিয়ে দাঁড়াল সেই হায়েনাদের ট্যাঙ্কের সামনে। যুদ্ধযন্ত্রের গর্জন থামিয়ে, অত্যাচারী সেনাদের চক্ষু বিস্ফারিত করে, ও অবিরাম পাথর ছুঁড়তে লাগল—ঠিক যেন ২০০০ সালের সেই কিংবদন্তি ছবি, যেখানে ১৪ বছরের 'ফারিস ওদেহ' ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের দিকে একাই দাঁড়িয়ে ছিলো, হাতে ক্ষুদ্র একটি পাথর। ফটোগ্রাফার তখন ধরেছিলেন দুনিয়ার কাছে এক অমর দৃশ্য—দুর্বল অথচ অদম্য। ফারিসও সেই ঘটনার কিছুদিন পর শহীদ হন।
আমার হাতে থাকা এই শিকড়টির মতোই—দেখতে দুর্বল, জরাজীর্ণ, বিষণ্ন—কিন্তু এর ভেতরে আছে এমন এক অদেখা শক্তি, যা ধ্বংসের মুখেও দাঁড়িয়ে থাকে অটল হয়ে। কি সেই শক্তি? ঈমান। ঈমান, ঈমান, ঈমান—যা ক্ষুধার চেয়েও প্রবল, যা ভয়কে গলিয়ে দেয়, যা একজন শিশুকে সাম্রাজ্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় অবিচল সাহসে।
#চলবে..#
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।