গল্পের নাম: শোনো অবেলার পথিক
কলমে: হিমানী হিমাদ্রি
(তৃতীয় পর্ব)
মহিমবাবুর হাতের লাঠিটা রাগে থরথর করে কাঁপছে। পেছনের লোকগুলোর ফিসফাস যেন বিষের মতো ছড়াচ্ছে। কাল সকাল হলেই সারা গ্রামে দাবানলের মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়বে— 'চক্রবর্তী বাড়ির মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে ওই বাগালটা!'
অহিদত্তের মস্তিষ্কে তখন এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে জানে, এই মুহূর্তে ধরা দিলে বা পালিয়ে গেলে ইরার সম্মান ধুলোয় মিশবে। তার চেয়েও বড় কথা, গ্রামের এই উগ্র সমাজ তাদের বাঁচতে দেবে না। অহিদত্ত হঠাতই ইরার হাতটা ছেড়ে দিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। তার মুখে এক অদ্ভুত, কুটিল হাসি ফুটে উঠল— যা দেখে মহিমবাবুও থমকে গেলেন।
অহিদত্ত তাচ্ছিল্যের সুরে অট্টহাসি হেসে উঠল। — "আরে মেজকর্তা! আপনারা কি ভেবেছেন আপনাদের বাড়ির মেয়ের সাথে আমি প্রেম করতে এসেছি? এই নিচুজাতের অহিদত্তের কি অতই দায় পড়েছে যে রাজকন্যের ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে এই মাঝরাতে ঘাটে আসবে?"
ইরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। অহিদত্তের এই ভোলবদল সে কল্পনাও করতে পারেনি। মহিমবাবু চিৎকার করে উঠলেন, "তবে এখানে কী করছিস?"
অহিদত্ত কোমরে হাত দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, "পাওনা গণ্ডা মেটাতে এসেছি মেজকর্তা। আপনার ভাইঝি শহর থেকে ফেরার সময় আমার ছোট ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা ধার নেওয়ার কথা দিয়েছিলেন। সেই টাকাটা নিতেই ডাকলাম। তা টাকা তো দিলেনই না, উল্টে এখন পৈতেধারী লোক নিয়ে বিচার করতে এসেছেন?"
সে ইরার দিকে তাকিয়ে চোখে এক পলক ইশারা করল। ইরা মুহূর্তের মধ্যে বুঝে গেল অহিদত্ত নিজেকে ছোট করে তাকে বাঁচাতে চাইছে। সে চট করে চোখের জল মুছে নিয়ে নিজের গলার সোনার চেইনটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর সেটা অহিদত্তের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিয়ে কাঁপা গলায় বলল— — "টাকা নেই আমার কাছে। এই নাও তোমার পাওনা। আর কোনোদিন আমার সামনে আসার সাহস কোরো না অচ্ছুৎ ছেলে!"
মহিমবাবু বিভ্রান্ত হয়ে ভাবলেন, সত্যিই হয়তো টাকা-পয়সার কোনো লেনদেন ছিল। অহিদত্ত হারটা মাটি থেকে দ্রুত তুলে নিয়ে দাঁত বের করে হাসল। — "গয়না দিয়েই যখন মুখ বন্ধ করলেন, তবে তাই সই। মনে রাখবেন মেজকর্তা, আপনার বাড়ির মান বাঁচাল কিন্তু এই অচ্ছুৎ ছেলেই।"
অহিদত্ত আর দাঁড়াল না। সে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। আড়াল হওয়ার ঠিক আগে সে একবার পেছন ফিরে তাকাল। দেখল ইরা অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইরার সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা ছিল না, ছিল এক আকাশ কৃতজ্ঞতা আর গভীর ভালোবাসা।
সে রাতে সবাই ভাবল একটা চুরির ঘটনা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি। কিন্তু শুধু দুজন মানুষ জানত, গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে আজ এক রক্তক্ষরণকারী ত্যাগের বিনিময়ে একটা অসমাপ্ত রূপকথা লেখা হয়ে গেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।