সেদিন পরীক্ষা শেষে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। মাঝপথে হঠাৎ গাড়িটা থমকে দাঁড়ালো। গাড়ির চালক বললেন, "গাড়ি ঠিক হতে কিছুটা সময় লাগবে"। আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। পাশ থেকে নিতু বলে উঠলো, "এখন কী করবি, মীরা?" আমি বললাম, "কী আর করবো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই, তবে জায়গাটা কিন্তু বেশ সুন্দর।" এর মাঝে আমাদের দুশ্চিন্তাকে আরো বাড়িয়ে দিতেই যেন আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেলো, কিছুক্ষণ পরই একরাশ অন্ধকার ছাপিয়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো।
আমরা দৌঁড়ে একটি বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজার কড়া নাড়া মাত্রই একজন মহিলা দরজা খুলে দাঁড়ালেন। যেন তিনি দরজার অপর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দরজা খোলার উদ্দেশ্যে। আমি বললাম, "আমাদের গাড়িটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গিয়েছে , বাইরে ভীষণ বৃষ্টি, আমরা কী কিছু সময় আপনার বাড়িতে বসতে পারি?" মহিলা বলে উঠলেন, "নিশ্চয়, নিশ্চয়, ভেতরে এসো।" আমরা ভেতরে গিয়ে বসলাম, বাড়িটা বেশ সুন্দর, চারিদিকে বিভিন্ন রঙের বাগানবিলাস বাড়িটিকে আরো রঙিন করে তুলেছে। কিছুক্ষণ পর একটি তোয়ালে এবং তিন কাপ চা নিয়ে মহিলাটি আমাদের সামনে বসলেন। এবার আমি তাকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। শ্যামলা বর্ণের চেহারা, চোখ দুটো অসম্ভব সুন্দর। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, দু চোখে নিদারূণ মায়া, সে মায়ায় যেন আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেলো। কেন যেন আমার মনে হলো এই মানুষটি আমার খুব পরিচিত, খুব আপন।
"কী হলো! তোমারা যে কেউ চা নিলে না? চা'টা শেষ করো, বৃষ্টির সময় চা খেতে বেশ ভালোই লাগে।" চা'য়ে চুমুক দিয়ে আমি তাকে বললাম, "যদি কিছু মনে না করেন, আপনাকে একটি প্রশ্ন করি?" তিনি বললেন, "নিশ্চয়।" আমি শুধালাম, "আপনার বাড়ির চারপাশে প্রচুর বাগানবিলাস গাছ দেখতে পেলাম ,বাগানবিলাস কী আপনার খুব প্রিয়?" তিনি বললেন, " হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছো, বাগানবিলাস আমার ভীষণ প্রিয়,বহু রঙের বাগানবিলাস আমার সংগ্রহে আছে,তারপরেও যখনই বাগানবিলাস গাছ দেখি নিজেকে সামলাতে পারি না, কিনে নিয়ে আসি,যার ফলস্বরূপ বাড়ির আশেপাশে এতো বাগানবিলাস গাছ।" তার কথা শুনে আমি ভীষণ মুগ্ধ হয়ে বললাম, "আমার ও বাগানবিলাস ভীষণ পছন্দের,কিন্তু আপনার মতো এতো গাছ আমার সংগ্রহে নেই।"
এরপর আরো কতশত গল্প করলাম তার সাথে। আড্ডায় মগ্ন থাকায় কখন যে সময় পেরিয়ে গেলো টেরই পেলাম না। বাইরে থেকে হর্ন এর আওয়াজ পেলাম, চালক গাড়ি ঠিক করে নিয়ে এসেছেন। উঠে পড়লাম আমরা, বললাম," আমাদের গাড়ি চলে এসেছে"। তিনি আমাদের সাথে বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়ালেন, হঠাৎ একটি ছোট্ট বাগানবিলাস গাছ এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন, "এটি তোমার জন্য।" আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম, বললাম, "আপনার এতো শখের গাছ আমায় কেন দিলেন?" তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "তুমি ভীষণ মিষ্টি একটি মেয়ে, তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে,তাই এটি উপহার স্বরূপ তোমায় দিলাম।" ক্ষণিকের পরিচয়ে তার এহেন আন্তরিকতায় আমি পুলকিত হলাম। প্রফুল্ল চিত্তে গাড়িতে উঠে বসলাম।
একদিন পর শেষ পরীক্ষাটি দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। সেই বাড়িটি দেখে হঠাৎ সেই মহিলার সাথে দেখা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মালো। গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেলাম এবং কিছুটা অবাক ও মর্মাহত হলাম৷ বাড়ির সামনের দরজায় এক বিরাট তালা লাগানো,আশেপাশে মাকড়সা'র জালে ভর্তি। যেদিন এই বাড়িটিতে এসেছিলাম কোনো মাকড়সা'র জাল দেখতে পাইনি। একদিনেই কী করে এতো জাল তৈরি হলো! কৌতূহলবশত পাশের বাড়িটিতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লাম। একজন মহিলা দরজা খুলে দাঁড়ালেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার পাশের বাড়ির মানুষেরা কোথায় গিয়েছে তা কী আপনি জানেন?" তিনি অবাক হলেন, বললেন, "পাশের বাড়ির মানুষ? পাশের বাড়িতে তো কেউ থাকে না।" আমি অবাক হয়ে শুধালাম, "তবে এই বাড়িটি কাদের?" তিনি বললেন, "এই বাড়িটিতে তো রিনা ভাবিরা থাকতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর তার ছেলে থাকতেন এ বাড়িতে। ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন রিনা ভাবি। পাঁচ বছর আগে এক্সিডেন্টে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তারপর থেকে বাড়িটি তালাবদ্ধই থাকে। তুমি তার কে হও?" আমি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। বুকের ভেতর এক মহা তান্ডব আর মাথায় অজস্র প্রশ্ন নিয়ে আমি সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।
দুই বছর পর,
বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে। আমি আর আবির বসে গল্প করছিলাম,হাতে চা'য়ের কাপ। আমাদের বিয়ের ছ'মাস পেরোলো আজ। হঠাৎ আবির বললো, "আজ আমার সবচেয়ে আপন মানুষটিকে তোমায় দেখাবো।" আমি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তার দিকে তাকালাম। সে ভেতরের ঘর থেকে একটি ছবি নিয়ে এলো। ছবিতে একটি ছোট ছেলে একজন মধ্যবয়সী মহিলার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে । মহিলার মুখের দিকে ভালোভাবে তাকাতেই আমার হাত কেঁপে উঠলো। গরম চা ছিঁটকে পড়লো হাতে পায়ে। আবির ব্যস্ত হয়ে উঠলো, "কী হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন?"। খুব কষ্টে নিজেকে সামলে আবিরকে প্রশ্ন করলাম, "ইনি কে?" সে বললো, "আমার মা।"
আমি বাগানবিলাস গাছটির কাছে এসে এসে দাঁড়ালাম,সেই ছোট্ট বাগানবিলাস গাছটি এখন বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে। ডালে ডালে গোলাপী রঙের ফুল শোভা পাচ্ছে। আমি গাছটিতে হাত বুলিয়ে দিলাম। তবে কী তিনি সেদিন আমায় এই উপহারটি দিতেই এসেছিলেন? এটাই কী তবে আমার শাশুড়ীর পক্ষ থেকে আমার বিয়ের উপহার? আমার চোখ ছলছল করে উঠলো, চোখের সামনে ভেসে উঠলো, সেই সুন্দর চোখ,মায়াময় হাসি।
গল্প ~ বাগানবিলাস
নাফিসা হাসনীন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।