প্রশ্ন : ছোটবেলা থেকে এই প্রশ্নটার আমি উত্তর খুজেছি, পাই নি।
আব্রাহামিক ধর্ম অনুসারে আমরা সবাই বাবা আদম ও মা হাওয়া থেকে এসেছি। আল্লাহ তো তাদের কথা বলার শক্তি দিয়েই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের একটা ভাষা ছিলো। তাহলে বাবা আদম মা হাওয়ার ভাষায় তাদের সন্তান কথা বলেছে। এই সন্তানদের ভাষায় আবার সন্তানদের সন্তানরা কথা বলেছে। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তো তাহলে একটি ভাষাই থাকার কথা। এতোগুলো ভাষা তো তাহলে হওয়ার কথা না। অর্থাৎ আমরা সবাই বাবা আদম থেকে পৃথিবীতে আসলে এতোগুলো ভাষা কিভাবে হলো ?
ভাষার বিবর্তন কিভাবে হলো এবং কেনোই বা হলো ?
জবাব : এটা খুব ভালো প্রশ্ন, ছোটবেলায় এই প্রশ্নটা প্রায় সবার মাথায় আসে। এর উত্তরটা দুইভাবে বুঝতে হবে - ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং ভাষাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। দুইটাই কিন্তু একসাথে মিলে যায়।
১. আব্রাহামিক ধর্মগুলো কী বলে?
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন - "আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।" [সূরা রুম ৩০:২২]
অর্থাৎ ভাষার এই বৈচিত্র্যকে আল্লাহ নিজেই তাঁর ইচ্ছা ও নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাইবেলে এর জন্য বাবেলের মিনারের ঘটনা বলা হয়। মানুষ অহংকার করে আকাশ ছোঁয়ার জন্য একটা মিনার বানাতে চেয়েছিল, তখন ঈশ্বর তাদের ভাষা গুলিয়ে দেন যাতে তারা একে অপরকে বুঝতে না পারে এবং ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামে আল্লাহ আদম (আ.) কে "সব নাম" শিক্ষা দিয়েছিলেন [সূরা বাকারা ৩১]। সেই আদি ভাষা কী ছিল তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে, কেউ বলেন আরবি, কেউ বলেন সুরিয়ানি। কিন্তু মূল বিষয় হলো, আল্লাহ মানুষকে ভাষা শেখার যোগ্যতা দিয়ে পাঠিয়েছেন।
২. তাহলে একটা ভাষা থেকে এত ভাষা কীভাবে হলো? - ভাষাবিজ্ঞানের উত্তর
এটাই হলো ভাষার বিবর্তন। একটা ভাষাই থেকে যায় না, কারণ:
ক) ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা: আদম সন্তানরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এক দল পাহাড়ে, এক দল মরুভূমিতে, এক দল দ্বীপে। ৫০০ বছর যোগাযোগ না থাকলে একই ভাষা দুই রকম হয়ে যায়। যেমন ৩০০ বছর আগে ব্রিটিশরা যে ইংরেজি নিয়ে আমেরিকায় গিয়েছিল, আজকের ব্রিটিশ আর আমেরিকান ইংরেজি আলাদা।
খ) উচ্চারণের পরিবর্তন: আমরা সবাই শুদ্ধ উচ্চারণ করি না। একটা শব্দ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সামান্য বিকৃত হতে থাকে। যেমন - আপনার দাদা যে শব্দকে 'পানি' বলতেন, সেটাই অন্য অঞ্চলে গিয়ে 'জল', 'ওয়াটার', 'মায়া' হয়ে গেছে।
গ) নতুন জিনিসের জন্য নতুন শব্দ: মরুভূমির মানুষের কাছে তুষারের জন্য ২০টা শব্দ লাগে না, কিন্তু এস্কিমোদের লাগে। নতুন পরিবেশে নতুন শব্দ তৈরি হয়।
সহজ উদাহরণ: বাংলা ভাষাটাই দেখুন। ১০০০ বছর আগে বাংলা বলে কোনো ভাষা ছিল না, ছিল সংস্কৃত। সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত, প্রাকৃত থেকে বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া - সব আলাদা হয়ে গেছে। মাত্র ১০০০ বছরেই একটা ভাষা থেকে ৫-৬ টা ভাষা হয়ে গেল।
তাহলে আদম (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৭-৮ হাজার বছরে (বা আরও বেশি) হাজার হাজার ভাষা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক না।
সারসংক্ষেপে: আল্লাহ মানুষকে একটা ভাষা বা ভাষা শেখার ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন, কিন্তু মানুষের ছড়িয়ে পড়া, বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে সেই এক ভাষা থেকেই হাজারো ভাষা হয়েছে। এটাই আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্যের অংশ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।