২০ জুন ২০২১ সাল বাবা দিবসে বাবাকে হারানোর দিন!
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল বাবা দিবস। তবে সত্যি বলতে, আমার কাছে বাবা দিবস বলে আলাদা কোনো দিন নেই। একজন সন্তানের কাছে বছরের প্রতিটি দিনই বাবা দিবস। ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন হয় না। তবুও মানুষ বিশেষ স্মৃতিগুলো ধরে রাখার জন্য দিনগুলোকে একটু আলাদা করে মনে রাখে। সেদিনও সবাই যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বাবাকে নিয়ে ভালোবাসার কথা লিখছিল, আমিও লিখেছিলাম। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল একটা সময় বাবাকে নিয়ে একটি পোস্ট করেছিলাম। কে জানতো, সেটাই হবে বাবাকে নিয়ে আমার শেষ বাবা দিবসের লেখা!
১৯ জুন রাতে বাবা নিজের হাতে তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার ডিম ও পোলাও রান্না করেছিলেন। আমরা সবাই একসাথে বসে খেয়েছিলাম। পরিবারের হাসি-আনন্দে ভরা সেই রাতটা আজও চোখের সামনে ভাসে। রাত প্রায় সাড়ে দশটার দিকে আমরা গল্প করছিলাম। আমার মা তখন অসুস্থ ছিলেন। আমরা সবাই মিলে তার সেবা করছিলাম। বাবা নিজ হাতে ফল কেটে মায়ের সামনে দিয়েছিলেন। কী সুন্দর ছিল সেই মুহূর্তগুলো! ছোট একটা পরিবার, যেখানে কোনো ঝামেলা ছিল না, কোনো বড় সমস্যা ছিল না শুধু ছিল ভালোবাসা আর একে অপরকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
পরদিন, ২০ জুন। দিনের শুরুটা ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। আমি আমার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, বাবা তার কর্মব্যস্ততায়। শরীরেও তার কোনো অসুস্থতার লক্ষণ ছিল না। একজন সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু মানুষ তো জানে না, তার জীবনের পরের মুহূর্তে কী লেখা আছে। সেদিন মাগরিবের আজানের পর বাবা তার কর্মস্থল থেকে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই তার শরীর দুর্বল হয়ে যায়। কর্মস্থলের সহকর্মীরা বাবার মোবাইল থেকে মাকে ফোন করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেন। আমি, মা, বড় বোন ও ছোট বোন ছুটে গেলাম হাসপাতালে। হাসপাতালে পৌঁছে দেখি, বাবা একটি সিটে শুয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো একটু ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু না, তিনি আর কখনো জেগে উঠবেন না। তিনি পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা, সমস্ত দায়িত্ব, সমস্ত ভালোবাসা রেখে চিরতরে বিদায় নিয়ে ফেলেছেন। সেই মুহূর্তের শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যে মানুষটার সঙ্গে প্রতিদিন কত কথা হতো, কত গল্প হতো, যার কাছে সব কথা বলা যেতো হঠাৎ করেই তিনি নেই! চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করলেন। কেউ বলেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কেউ বলেন ব্রেন স্ট্রোক। কিন্তু আমার কাছে এসব চিকিৎসাবিজ্ঞানের শব্দ নয়, আমার কাছে সেদিনের অর্থ একটাই আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বাবাকে বাসায় নিয়ে আসা হলো। তখন প্রায় রাত আটটা। বাবাকে গোসল করানো হলো। হজ থেকে নিয়ে আসা সাদা কাপড়টি তার কাফনের কাপড় হলো। সেই দৃশ্যগুলো আজও হৃদয়ে গভীর ব্যথা হয়ে রয়ে গেছে। এরপর বাবাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হলো। লাশের খাটে শুইয়ে নিচে বরফ রাখা হলো। সবাই হয়তো এটাকে স্বাভাবিক নিয়ম বলবে, কিন্তু একজন সন্তানের কাছে সেই দৃশ্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন দৃশ্যগুলোর একটি। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তিনি এখন নিথর। রাতভর বাবার লাশবাহী গাড়ির সামনে বসে ছিলাম।
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলছিল। চারপাশ নিস্তব্ধ। গভীর রাত, ফাঁকা রাস্তা, আর আমি আমার বাবার পাশে শেষ পাহারাদার হয়ে। সেই রাতটা যেন শেষই হতে চাইছিল না। ফজরের আজান হলো। নামাজ পড়তে মসজিদে গেলাম। একে একে মুসল্লিরা আসতে লাগলেন। সবাই বাবার খবর শুনে গভীর শোক প্রকাশ করলেন। মসজিদের মোয়াজ্জিন থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই একই কথা বলছিলেন, "মানুষটা কখনো সালাম ছাড়া কথা বলতেন না। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, ভাবতেই পারছি না।" সে দিন আমি একটা বড় শিক্ষা পেয়েছিলাম। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু তার চরিত্র, তার ব্যবহার, তার ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। একজন মানুষ মৃত্যুর পরও মানুষের দোয়ায়, ভালোবাসায় এবং স্মৃতিতে জীবিত থাকেন। আজ এত বছর পরও ২০ জুন এলেই বাবা দিবসের পোস্টগুলো চোখে পড়ে। সবাই তাদের বাবাকে নিয়ে লিখে। আর আমি ফিরে যাই সেই দিনে যেদিন পৃথিবী বাবা দিবস পালন করছিল, আর আমি আমার বাবাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। বাবা, আপনি আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু আপনার শিক্ষা, আপনার ভালোবাসা, আপনার হাসি, আপনার স্মৃতি সবকিছু আজও আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে আছে।
আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন, আমিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।