একটি ধারাবাহিক প্রেমের গল্প
নীল সাগরের ওপারে
শেষ পর্ব : প্রথম কথোপকথন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১৭, জুন ২০২৬
রাত আরও গভীর হয়েছে।
রেস্টুরেন্টের চারপাশে হলুদ আলো। মানুষের হাসি, চামচ-প্লেটের টুংটাং, আর স্পিকারে বাজতে থাকা পুরনো একটা গান—সব মিলিয়ে জায়গাটা জমজমাট।
কিন্তু নিশির ভেতর তখনও একটা অদৃশ্য টানাপোড়েন চলছে। একদিকে সব কষ্ট ভুলে থাকতে চাইছে। অন্যদিকে নিজের মনটাকেই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না।
মঞ্চে দাঁড়ানো লোকটার চোখ বারবার এদিকেই চলে আসছে। কেন, সেটা নিশি জানে না।
অভিক চুপচাপ নিশিকে দেখছিল।
মেয়েটা হাসছে। কথা বলছে। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। তবু অভিকের মনে হলো, এই হাসির আড়ালে অনেক না বলা কথা জমে আছে।
সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। নিশিকে কথা দিয়েছিল—ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খোঁচাবে না।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। একবার। দুইবার। তিনবার। টেবিলের ওপর ভাইব্রেশনে কাঁপছে।
নিশি বিরক্ত হয়ে তাকাল। “আপনার ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছে।”
অভিক একটু অপ্রস্তুত হলো। এতক্ষণ নিশির দিকে তাকিয়ে ছিল যে শব্দটা কানেই ঢোকেনি।
নিজের মনেই হাসল। “অভিক, তুই কি সত্যিই এতটা বদলে গেলি?”
তারপর নিশির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি একটু কথা বলে আসছি। আপনি কিছু চাইলে অর্ডার করে নিন।”
বলেই সে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাতাসে লবণের গন্ধ।
অভিক চলে যেতেই নিশি আবার একা। টেবিলের ওপর রাখা লেমন সোডার গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে রইল। গ্লাসের গায়ে পানির ফোঁটা জমেছে।
আজকের রাতটা অদ্ভুত। একদিকে একজন অচেনা মানুষ সম্মান দিয়ে পাশে বসেছে। অন্যদিকে আরেকজন অচেনা মানুষ হৃদয়ের কোনো অজানা কোণে এসে দাঁড়িয়েছে।
নিজেকেই জিজ্ঞেস করল, “এত অল্প সময়ে এদের কথা ভাবছি কেন?”
কোনো উত্তর পেল না। শুধু গ্লাসের ভেতর বরফটা আস্তে আস্তে গলে যাচ্ছে।
মঞ্চে তখন আবার গানের প্রস্তুতি নিচ্ছে রায়হান। গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াচ্ছে, কিন্তু মনটা বারবার চলে যাচ্ছে নিশির টেবিলের দিকে।
সে জানে না কেন, কিন্তু আজ প্রথমবার কোনো দর্শকের চোখে সে নিজের জন্য এক ধরনের অপেক্ষা দেখতে পেয়েছে বলে মনে হলো।
সাহস করে মঞ্চ থেকে নামার সিদ্ধান্ত নিল। আজ আর দূর থেকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
রায়হান ধীরে নিশির টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। গায়ে কালো শার্ট, হাতায় ভাঁজ।
নিশি তাকে আসতে দেখে কিছুটা অবাক। “কিছু বলবেন?”
রায়হান হালকা হাসল। “হ্যাঁ। একটা কথা বলার ছিল।”
নিশি চুপ।
“আমি জানি না কেন, কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হলো... আপনার ভেতরে অনেক কথা আটকে আছে।”
নিশির চোখের দৃষ্টি শক্ত হয়ে গেল। গলার স্বর ঠান্ডা। “সবাই কেন আমার গল্প জানতে চায়?”
রায়হান একটু থামল। তারপর বলল, “আমি আপনার গল্প জানতে চাইনি।”
নিশি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “তাহলে?”
“শুধু এটুকু বলতে চেয়েছি, সবসময় শক্ত থাকার দরকার নাও হতে পারে। কখনো কখনো নিজের কষ্টকেও একটু বিশ্রাম দেওয়া যায়।”
কথাগুলো শুনে নিশি চুপ করে গেল। অনেকদিন পর কেউ তার সমস্যার সমাধান দিতে আসেনি। শুধু অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করেছে। বুকের ভেতর হঠাৎ হালকা লাগল।
ঠিক তখনই অভিক ফিরে এলো।
দূর থেকে নিশি আর রায়হানকে কথা বলতে দেখল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ। সে নিজেই অবাক হলো। দৃশ্যটা ভালো লাগছে না।
তবু নিজেকে বোঝাল, “তোমার তো কোনো অধিকার নেই, অভিক।”
রায়হান যাওয়ার আগে বলল, “আশা করি আবার দেখা হবে।”
নিশি মৃদু হাসল। “হয়তো।”
এই ছোট্ট শব্দটাই রায়হানের কাছে অনেক কিছু হয়ে দাঁড়াল। চোখে সেটা স্পষ্ট।
অভিক এসে বসতেই নিশি তার দিকে তাকাল। “আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
“একটা জরুরি ফোন ছিল।” গলায় কোনো বাড়তি ব্যাখ্যা নেই।
কিছুক্ষণ নীরবতা। টেবিলের মোমবাতিটা কাঁপছে বাতাসে।
তারপর অভিক ধীরে বলল, “আপনি কি আজ একটু ভালো বোধ করছেন?”
নিশি জানালার বাইরে তাকাল। সমুদ্র কালো, শুধু ঢেউয়ের মাথায় সাদা ফেনা।
অনেকক্ষণ পর বলল, “হ্যাঁ।”
একটু থেমে যোগ করল, “আজ অনেকদিন পর মনে হলো, আমি শুধু কারো মেয়ে না, কারো সিদ্ধান্তের অংশ না... আমি নিজেও একজন মানুষ।”
অভিকের চোখে এক ধরনের কোমলতা ফুটে উঠল। সে শুধু বলল, “এই অনুভূতিটা ধরে রাখবেন। হারিয়ে ফেলবেন না।”
রাত শেষের দিকে।
সমুদ্রের ঢেউ আগের মতোই আসছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। ছন্দটা একই, তবু নিশির মনে হলো তার জীবন আর আগের জায়গায় নেই।
সে জানে না আগামীকাল কী হবে। বাবার সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে। ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, সেটাও অজানা।
কিন্তু আজকের রাত তাকে একটা জিনিস বুঝিয়ে দিয়েছে—অন্ধকার যত গভীরই হোক, কোথাও না কোথাও আলো অপেক্ষা করে থাকতে পারে।
আর কখনো কখনো সেই আলো আসে একজন অচেনা মানুষের উপস্থিতি হয়ে। হাত ধরে না, তবু পাশে থাকে।
সমুদ্রের ওপারে নতুন এক গল্প শুরু হলো।
একটা গল্প, যেখানে কষ্ট আছে, দ্বিধা আছে, ভালোবাসা আছে। আর আছে নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার লড়াই।
সমাপ্ত।
#নীল_সাগরের_ওপারে
#অভিক_ও_নিশি
#শেষ_পর্ব
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।