ত্যাগের মূল্য
একই মহল্লায় থাকত দুই বন্ধু, আদনান ও মেহেদী। ছোটবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে বড় হয়েছে। পড়াশোনা, খেলাধুলা, এমনকি স্বপ্নও ছিল প্রায় একই রকম। কিন্তু তাদের পরিবার ছিল ভিন্ন। আদনানের বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর, আর মেহেদীর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী।
একদিন বিদ্যালয়ে ঘোষণা হলো, জেলা পর্যায়ে মেধাবৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। যে প্রথম হবে, সে উচ্চশিক্ষার জন্য সম্পূর্ণ বৃত্তি পাবে। দুজনই কঠোর পরিশ্রম শুরু করল।
পরীক্ষার মাত্র এক সপ্তাহ আগে আদনানের বাবা দুর্ঘটনায় আহত হলেন। সংসারের দায়িত্ব হঠাৎ আদনানের কাঁধে এসে পড়ল। সকালে কাজ, রাতে পড়াশোনা। ক্লান্ত শরীরে সে ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছিল না।
মেহেদী বিষয়টি বুঝতে পারল। সে প্রতিদিন নিজের পড়া শেষ করে আদনানের বাড়িতে যেত। নিজের নোট, বই এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো তাকে বুঝিয়ে দিত। কখনো নিজের বিশ্রামের কথা ভাবেনি। তার একটাই ইচ্ছা ছিল, বন্ধুটি যেন হাল না ছাড়ে।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সবাই অবাক হয়ে গেল। আদনান প্রথম হয়েছে, আর মেহেদী দ্বিতীয়। অনেকেই মেহেদীকে বলল, "তুমি যদি নিজের পড়ায় আরও সময় দিতে, তাহলে প্রথম হতে পারতে।"
মেহেদী হেসে বলল, "বন্ধুর সাফল্যেও আমার আনন্দ আছে। আমি একা প্রথম হলে হয়তো একটি পুরস্কার পেতাম। কিন্তু বন্ধুকে এগিয়ে দিয়ে আমি একজন মানুষের জীবন বদলানোর সুযোগ পেলাম।"
বছর দশেক পরে আদনান একজন চিকিৎসক হলো। সে গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। উদ্বোধনের দিন সে সবার সামনে বলল, "আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি শুধু আমার পরিশ্রমের কারণে নয়, আমার বন্ধুর নিঃস্বার্থ সহযোগিতার কারণেও। সে যদি নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখত, তাহলে হয়তো আমার এই পথ এত সহজ হতো না।"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক বললেন, "জীবনে এমন অনেক মানুষ পাওয়া যায়, যারা সাফল্যের সময় পাশে থাকে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধু সে-ই, যে নিজের সুবিধার কথা ভুলে তোমাকে সামনে এগিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের আসল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নয়, পরস্পরের উন্নতিতে।"
সেদিন উপস্থিত সব শিক্ষার্থী উপলব্ধি করল, বন্ধুত্ব মানে শুধু একসঙ্গে সময় কাটানো নয়। বন্ধুত্ব মানে ত্যাগ, সহানুভূতি, বিশ্বাস এবং অন্যের সাফল্যে আন্তরিকভাবে আনন্দিত হওয়া।
শিক্ষা: সত্যিকারের বন্ধু কখনো হিংসা করে না। সে নিজের স্বার্থের আগে বন্ধুর কল্যাণকে গুরুত্ব দেয় এবং ভালো কাজে পাশে দাঁড়ায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।