নেক আমলের ওসিলাহ
-আ.ক.ম. আঃ রহিম
বনি ইসরাইলের তিনজন লোক একবার সফরে বর হলো। চলতে চলতেই রাত হয়ে গেল। তারা তিনজনই পরিকল্পনা করলো,যে আজ আর হাটবে না। তাই তারা একটা গুহার মধ্যে রাতটা কাটানোর পরিকল্পনা করলো।
তারা কিছুদূর গিয়ে একটা পাহাড় দেখলো। পাহাড়ের গুহায় তারা আশ্রয় নিল। কিছুক্ষণ পর হটাৎ বাহিরে ঝড় শুরু হয়। ঝড়ো হাওয়ায় উপর থেকে এনেক বড় একটা পাথর গড়িয়ে গুহার মুখে আটকে যায়, ফলে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তারা অনেক চেষ্টা করেও পাথরটি সরাতে সক্ষম হলো না। এই ভয়াবহ অবস্থায় তাদের একজন বলল, 'এই কঠিন বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে, আমরা আমাদের নেক-আমলসমূহকে উসিলা বানিয়ে আল্লাহ তায়ালার দুয়া করা।' সুতরাং তারা সবাই তাদের নেক আমলগুলোকে আল্লাহ তাআলার দরবারে উসিলা হিসেবে পেশ করে দোয়া করলেন।
তাদের মধ্যে একজন বলল, হে আল্লাহ, তুমি জানো, আমার অত্যন্ত বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিল এবং এও জানো, আমি সন্ধ্যা বেলায় সবার আগে তাদেরকে দুধ পান করাতাম। তাদের পূর্বে কখনো স্ত্রী, ছেলে মেয়ে ও ক্রীতদাস-দাসী কাউকে দুধ পান করাতাম না। একদিন আমি গাছের খোঁজে দূরে চলে গেলাম। আমার আসতে একটু দেরি হলো। আমি রাতে বাড়ি ফিরে দুধ দোহন করে আমার পিতা মাতার কাছে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, তারা ঘুমিয়ে আছে। আমি তাদেরকে জাগানো পছন্দ করলাম না এবং এও পছন্দ করলাম না, তাদের পূর্বে সন্তান-সন্ততি এবং ক্রীতদাস দাসীকে দুধ পান করাই। তাই আমি দুধের বাটি নিয়ে তাদের ঘুম থেকে জায়গার অপেক্ষায় তাদের শিওরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অথচ শিশুরা ক্ষুধার তাড়নায় আমার পায়ের কাছে চেঁচামেচি করছিল। এভাবে ফজরের ওয়াক্ত হয় তখন আমার পিতা-মাতা জাগ্রত হয়। তারপর তারা দুধ পান করল।অতঃপর আমার সন্তান-সন্ততিকে দুধ পান করালাম।
হে আল্লাহ আমি যদি এ কাজ একমাত্র আপনার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য করে থাকি তাহলে পাথরের কারণে আমরা যে গুহায় বন্দী হয়ে আছি এ থেকে তুমি আমাদেরকে উদ্ধার কর। ' এই দুয়ার ফলস্বরূপ গুহার মুখ থেকে পাথর একটু সরে গেল। কিন্তু তাতে তারা বের হতে সক্ষম ছিল না।
তারপর দ্বিতীয় জন দোয়া করতে লাগলো, 'হে আল্লাহ আমার একটি চাচাতো বোন ছিল। সে আমার নিকট সকল মানুষের চেয়ে তোমার ছিল। ( অন্য বর্ণনা অনুযায়ী) আমি তাকে এত বেশি ভালবাসতাম, যত বেশি ভালোবাসা পুরুষরা নারীদেরকে বাসতে পারে। একবার আমি তার সঙ্গে যৌন মিলনের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু সে অস্বীকার করল। এবং শর্ত দিল যদি আমি তাকে একশত স্বর্ণমুদ্রা এনে দিতে পারি তাহলে সে রাজি হবে। অতঃপর আমি দেখবে দিকে খুঁজতে খুঁজতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে এক সপ্ত স্বর্ণ মুদ্রা জোগাড় করে তার কাছে নিয়ে আসি এবং তার হাতে দিয়ে আমার সেই আশা পূর্ণ করার জন্য বলি। তারপর আমি যখন তাকে স্পর্শ করতে যাব। সে বলল, হে ভাই! আল্লাহকে ভয় করো! আল্লাহকে ভয় করো!। তারপর তার কথা শুনে আমার মনে আল্লাহর ভয় কাজ করলো আমি সেই কাজ না করেই ফিরে আসলাম।
হে আল্লাহ, এই কাজ যদি আমি একমাত্র তোমার ভয়ে, তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি তাহলে তুমি আমাদেরকে এ কঠিন মুসিবত থেকে হেফাজত কর। ' তার এই দুয়ার পাথর গুহার মুখ থেকে আরেকটু পরিমান সরে গেল কিন্তু তারা তাতেও বের হতে সক্ষম ছিল না। তাই তাদের তৃতীয়জন দোয়া করতে লাগলো।
তৃতীয় জন বলল, ' হে আল্লাহ, আমি কিছু লোককে মজুর রেখেছিলাম। অতঃপর কাজ সুসম্পন্ন হলে সকলের মজুরি দিয়ে দেই। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন তার পাওনা টাকা না নিয়েই চলে যায়। অতঃপর আমি তার টাকা ব্যবসার কাজে কাজে লাগাই। প্রচুর পরিমাণে লাভ হয় তারপর আমি কিছু ছাগল, দুম্বাও ক্রয় করি সেই টাকা দিয়ে। অতঃপর কয়েক মাস পর সেই মজুর আমার কাছে আসলো। এবং বলল, হে মহাজন! আমার টাকা আমাকে দিন। আমি তাকে ছাগল, দুম্বা দেখিয়ে বললাম, এইযে এগুলো সবই তোমার। একটু বিরক্ত হলো। এবং বলল, রসিকতা করিয়েন না আমার টাকা দিয়ে দিন। আমি বললাম, রসিকতা নয়, এসবই তোমার, তুমি নিয়ে যাও। অতঃপর সে নিয়ে গেল।
হে আল্লাহ! এর কাজ যদি আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে আমাদেরকে এই ভয়াবহ মুসিবত থেকে রক্ষা করুন। সুতরাং, গুহার মুখ থেকে পাথরটি সম্পূর্ণ সরে যায় তারা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
রেফারেন্সঃ—
উক্ত হাদীসটি হযরত আবু আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর ইবনু খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
বর্ণনাকারী গ্রন্থসমূহ:—
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং— ২২১৫
২. মুসলিম, হাদীস নং— ২৭৪৩
৩. আবু দাউদ, হাদীস নং— ৩৩৮৭
৪. আহমদ, হাদীস নং— ৫৯৩৭
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।