" মানুষটি দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে আখিরাত ভুলে গিয়েছিল"
একটি ছোট্ট শহরে একজন ধনী ব্যবসায়ী বাস করতেন। তাঁর ছিল বিশাল বাড়ি, অনেক টাকা-পয়সা, দামি গাড়ি আর অসংখ্য মানুষের পরিচিতি। কিন্তু তাঁর জীবনে একটি জিনিসের অভাব ছিল—আল্লাহর স্মরণ এবং আখিরাতের প্রস্তুতি।
তিনি ভাবতেন, “জীবন তো একটাই! আগে অনেক টাকা উপার্জন করি, বড় বাড়ি বানাই, নিজের সব স্বপ্ন পূরণ করি। ইবাদত করার সময় তো পরেও পাওয়া যাবে।”
এভাবেই দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল। ফজরের আজান শুনেও তিনি বিছানা ছাড়তেন না। কাজের ব্যস্ততায় নামাজ পিছিয়ে দিতেন। কুরআন পড়ার সময় পেতেন না, গরিব মানুষের কষ্ট দেখেও সাহায্যের হাত বাড়াতেন না।
একদিন তাঁর ছোট ছেলে এসে বলল, “বাবা, তুমি প্রতিদিন এত মানুষের সঙ্গে দেখা করো, এত টাকা উপার্জন করো। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য কি তোমার কোনো প্রস্তুতি আছে?”
ছোট্ট শিশুটির কথাটি শুনে তিনি হেসে বললেন, “এখন এসব ভাবার বয়স হয়নি। বড় হলে বুঝবে।”
কিন্তু কথাটি তাঁর স্ত্রীর কানে গেল। তিনি নীরবে বললেন, “মানুষ বড় হওয়ার অপেক্ষা করে, অথচ মৃত্যু কখনো বয়সের অপেক্ষা করে না।”
সেদিন রাতে ব্যবসায়ী লোকটি অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারলেন না। স্ত্রীর কথাগুলো তাঁর মনে ঘুরতে লাগল। তবুও পরদিন সকালে তিনি আবার আগের মতো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
কয়েক দিন পর তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলেন। বন্ধুটি ছিলেন তাঁর মতোই ধনী, তাঁরও ছিল বড় বাড়ি, ব্যবসা আর অনেক স্বপ্ন। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর সঙ্গে গেল না কোনো সম্পদ, কোনো পদমর্যাদা কিংবা কোনো পরিচিতি।
বন্ধুর জানাজায় দাঁড়িয়ে ব্যবসায়ী প্রথমবার গভীরভাবে ভাবলেন, “যে মানুষটি গতকালও আমার সঙ্গে থা বলছিল, আজ সে মাটির নিচে। একদিন আমাকেও কি এভাবেই চলে যেতে হবে?”
সেদিন বাড়ি ফিরে তিনি নিজের ঘর, গাড়ি আর সম্পদের দিকে তাকালেন। সবকিছুই আগের মতো ছিল, কিন্তু তাঁর মনে হলো—এসবের কোনোটিই মৃত্যুকে থামাতে পারবে না।
পরদিন ফজরের আজান শুনে তিনি উঠে পড়লেন। অজু করে নামাজে দাঁড়ালেন। বহুদিন পর সিজদায় গিয়ে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, আমি দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে আপনাকে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ভুলগুলো ক্ষমা করুন। আমাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।”
এরপর থেকে তিনি নিজের জীবন বদলাতে শুরু করলেন। ব্যবসা ছেড়ে দেননি; বরং হালালভাবে ব্যবসা করতেন, সময়মতো নামাজ আদায় করতেন, পরিবারের হক আদায় করতেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষকে সাহায্য করতেন।
তিনি বুঝতে শিখলেন—দুনিয়ার কাজ করা দোষের নয়; দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে আখিরাত ভুলে যাওয়াই বড় ক্ষতি।
একদিন তিনি তাঁর ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন, “বাবা, টাকা উপার্জন করবে, নিজের জীবন সুন্দর করবে, মানুষের উপকার করবে। কিন্তু কখনো ভুলে যেও না—এই জীবন স্থায়ী নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।”
ছেলেটি বাবার হাত ধরে বলল, “বাবা, তুমি এখন বুঝতে পেরেছ—জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ বাবা, সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা।”
শিক্ষা: দুনিয়ার সম্পদ একদিন অন্যের হাতে চলে যাবে, কিন্তু আমাদের আমলই আখিরাতের প্রস্তুতির অংশ। তাই দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নামাজ, তওবা, মানুষের হক আদায় এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
মৃত্যু কখন আসবে, তা আমরা জানি না। তাই ভালো কাজ করার জন্য আগামীকালের অপেক্ষা না করে আজ থেকেই শুরু করি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।