সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ৫ -শূন্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
অবসর নেওয়ার পর অভিক প্রথমবার বুঝল, একটা দিন কত লম্বা হতে পারে। এতদিন সকাল মানেই অফিসে যাওয়ার তাড়া, ফাইল, মিটিং, ফোনকল। সন্ধ্যা মানেই বাজার, বিল, মেয়েদের পড়াশোনার খোঁজ আর সংসারের নানা হিসাব। এখন সকালে ঘুম ভাঙার পর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। দুপুর গড়িয়ে যায়, বিকেল নামে, অথচ করার মতো জরুরি কোনো কাজ থাকে না। শুরুতে ভালোই লাগত। পরে সেই ফাঁকা সময়টাই কেমন যেন তার চারপাশে বসে থাকতে শুরু করল।
এক বিকেলে পুরোনো আলমারি গোছাতে গিয়ে অভিক একটা খাতা পেল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। খাতাটা হাতে নিয়ে হঠাৎ তার মনে হলো, জীবনেরও যদি একটা হিসাব করা যেত! কী পেয়েছে, কী করতে পেরেছে, কী রেখে যাচ্ছে—সবকিছু একবার লিখে দেখা যাক। সে টেবিলে বসে প্রথম পাতাটা খুলল। কিছুক্ষণ কলমটা আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে তারপর লিখল—বাড়ি: হয়েছে। মেয়েদের পড়াশোনা: শেষ। মেঘ চাকরি পেয়েছে। মিশি নিজের কাজ শুরু করেছে। ব্যাংকে কিছু সঞ্চয় আছে। ঋণ নেই।
একটার পর একটা লাইন নামতে থাকল। হিসাব মিলছিল। বেশ ভালোভাবেই মিলছিল। বাইরে থেকে দেখলে অভিকের জীবনকে সফলই বলা যায়। দায়িত্ববান বাবা, সংসারী স্বামী, সৎ চাকরিজীবী—জীবনটা সে খারাপ কাটায়নি।
তারপর খাতার পরের লাইনে গিয়ে হাত থেমে গেল।
আমি কী পেলাম?
অভিক অনেকক্ষণ প্রশ্নটার দিকে তাকিয়ে রইল।
উত্তর খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। তখন সে গল্প লিখত। খাতার পেছনের পাতায়, পুরোনো কাগজে, কখনো স্কুলের শেষ পিরিয়ডে বসে। কলেজে পড়ার সময় তার কয়েকটা লেখা পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল। সেই সময় মনে হতো, একদিন একটা বই বের করবে। নিজের নামে একটা বই। ছোটবেলায় যে স্বপ্নটা খুব সহজ মনে হয়েছিল, বড় হতে হতে সেটাই যেন অকারণে কঠিন হয়ে গেল।
বিয়ের পর নিশি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার লেখালেখি একেবারে বন্ধ হয়ে গেল?”
অভিক হেসে বলেছিল, “সংসারটা একটু গুছিয়ে নিই। তারপর আবার লিখব।”
তারপর মেঘ এল। মেয়েটা ছোট ছিল। তাকে সময় দিতে হয়েছে। মিশি অসুস্থ হলে রাত জেগে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। বাড়ির কিস্তি, বাবার চিকিৎসা, সংসারের খরচ—একটার পর একটা প্রয়োজন সামনে এসেছে। অভিক কখনো কাউকে না বলেনি। শুধু নিজের ইচ্ছেটাকে একটু সরিয়ে রেখে বলেছে, “এখন না।”
নিশি মাঝেমধ্যে আবার বলেছে, “সময় পেলে লিখো।”
অভিক প্রতিবারই একই উত্তর দিয়েছে, “সময় কোথায়?”
এখন সেই সময়টাই তার সামনে পড়ে আছে।
অথচ লেখার টেবিল নেই। অসমাপ্ত গল্প নেই। কেউ অপেক্ষা করে নেই তার নতুন লেখা পড়ার জন্য।
সন্ধ্যায় অভিক বারান্দায় বসে থাকে। মেঘ ফোনে ব্যস্ত, মিশি নিজের কাজ নিয়ে ছুটছে, নিশি রান্নাঘরে। সবাই আছে। সংসারও আছে। শুধু আগের সেই শব্দগুলো নেই। মেয়েদের ছোটবেলার হাসি নেই, স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই, রাত জেগে পড়া নেই।
সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পরও কোথাও যেন কিছু ঠিক হয়নি।
সেদিন রাতে অভিক আবার খাতাটা খুলল। লিখল—ভালোবাসা: পেয়েছি। সম্মান: পেয়েছি। দায়িত্ব: পালন করেছি।
তারপর নিজের নামের নিচে আরেকটা লাইন লিখতে গিয়ে কলম থেমে গেল।
অনেকক্ষণ পর সে আলমারির ওপর রাখা পুরোনো ফাইলটা নামাল। ভেতর থেকে বের হলো কয়েকটা হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ। তার নিজের লেখা। অক্ষরগুলো পুরোনো, কোথাও কালি ফিকে হয়ে গেছে, তবু গল্পগুলো বেঁচে আছে।
অভিক প্রথম পাতাটা পড়তে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর নিশি এসে দরজার কাছে দাঁড়াল। বলল, “আবার লিখছ?”
অভিক মুখ তুলে তাকাল। মৃদু হেসে বলল, “হয়তো।”
নিশি আর কিছু বলল না। শুধু টেবিলের পাশে একটা খালি চেয়ার টেনে বসে রইল।
সেদিন রাতে অভিক বুঝল, জীবনের সব হিসাব সময়মতো মেলানো যায় না। কিছু হিসাব শেষ বয়সে এসে খুলতে হয়। আর তখন দেখা যায়, সংসারের প্রতিটি কলাম ভরা—বাড়ি, টাকা, দায়িত্ব, সাফল্য, সম্পর্ক—শুধু নিজের নামে রাখা ছোট ঘরটাতেই ধুলো জমে আছে।
সে খাতার শেষ পাতায় লিখল—
“যা হারিয়েছি, তার সবটা ফিরে পাব না। তবু যতদিন আছি, নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখব।”
তারপর খাতাটা বন্ধ করল।
সেদিন বহু বছর পর অভিকের মনে হলো, জীবনটা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি।
শুধু এতদিন সে নিজের পাতাটা খুলেই দেখেনি।
আর সেই পাতার এক কোণে, অনেকদিন ধরে পড়ে থাকা শব্দটা সে সেদিন প্রথমবার বদলাতে চাইল—
শূন্য নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।