একটি সিদ্ধান্তের দাম
পর্ব–১ : ভুলের শুরু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধারাবাহিক গল্প
"একটা পরিবার ভাঙতে একজন মানুষের একটামাত্র সিদ্ধান্তই যথেষ্ট হতে পারে।"
সকালটা দেখে বোঝার উপায় ছিল না কিছু বদলাবে।
রান্নাঘরে তেলে ডিম ছ্যাঁক করে উঠছিল। কেটলিতে পানি ফুটছে। নিশি চায়ের কাপ নামাতে নামাতে বলল, “আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো। সন্ধ্যায় মায়ের বাসায় যাব।”
শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে অভিক বলল, “দেখি।”
এই “দেখি” শব্দটার সঙ্গে নিশির পুরনো পরিচয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর মানে দাঁড়ায়—ফিরতে দেরি হবে। তারপরও সে আশা করে।
টেবিলে রুটি, ডিম, ডাল। অভিক দু-তিন লোকমা মুখে দিয়েই উঠে পড়ল।
“এইটুকু খেয়ে চলে যাবে?”
“অফিসে গিয়ে কিছু খেয়ে নেব।”
নিশি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। “কী হয়েছে তোমার? সপ্তাহখানেক ধরে খাও না ঠিকমতো। রাতেও ঘুম কম।”
অভিক হাসার চেষ্টা করল। হাসিটা ঠিক পৌঁছাল না। “কিছু হয়নি।”
গলায় জোর নেই। গত এক মাসে লোকটা বদলে গেছে, অথবা বদলটা এখন চোখে পড়ছে। রাত দুটোয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলে। নিশি সামনে গেলে তড়িঘড়ি কল কেটে পকেটে ঢোকায়। আগে এমন করত না।
নিশি প্রশ্ন করেনি। শুধু দেখেছে।
বাড়ি থেকে বের হয়ে অভিক অফিসের রাস্তা ধরল না।
নিউ মার্কেটের গলির ভেতর ঢুকে পড়ল। তিন নম্বর গলির মাথায় ‘ক্যাফে স্মাইল’—নীল রঙচটা সাইনবোর্ড। কোণের টেবিলে রুবেল।
কলেজের বন্ধু। যোগাযোগ ছিল না বছর দশেক। হঠাৎ মগবাজারের মোড়ে দেখা হয়েছিল এক বিকেলে, তারপর থেকে রুবেলের ফোন আসে দিনে দু-তিনবার।
রুবেল চেয়ার টেনে দিয়ে বলল, “মুখ এমন করে রাখছিস কেন? আমি কি তোকে খেয়ে ফেলব?”
অভিক গ্লাসের পানিটা একবারে শেষ করল। “জানি না... ব্যাপারটা সুবিধার ঠেকছে না।”
“এত ভাবিস কেন? টাকাটা দে। তিন মাস। তারপর দ্বিগুণ নিয়ে যা।”
অভিক চুপ। নিজের ব্যাংকে আছে ১৭ হাজার ৮০০ টাকা। নিশির আলাদা কিছু জমানো আছে—লাখখানেক হবে। আর আছে বিয়ের সময় পাওয়া একটা চিকন সোনার চেইন, দুটো বালা।
রুবেল ঝুঁকে এলো। “সুযোগ রোজ আসে না। একবার ঝুঁকি না নিলে এই ভাড়া বাসা, এই টানাটানি—এসবেই আটকে থাকবি।”
কথাটা লাগল ঠিক সেখানে, যেখানে অভিক অনেক দিন ধরে কাঁচা। মাসের ২০ তারিখ পার হলেই বাবার প্রেশারের ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খায়। বাড়িওয়ালা ফোন দেয় ৫ তারিখের আগেই। নিশিকে একবার বলেছিল, “ক্সবাজার নিয়ে যাব।” তিন বছরেও হয়নি।
একটা ফাইল ঠেলে দিল রুবেল। “সই কর।”
অভিক কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। চুক্তির ভাষা কঠিন। ‘অতিরিক্ত সেবা মাশুল’ শব্দটা দুবার পড়ল। কলম তুলতে গিয়ে আঙুল কাঁপল একটু। তারপরও সই করল।
বাড়ি ফিরল রাত সাড়ে দশটায়।
দরজা খুলে নিশি টের পেল, মানুষটা আজ আরও নিঃশব্দ।
“এত রাত?”
“কাজ ছিল।”
“খাবে?”
“পরে।”
সোজা ঘরে। আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ঘুরে বলল, “তোমার গয়নাগুলো কোথায় রেখেছ?”
নিশি থমকাল। “কেন?”
“এমনি... দরকার হতে পারে।”
“কিসের দরকার?”
অভিক জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা ইনভেস্টমেন্টের সুযোগ পেয়েছি।”
শব্দটা শুনে নিশির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। হতে পারে ভুল শুনেছে। “কেমন সুযোগ?”
“তুমি এসব বুঝবে না।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ। তারপর গলাটা নামিয়ে বলল, “এত দিন তো সব আমাকে বলেই করতে। আজ হঠাৎ আমি বুঝব না কেন?”
অভিকের ধৈর্য থাকল না। “সবকিছু নিয়ে এত প্রশ্ন করো কেন?”
এরপর কথা থেমে গেল। রাতের খাবারটা শেষ হলো শব্দ ছাড়াই। প্লেটে ভাত পড়ে রইল।
থালা ধুতে গিয়ে নিশি দেখল, টেবিলের কোণে একটা বাদামি খাম। মুখটা খোলা। একটা কাগজের কোণা বেরিয়ে আছে।
সে টান দিতেই বেরিয়ে এলো। উপরে বড় করে লেখা
‘ঋণচুক্তি’।
নিচে অভিকের সই। তারিখ আজকের। আরও নিচে ছোট হরফে লেখা, “জামানত হিসেবে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত সম্পদ প্রযোজ্য হইবে।”
হঠাৎ ঘরটা ঠান্ডা লাগল। ফ্যান চলছে, তবুও।
পেছন থেকে অভিক বলল, “ওটা তোমার পড়ার দরকার ছিল না।”
নিশি ধীরে ঘুরল। চোখে রাগ নেই। একধরনের ক্লান্তি। খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল, “অভিক... তুমি কী করেছ?”
অভিক উত্তর দিল না। দাঁড়িয়ে থাকল।
সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হয়তো এক সেকেন্ডের ব্যাপার। কিন্তু সেটার ভার টেনে চলা—সেটা অন্য গল্প। আর সেই গল্পটা কেবল শুরু হলো।
(চলবে............পর্ব–২ : মিথ্যার শুরু)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।