ঝর্ণার কোলাহলে হারানো নিশ্বাস
️—রফিক আতা—
খৈয়াছড়া:—
জলপ্রপাতের কলতান, পর্বতের
আল্পনা ও সবুজের মায়াবী আহ্বান,
আ্যডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চকর
এক অনবদ্য সফরনামা।
★★★
____________________৯
ঝর্ণার এই স্তরে এসে দ্বিতীয়বারের মতো থমকে দাঁড়াই।
কপালে ভাঁজ ফেলে দেওয়া এক নিদারুণ দৃশ্য—
একদল যুবক, স্মার্টফোনে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে,
অজানা এক আনন্দের দূষিত প্রলেপে
ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে অবগাহনে নিমগ্ন।
চারপাশে প্রকৃতির নিসর্গ,
পাহাড়ের কোল বেয়ে ঝরে পড়া কল্লোলধ্বনি,
তবু হৃদয়গুলো যেন বধির—
যার কুদরতের নিদর্শন এই পাহাড়-ঝর্ণা,
তার নাম উচ্চারণের প্রয়োজনও বোধ করছে না তারা।
ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হলো—
ঝর্ণার কলকল শব্দের ভেতর দিয়ে
এক আয়াত যেন ধীরে ধীরে ভেসে এলো আমার অন্তরে—
لَوْ أَنْزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ۚ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
"যদি আমি এই কোরআনকে কোনো পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম,
তবে তুমি অবশ্যই দেখতে পেতে যে তা আল্লাহর ভয়ে বিনীত হয়ে নত হয়ে গেছে
এবং বিদীর্ণ হয়ে পড়ছে।
আমি এ ধরনের দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য তুলে ধরি,
যাতে তারা চিন্তা করে।" — সুরা হাশর, আয়াত ২১
আহ! এরা তো সেই পর্বতপৃষ্ঠে এসে দাঁড়িয়েছে—
যার প্রতিটি শিলাখণ্ড আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন,
যার অন্তর ভরে আছে অদৃশ্য এক ভয়ের স্পন্দনে।
কিন্তু এই যুবকদল সেই রবের স্মরণ থেকে বিমুখ,
নিমগ্ন لهو الحديث-এর কোলাহলে।
আফসোস!
এই একটি আয়াতই কি যথেষ্ট ছিল না
তাদের হৃদয়ের তালা খুলে দেওয়ার জন্য?
যাতে তারা এমন নাফরমানির পথ ছেড়ে
প্রভুর দরজায় ফিরে আসে—
তার দান করা জলপ্রপাত ও পাহাড়ের সৌন্দর্যের মাঝে
তাঁকেই খুঁজে পায়,
তাঁর ভয়ে চোখ ভিজে যায়,
আর জীবনের প্রতিটি স্রোতধারায়
আল্লাহর নামের কল্লোল ধ্বনি বয়ে যায়।
অথচ...
★★★
___________________১০
তৃতীয় প্রসবণ—ঝর্ণার তৃতীয় স্তর—
সেখান থেকে অনুতপ্ত, ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা।
পাহাড়ের বুক চিরে গড়িয়ে পড়া স্রোত যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে—
“এসো, আমার অন্তরের গভীরে লুকানো রহস্য খুঁজে নাও।”
ও হ্যা! একটা কথা এখনো বলা হয়নি—
আজ আমরা এসেছি হৃদ-মাজারে, গোপনে বয়ে আনা এক নান্দনিক অভিপ্রায় নিয়ে।
আমাদের লক্ষ্য—এই শব্দমুখর প্রসবণের উৎসে পৌঁছানো,
যে উৎসের ছোঁয়ায় জন্ম নেয় কল্লোলিনী ধারা,
যে স্রোতধারা দূর কোথাও গিয়ে হারিয়ে যায় অজানা মিলনমেলায়।
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ,
চড়াই-উতরাই, উত্থান-পতনের দীর্ঘ পরিক্রমা—
প্রায় দশ-বারোটি ছোট-বড় ঝর্ণার স্তর পেরিয়ে
আমরা এসে দাঁড়ালাম খৈয়াছড়ার শেষ প্রান্তে।
এখান থেকে আর কোনো ঝর্ণা আছে কি না—
তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়—
“এখানেই শেষ, এরপর কেবল নির্জনতা।”
এখানে নেই মানুষের ভিড়, নেই পায়ের ধ্বনি।
শুধু ঝর্ণার নিরন্তর গীত,
প্রকৃতির নিঃশ্বাস,
আর আকাশজোড়া শূন্যতার আলিঙ্গন।
এতখানি উঁচুতে উঠতে সাহস সবার থাকে না—
আমরা পেরেছি কেবল তারুণ্যের উদ্দাম স্পন্দন,
প্রত্যয় আর জোশে ভর করে,
সবচেয়ে বড় কথা—আল্লাহর রহমতে।
হৃদয়ের সপ্তম আকাশ ভেদ করে
আমার ঠোঁট থেকে নিঃশব্দে ঝরে পড়ল একটি বাক্য—
সুবহানাল্লাহ!
কি অপরূপ তাঁর সৃষ্টি!
কি মোহন নৈসর্গিকতা এই নির্জন পর্বতে!
প্রসবণধারা যেন রূপসী কুমারী—
গায়ে জলের নূপুর, কণ্ঠে সুরের মালা,
কোথাও কোমল, কোথাও অমায়িক,
তবু চিরশাশ্বত এক ধ্বনি হয়ে বয়ে চলেছে।
পথে প্রান্তরে, স্রোতের মুখে,
শাশ্বত শব্দের মায়াজালে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পাথর—
ছোট, বড়, মাঝারি।
তাদের কোনোটি গাঢ় সবুজ শ্যাওলায় মোড়া,
কোনোটি রোদে পাথুরে দীপ্তি ছড়ায়।
মনে হলো—প্রকৃতির শিল্পীর হাতে গড়া নিখুঁত ভাস্কর্য।
হায়াতের প্রতিটি মুহূর্ত যে আত্মা ডুবে ছিল পাপের দরিয়ায়,
জীবনের মূল্যবান সময়গুলো যে পথিক
নষ্ট করেছে মরিচিকার পেছনে ছুটে—
সে যদি একবার থেমে
এই নিথর শ্যাওলা-জমা পাথরগুলোর দিকে তাকায়!
কত শত পাথর!
কোনোটির সঙ্গে কারো আকারে মিল নেই,
তবু সবাই মিলে সাজিয়েছে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য।
পাহাড়ের বুকে এত শক্ত এই পাথর কে সৃষ্টি করেছে?
কি তার পরিচয়?
হয়তো একদিন সেই পথিক খুঁজে পাবে
দুর্গম জীবনের পথ পাড়ি দেওয়ার সহায়ক কোনো ইশারা,
হয়তো খুঁজে পাবে জীবন-ফেরির সোপান।
কিন্তু হায়—
সবাই কি সেই ভাবনায় থামে?..
★★★
___________________১১
আমরা ঝর্ণার পাড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছিলাম। চারপাশে শুধু পাথরের রাজ্য—আমি একদৃষ্টে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি, এমন সময় সাহেদ ভাই হঠাৎ বললেন—
—“শোন, পাথরও কিন্তু আল্লাহর এক মহা নিদর্শন।”
আমি অবাক হয়ে তাকাতেই তিনি ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এক চুমুক খেলেন, তারপর শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন—
—“কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ
অর্থাৎ, ‘আর কিছু পাথর আছে, যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে।’ (সূরা বাকারা: ৭৪)
ভাবো তো, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি যেখানে হোঁচট খায়, সেখানে কোরআন কত গভীর সমাধান দিয়ে দিয়েছে! আগে অনেকে বুঝতে পারত না—পাথরের মতো নিষ্প্রাণ জিনিস কীভাবে ভয় পেতে পারে বা ধ্বসে পড়তে পারে। কিন্তু আল্লাহর বাণী সত্য—আমরা যাদের নিঃপ্রাণ মনে করি, তাদের ভেতরও কোনো না কোনো অনুভূতি আছে।”
তিনি একটু থামলেন, যেন স্মৃতি থেকে কিছু টেনে আনছেন।
—“আল্লামা ত্বাকি উসমানী দা.বা. তাঁর তাফসিরে লিখেছেন—বর্তমান বিজ্ঞানও বলছে, জড় পদার্থের মধ্যেও কোনো না কোনো বর্ধন আর অনুভূতির ক্ষমতা আছে। এই জন্যই পাথর আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠতে পারে।
মুফতি শফি রহ. তো ‘মা’আরেফুল কোরআন’-এ একটা হাদিস এনেছেন—একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্য নতুন মিম্বার তৈরি হলো। কিন্তু যখন তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে শুরু করলেন, তখন আগের যে খেজুর গাছের সাথে ঠেস দিয়ে খুতবা দিতেন, সেই গাছ হঠাৎ শিশুর মতো কান্না শুরু করল!
সাহাবিরা শুনতে পাচ্ছিলেন—বুকফাটা হাহাকার। তখন নবীজি ﷺ নিজে গিয়ে সেই গাছকে জড়িয়ে ধরলেন, শান্তনা দিলেন, আর মুহূর্তেই কান্না থেমে গেল। ভাবো, গাছও প্রভুর প্রিয় বান্দার বিচ্ছেদে কাঁদতে পারে!”
আমি নীরবে শুনছিলাম। সাহেদ ভাই আঙুল দিয়ে সামনে থাকা এক সবুজ শ্যাওলাযুক্ত পাথরের দিকে ইশারা করলেন—
—“তুমি এই পাথরগুলোকে শুধু কঠিন আর নীরব ভেবো না। ওরা আল্লাহর কুদরতের জীবন্ত নিদর্শন—آية من آيات الله। যদি মন খুলে তাকাও, হয়তো তোমাকেও জীবনযাত্রার পথ দেখিয়ে দেবে। যেমন কিছু পাথর পথ রুখে দেয়, আবার কিছু পাথর সেতুর মতো পথ তৈরি করে দেয়।”
তার কথা শুনে আমার মনে হলো—আমরা যেন এই পাহাড়ি পথে নয়, জীবনেরই কোনো গভীর তাফসির পড়ে চলেছি।
★★★
___________________১২
আজকের ভ্রমণের বিশেষ ও নান্দনিক যে অভিপ্রায়! আমরা তার খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি। এই তো—দৃষ্টির সীমানায় ভেসে উঠছে এক সরু পথ। পথটির প্রস্তর ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে নিরলস প্রস্রবণের ধারা। কিন্তু সামনে কদম ফেলার মতো যুৎসই কোনো রাস্তা চোখে পড়ছে না। এদিকে ঝর্ণার বিশালতা ও উচ্চতার দিকে তাকালে ভেতরটা আঁতকে ওঠে অজানা এক আশঙ্কায়, যেন দুর্গম এই দেওয়াল আকাশ ছুতে চায়।মনে প্রশ্ন জাগে—এমন দুর্গম পথে পা বাড়িয়ে কেমন করে পর্বতশৃঙ্গে ওঠা যায়?
আমাদের হিম্মত ছিল দৃঢ়তায় ভরপুর, আর উচ্ছ্বাস ছিল উপচে পড়া। তাই আল্লাহর রহমতে খুব সহজেই বিকল্প একটি পথ খুঁজে পেলাম। তবে পথটি ছিল যথেষ্ট সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া এতটা পথ মাড়িয়ে এসে তখন পেট প্রায় শূন্য—ক্ষুধার যন্ত্রণা ক্রমশ বাড়ছিল। তবুও অজানা পথে এগুতে থাকি এক পা দু পা করে।
অবচেতন মনে, ক্লান্তির আবরণ সরিয়ে সরিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি গন্তব্যের দিকে। পথে পরিচিত হচ্ছি নাম না-জানা অসংখ্য বৃক্ষের সঙ্গে। একটি বৃক্ষের গঠন দেখে অবাক হলাম—বহু প্যাঁচানো শাখা-প্রশাখা যেন কোনো প্রাগৈতিহাসিক সর্প শত শত বছর ধরে এখানে দাঁড়িয়ে তপস্যায় লিপ্ত।
আমি সাহেদ ভাইকে বললাম—
—ভাই! এই বৃক্ষটা বোধহয় কোনো এক জন্মে সাপ ছিল। মানুষের হাত থেকে বাঁচতেই রূপ বদলে গাছ হয়ে গেছে।
আমার কথা শুনে সাহেদ ভাই এমন এক রিয়্যাকশন দিলেন যে মুহূর্তেই একটু ভয়ের স্রোত বইয়ে গেল মনে। তিনি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন—
—পেটে ক্ষুধা, পথে কাঁটা—আর আপনি আছেন আজাইরা প্যাঁচালে!
আমি হেসে উত্তর দিলাম—
—আরে ভাই! ক্ষুধা আর পথের কষ্ট ভুলিয়েই তো এই গল্প...
প্রায় আধঘণ্টার মতো এই দুরন্ত পথ আর দুর্গম গিরি পেরিয়ে অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায়। মুহূর্তের জন্য মনে হলো—আমরা যেন স্বপ্নের কিনারায় হাত রেখেছি, বা কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে ঢুকে পড়েছি এক ভার্চুয়াল জগতে। ঠোঁট থেকে অনায়াসে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস—যা মিলেমিশে গেল মুক্ত বাতাসে, গলে গেল ঝর্ণার নিরন্তর শব্দপ্রবাহে।
কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। চারদিকে দৃষ্টির তীর ছুঁড়ে আমরা যেন স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিস্ময়ের পর্দা চোখে নেমে এলো—যতদূর দৃষ্টি যায়, দিগন্তের সীমানা পর্যন্ত শুধু সবুজের অন্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা শতাব্দীপ্রাচীন পর্বতশ্রেণি। শেষ ঝর্ণা পেরিয়ে চূড়ায় এসে আমরা যে প্রস্রবণ দেখেছিলাম, তার কোনো চিহ্নমাত্র এখানে নেই! শুধু অজানা দিক থেকে বাতাসের তরঙ্গে ভেসে আসছে কলকল শব্দ—কিন্তু ঝর্ণার জলরেখা, এমনকি তার ক্ষীণ ছায়াও চোখে পড়ে না। মনে হতে লাগল, কিছুক্ষণ আগে যা দেখেছিলাম, তা যেন কেবলই মরীচিকা।
হায়! নিচে দাঁড়িয়ে ভেবেছিলাম—চূড়ায় উঠে হয়তো খুঁজে পাবো সেই অদৃশ্য সূত্র, যেখান থেকে ঝর্ণার জন্ম। কিন্তু এখানে এসে মনে হলো, উৎসমুখ যেন লুকিয়ে আছে অপরিচিত আরেক পথে! ক্লান্তি ও ক্ষুধার অভিশপ্ত তাড়নায় শরীর যেন ভেতর থেকে নিস্তব্ধ হয়ে এলো। মনে হচ্ছিল—এই বুঝি স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এবং সত্যিই তাই হলো—বাস্তবতার কঠিন আঘাতে ভেঙে গেল আমাদের স্বপ্নের আবরণ। ঝর্ণার উৎসমুখের অনুপস্থিতি মনকে বিষণ্নতার ধূসর চাদরে ঢেকে দিল।
#চলবে..#
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।