সকালের সোনালী রোদ এসে পড়েছে জানালার ফাঁক গলে। আতা গাছের উপর থেকে একটি পাখি ডেকে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। কী সুন্দর সকাল! একারণেই গ্রামে আসতে বেশ ভালো লাগে তিতলীর। কিন্তু বাবা মায়ের ব্যস্ততার কারণে খুব কমই আসা হয়। সেই যে তিন বছর আগে এসেছিলো দাদীর মৃ'ত্যুর সময়। তারপর এবার এলো। বারান্দায় দাদাজান উদাস মুখে বসে আছেন। তিতলী ধারণা, তিনি একজন দারূণ মানুষ। তিনি যখন কথা বলেন তখন তিতলীর মনে হয় সে যেন মধুর কোনো কবিতা শুনছে। তিতলী মায়ের কাছে শুনেছে,বিয়ের আগে দাদাজান ছিলেন একজন ভবঘুরে মানুষ, কিছুদিন পর পরই তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন। সকলে ভেবেছিলো তাকে দিয়ে আর যাই হোক সংসার করা হবে না। কিন্তু অতি আশ্চর্যের বিষয় হলো দাদীজানের সাথে বিয়ের পর দাদাজান যেন আমূল পরিবর্তন হয়ে গেলেন। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া তো দূর, তিনি বাড়ি থেকে বের পর্যন্ত হতে চাইতেন না।
দাদীজানের মৃত্যুর পর তিনি একাই থাকেন এ বাড়িতে। তাকে শহরে নিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলো বাবা মা এবং তিতলী । কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। দাদার একই কথা, ❝তোদের ওই ইট পাথরের শহরে জোছনা দেখতে পাওয়া যায়? টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনতে পাওয়া যায়? সবচেয়ে বড় কথা তোর মায়ের কবর এখানে, তোর মাকে এখানে একা রেখে আমি কী করে যাই বলতো?❞ তিতলী বাইরে দাদাজান এর পাশে এসে দাঁড়ায়, দাদাজান এর কাঁধে হাত রাখে, দাদাজান কী যেন ভাবছিলেন, চমকে তিতলীর দিকে তাকান। তিতলীকে দেখে হাসেন, বলে উঠেন, ❝কী সুন্দর মেঘ করেছে দেখেছিস, বৃষ্টি নামবে।❞ তিতলী বলে উঠে, ❝হ্যাঁ দাদাজান, একটু আগে ও কী সুন্দর রোদ ছিলো, এখন হঠাৎই আকাশটা মেঘে ঢেকে গেলো।❞ দাদাজান বলেন,❝বর্ষাকাল মানে তো এমনই, এই রোদ, এই বৃষ্টি। জানিস, তোর দাদীর বৃষ্টি ভীষণ পছন্দের ছিলো, বৃষ্টি হলে একেবারে বাচ্চা হয়ে যেতো যেন , আমাকে টেনে নিয়ে ছুটে চলে যেতো বাইরে।❞ এটুকু বলেই দাদাজান দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন৷ তিতলী বলে উঠে, ❝তুমি দাদীকে ভীষণ ভালোবাসতে তাই না দাদাজান?❞ দাদাজান বলে উঠেন, ❝সে এমন এক চমৎকার মেয়ে ছিলো যাকে ভালো না বেসে পারা যায় না।❞
দুপুর নাগাদ বেশ সুন্দর বৃষ্টি নামলো। খেয়ে দেয়ে জানালার পাশে একটি বই নিয়ে বসেছে তিতলী। হঠাৎ জানালার বাইরে তাকালে তিতলী দেখতে পায়, দাদাজান বৃষ্টির মাঝে বেরিয়ে পড়েছেন, হাতে একগুচ্ছ কদম ফুল। দৌঁড়ে বাইরে আসে তিতলী, ছাতা মাথায় দিয়ে ছুটে যায় দাদাজান এর কাছে৷ বলে, ❝দাদাজান, এই বৃষ্টির মাঝে ফুল হাতে কোথায় যাচ্ছো তুমি?❞ দাদাজান একটু মুচকি হাসেন,কিন্তু সে হাসিতে আনন্দের চেয়ে বিষাদের উপস্থিতি বেশি, তিনি বলেন, ❝তোর দাদীকে বৃষ্টি পড়লেই যেখান থেকে পারি কদম ফুল এনে দিতে হতো। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি তার খোঁপায় কদম ফুল গুঁজে দিতাম, আর সে গাইতো, ❝বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছো দান❞। দেখ, কী সুন্দর বৃষ্টি পড়ছে আজ, কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার সেই মানুষটি নেই।❞ এটুকু বলেই দাদাজান হাঁটতে থাকেন। তিতলীও মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটতে থাকে তার পিছন পিছন। দাদাজান গিয়ে থামেন দাদীর ক'বরের কাছে। কদম ফুলগুলো রাখেন ক'বরের উপর। হঠাৎ ক'বরের পাশে বসে পড়ে হুহু করে কাঁদতে থাকেন৷ তিতলী মাথার উপর থেকে ফেলে দেয় ছাতাটা। বৃষ্টিজল গড়িয়ে পড়ে তার শরীর বেয়ে। সে বিড়বিড় করে বলে উঠে, ❝এই পৃথিবীতে এখনো ভালোবাসা আছে, এইসব ভালোবাসা মিছে নয়।❞
এইসব ভালোবাসা মিছে নয়
~ নাফিসা হাসনীন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।