আমাদের পরিবারের গল্প
ভালোবাসায় গাঁথা এক জীবন
একটি বাড়ি মানেই শুধু দেয়াল আর ছাদ নয়,
একটি বাড়ি মানেই কত মানুষের পরিচয়।
কেউ দেয় ভালোবাসা, কেউ দেয় অভিমান,
সবাই মিলে গড়ে ওঠে পরিবারেরই প্রাণ।
এই গল্প আমাদের, এই গল্প আপনজনের,
হাসি-কান্না মিশে আছে কত পুরোনো দিনের।
কেউ আজও পাশে আছে, কেউ স্মৃতির ঘরে,
তবুও সবাই বেঁচে আছে আমাদেরই অন্তরে।
আমার বাবা শামসুল হক
আমার বাবা শামসুল হক, আমার গর্বের মানুষ,
সততা আর পরিশ্রমে গড়েছেন নিজের জীবন।
তিনি একজন ডাক্তার, প্রাণীর করেন চিকিৎসা,
মানুষের সেবার মতোই তাঁর কাছে কাজের শিক্ষা।
ফুলবাড়ী উপজেলার প্রাণিসম্পদ অফিসে,
উপসহকারী কর্মকর্তা—দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠায়।
পড়াশোনার প্রতি ছিল বাবার গভীর টান,
কষ্ট এলেও ছাড়েননি জ্ঞানের সেই সন্ধান।
রাত জেগে মোটরের শব্দে ধানক্ষেত পাহারা,
সেই রাতেও বই খুলে পড়তেন মন দিয়ে সারা।
অন্ধকার মাঠের মাঝে স্বপ্ন ছিল চোখে,
জীবনকে জয় করার জেদ ছিল তাঁর বুকে।
কত কষ্ট পেরিয়ে তিনি নিজের পথ বানিয়েছেন,
অভাবের মাঝেও পড়াশোনার আলো জ্বালিয়েছেন।
দাদার পূর্বপুরুষের কত পুরোনো কাহিনি,
বাবার মুখে শুনলে মনে হয় আজও তারা জীবন্ত ধরণী।
আমাদের বংশের ইতিহাস বাবার মুখে জানা,
কত নাম, কত ঘটনা, কত স্মৃতির ঠিকানা।
রাগী তিনি, তবু ভীষণ ভালো মনের মানুষ,
সততার কাছে মাথা নত করেন না—এই তাঁর গুণ।
বাবার মতো মানুষ আর আছে কি এই ভুবনে,
খুঁজলেও হয়তো এমন মানুষ মিলবে না জীবনে।
রাগের আড়ালেও তাঁর ভালোবাসা গভীর,
বাবা আমার কাছে তাই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি নীড়।
আমার মা সুলতানা পারভীন জোসনা
আমার মা সুলতানা পারভীন জোসনা নামের মতো মায়াময়ী,
নরম স্বভাবের মানুষ তিনি, হৃদয় তাঁর কোমলময়ী।
ছাত্রী হিসেবেও ভালো ছিলেন, পড়ায় ছিল মন,
আরবি লাইনে পড়াশোনা ছিল তাঁর আপন স্বপন।
জীবন কিন্তু সবসময় স্বপ্নের মতো নয়,
কখনো সুখের পাশে দুঃখের ছায়াও রয়।
শাশুড়ির অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন চুপে,
তবু সংসারটাকে রেখেছেন নিজের বুকের রূপে।
কত কথা হয়তো মনে ছিল, মুখে আসেনি কিছু,
নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন সবার পিছু পিছু।
নারী মানে যে শুধু কোমল, তা মা নন প্রমাণ,
নরম হয়েও মানুষ যে কতটা শক্ত—মা তারই দৃষ্টান্ত।
আমার দাদা মরহুম শওকত আলী মুন্সী
আমার দাদা মরহুম শওকত আলী মুন্সী ছিলেন ভালো,
২০১৫ সালে চলে গেলেন, স্মৃতিগুলো রেখে আলো।
সরল মনের মানুষ ছিলেন, ভালো ছিল তাঁর প্রাণ,
আজও তাঁর কথা মনে পড়ে, আজও জাগে টান।
দাদির সাথে তাঁর সংসার ছিল অন্য রকম গল্প,
দাদি ছিলেন এগারোতেই বিয়ে হওয়া সেই অল্পবয়সী কন্যা।
দাদির রাগের সামনে দাদা থাকতেন চুপচাপ হয়ে,
সংসারের মানুষ হয়েও থাকতেন অনেকটা গুটিয়ে।
জলিল বিড়ি খেতেন, ছিল সেটি তাঁর অভ্যাস,
দাদির ভয়ে শেষ জীবনে সেটিও হলো পরবাস।
পছন্দের বিড়িটুকুও আর খেতে পারেননি শেষে,
এমন কত ছোট গল্প আজও ঘুরে বেড়ায় মনে।
আমার দাদি সুফিয়া বেগম
আমার দাদি সুফিয়া বেগম, বুদ্ধিতে খুব ধার,
তাঁর সাথে কথায় পেরে ওঠা সত্যিই বড় ভার।
ঝগড়ার সময় যুক্তি নিয়ে দাঁড়ান শক্ত হয়ে,
তাঁর কথার উত্তর খুঁজতে হয় অনেক ভেবে।
তাঁর স্বভাব যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি নিজের মত,
তাঁকে বোঝা সহজ নয়, এই কথাটিও সত্য।
আমাকে তিনি পছন্দ করেন না, এটাও আমার জানা,
তবু তিনি আমাদের পরিবারেরই পুরোনো ঠিকানা।
মানুষ শুধু ভালো-মন্দ দিয়ে হয় না পরিচিত,
প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই থাকে অনেক অজানা ইতিহাস।
তাই দাদির কথাও থাকবে আমাদের পরিবারের মাঝে,
পুরোনো দিনের কত গল্প তাঁরই স্মৃতির সাজে।
আমার দুই ফুপু
আমার দুই ফুপু—লাইজু আর নূরজাহান,
দুইজনের দুই স্বভাব, দুই রকমের টান।
বড় ফুপু কিছুটা ভালো, আপন করে নেন মনে,
ছোট ফুপু আমাদের পছন্দ করেন না তেমন করে।
বড় ফুপার চলে যাওয়ায় শূন্য হয়েছে ঘর,
কিছু মানুষ চলে গেলে বোঝা যায় তারা কতটা আপন পর।
মৃত মানুষ ফিরে আসে না, থাকে শুধু স্মৃতি,
পুরোনো দিনের কথাগুলোই তখন হয় সঙ্গী।
আমার একমাত্র কাকা মোজাহার আলী
আমার একটাই কাকা, মোজাহার আলী নাম,
তাঁর মেয়ে মিতুকে নিয়ে আছে আলাদা এক কাম।
আমার বড় ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিতে চান তাকে,
এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে কত চেষ্টা করেন তাকে।
কখনো সরল মনে, কখনো কৌশলী চাল,
কাকার স্বভাব বুঝতে গেলে লাগে অনেক কাল।
পরিবারের গল্পে তিনিও নিজের একটি অংশ,
তাঁকে বাদ দিলে অসম্পূর্ণ হবে আমাদের এই বংশ।
আমার বড় ভাইয়া মোয়াজ্জেম হোসেন শামীম
আমার বড় ভাইয়া মোয়াজ্জেম হোসেন শামীম,
সহজ-সরল মানুষ, আবার বুদ্ধিতে ভীষণ দামী।
পড়াশোনায় ছিলেন তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র,
জ্ঞান আর বুদ্ধির জোরেই করেছেন নিজেকে পাত্র।
ছোটবেলায় ছিলেন তিনি দেখতে ভীষণ সুন্দর,
তাকে নাকি পরি ধরেছিল—শুনেছি সেই খবর।
সুদর্শন সেই ভাইয়া, মনের মানুষ সহজ,
হাতের কাজে কাঁচা হলেও বুদ্ধির কাজে তুখোড়।
কতদিন আগেও ভাইয়া কোলে নিত আমায়,
ছোট্ট বোনটি তখন থাকত তাঁরই ছায়ায়।
আজ আমি বড় হয়ে গেছি, কোলে ওঠা হয় না,
সময় কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যায়—বুঝি না।
সেই কোলে থাকা দিনগুলো আজও মনে পড়ে,
ছোট্ট স্বর্ণা যেন এখনো লুকিয়ে আছে ঘরে।
ভাইয়া বড় হয়েছে, আমিও বড় হলাম,
শৈশবের সেই দিনগুলো পেছনে ফেলে এলাম।
আমার ছোট ভাইয়া
আমার ছোট ভাইয়াও রাগী, বুদ্ধিতে খুব তীক্ষ্ণ,
কৌশলের কাজে তাঁর মতো মানুষ সত্যিই বিরল।
যে কাজ অন্যের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়,
ভাইয়া নিজের বুদ্ধিতে তার সহজ পথ বানায়।
রাগ আছে তাঁর মাঝে, আছে বুদ্ধির জোর,
জটিল কোনো কাজেও তিনি খুঁজে নেন ভোর।
কৌশল দিয়ে কাজ করা তাঁর নিজেরই ঢং,
তাঁর বুদ্ধির কাছে কঠিন কাজও হয়ে যায় রঙিন রং।
আর আমি—স্বর্ণা
আর আমি স্বর্ণা, এই বাড়ির সবার ছোট,
চুপচাপ থাকি বেশিরভাগ, কথায় আবার বড় ঠোঁট।
সুযোগ পেলেই কথা বলি, থামতে চাই না আর,
চুপচাপ মেয়েটাই তখন হয়ে যায় কথার পাহাড়।
মেধাবী আমি, তবু থাকি দোটানার ঘোরে,
কত কথা জমে থাকে মনের গোপন ঘরে।
পড়ুয়া নই তেমন, তবু ফল ভালো হয়,
কীভাবে হয় জানি না, এটাই আমার পরিচয়।
মনের কথা কাউকে বলা আমার বড় কঠিন,
হাসির আড়ালেই রাখি কত কথা প্রতিদিন।
সবাই আমাকে ভালোবাসে—এটা আমি জানি,
তবুও কেন কখনো নিজেকে অসহায় মনে হয় জানি না।
আপন মানুষ ঘিরে থেকেও মনটা থাকে চুপ,
নিজের কথাই নিজের কাছে হয়ে যায় গোপন রূপ।
হয়তো আমি ছোট বলেই সবাই রাখে আমায় আগলে,
তবুও কিছু ব্যথা থাকে, যা বলা যায় না সহজে।
আমি এই পরিবারের সবচেয়ে ছোট্ট মানুষ,
তাই হয়তো সবার ভালোবাসা পেয়েছি অঢেল রূপে।
কেউ বকেছে, কেউ হাসিয়েছে, কেউ নিয়েছে কোলে,
কেউ হয়তো বুঝতে পারেনি কত কথা জমে মনে।
আমার নানা মরহুম আব্দুল হাজী মোহাম্মদ কাদের সরকার
আমার নানা মরহুম আব্দুল হাজী মোহাম্মদ কাদের সরকার,
নামের মতোই ব্যক্তিত্ব ছিল দৃঢ়, ছিল তাঁর বিচার।
পাঁচ মামার মধ্যে বড় মামার কাছে শুনেছি তাঁর কথা,
বিচারের আসরে গরিবের মুখে ফুটত হাসির ব্যথা।
টাকার কাছে কখনো তিনি সত্য বিকিয়ে দেননি,
অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে নিজের মান হারাননি।
গরিব মানুষ বিচার পেয়ে প্রাণ খুলে হাসত,
ন্যায়ের পথে দাঁড়িয়ে নানা সত্যের কথাই বলতেন।
তাঁর বিচার ছিল সবার জন্য একই রকম,
টাকার কাছে ন্যায় বিকোবে—এমন মানুষ ছিলেন না কখনো।
আজ তিনি নেই, তবুও শিক্ষা রয়ে গেছে,
ন্যায়ের পথে চলার কথা আমাদের রক্তে বেঁধে গেছে।
আমার নানি সালমা গলেনুর বেগম
আমার নানি সালমা গলেনুর বেগম ছিলেন সুন্দরী নারী,
নামের মতোই মায়াময়ী, শান্ত স্বভাবের ভারী।
গুলুমুলু হয়ে হাসতেন, মুখে থাকত মায়া,
তাঁকে দেখলেই মনে হতো শান্ত কোনো ছায়া।
কারও সাথে ঝগড়া করতেন না কোনোদিন,
শান্তভাবে কাটিয়েছেন জীবনের প্রতিটি দিন।
ছিলেন খুবই ঠান্ডা, কোমল তাঁর মন,
নানির মতো মানুষ পাওয়া সত্যিই ছিল ভাগ্যের ধন।
আমাদের বড় পরিবার
আমার ছয় খালা, পাঁচ মামা—কত আপনজন,
প্রত্যেকের জীবন জুড়ে আলাদা আলাদা ক্ষণ।
কেউ দিয়েছে ভালোবাসা, কেউ দিয়েছে অভিমান,
সবাই মিলে আমাদের পরিবারের প্রাণ।
এই পরিবারে কেউ এক রকম নয়,
কারও হাসি বেশি, কারও চোখে নীরব ক্ষয়।
কেউ খুব কাছে থেকেও মনের কথা বলে না,
কেউ দূরে থেকেও ভালোবাসতে ভুলে না।
কেউ রাগী, কেউ শান্ত, কেউ ভীষণ সরল,
কেউ আবার বুদ্ধির খেলায় অনেক বেশি চতুর।
কেউ কষ্ট সহ্য করে, কেউ কষ্ট দেয়,
তবুও সবাই মিলে পরিবার নামের বন্ধন বয়ে নেয়।
শেষ কথা
একদিন আমরাও সবাই একে একে যাব চলে,
থেকে যাবে গল্পগুলো পুরোনো দিনের কোলে।
কারও ছবি থাকবে ঘরে, কারও থাকবে নাম,
কারও কথা মনে পড়লে চোখে আসবে জলধারার ঘ্রাণ।
বাবার রাতজাগা পড়া থাকবে গল্প হয়ে,
মায়ের নীরব সহ্য থাকবে স্মৃতির পাতায় রয়ে।
দাদার সরল হাসি থাকবে পুরোনো কোনো গানে,
নানার ন্যায়ের শিক্ষা থাকবে আমাদের প্রাণে।
নানির সেই মায়াময়ী হাসি থাকবে মনে গাঁথা,
ভাইয়ার কোলে থাকা দিন হবে শৈশবের কথা।
যে কোলে একদিন ছিলাম আমি ছোট্ট স্বর্ণা,
আজ বড় হয়ে বুঝি—শৈশব ফেরে না আর কোনোদিনও।
সবাই আমাকে ভালোবাসে, এ আমার বড় পাওয়া,
তবু মাঝে মাঝে মনটা কেন হয় এত একা?
মানুষের ভিড়ের মাঝেও কিছু ব্যথা থাকে গোপন,
সবচেয়ে আপন মানুষও কখনো পড়তে পারে না সে মন।
তবু আমি এই পরিবারেরই ছোট্ট একটি মেয়ে,
সব ভালোবাসা নিয়ে আজও আছি সবার হয়ে।
আমার শিরায় বয়ে চলে পূর্বপুরুষের গান,
বাবার সততা, মায়ের মায়া, নানার ন্যায়ের মান।
আমি স্বর্ণা—এই পরিবারের শেষ প্রান্তের আলো,
আমার আপন মানুষগুলোই আমার পৃথিবীর ভালো।
ঝগড়া থাক, অভিমান থাক, থাকুক যত ভুল,
ভালোবাসা থাকলে পরিবার কখনো হয় না বিলীন।
কারণ পরিবার মানে শুধু সুখের দিনে পাশে থাকা নয়,
পরিবার মানে কষ্টের দিনেও সম্পর্ক হারিয়ে না যাওয়া হয়।
মানুষ চলে যায়, সময় যায়, বদলে যায় সব ঠিকানা,
তবু রক্তের টানে হৃদয় ভুলে না আপন মানুষকে কোনোদিনও—
এই তো আমাদের পরিবার, এই তো আমাদের জানা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।