কালভার্টের উপর সকাল থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো পায়চারি করে যাচ্ছে এক ব্যক্তি। চোখে মুখে গভীর উৎকন্ঠা। একবার রেলিংয়ে বসে, পরক্ষণেই আবার উঠে দাঁড়ায়।
লোকটির নাম সান্টু মিয়া।
চোখে মুখেএমন আতঙ্ক, যেন রাষ্ট্রের গোপন নথিপত্র চুরির দায়ে ইন্টারপোল তাকে খুঁজছে। পথচারীদের কাউকে আসতে দেখলেই কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
— ভাই কি বাজার তনে আইলেন ?
— হ, ক্যান?
— না মানে... আমার নামে বাজারে কিছু হুনলেন?
— না তো। কি হুনমু?
সান্টু হাফ ছেড়ে বাঁচে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। মনে হয়, ফেরেশতা নেমে এসে জামিন দিয়ে গেল।
— ঠিকাছে। যান।
পথচারীরা অবাক হয়। কেউ কেউ পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চায় - ক্যান কি হইছে?
সান্টু শুকনা হাসি দিয়ে বলে- না...এমনি কইলাম।
এইভাবেই চলতে থাকে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল।কিন্তু সান্টু মিয়ার উৎকণ্ঠা কমে না।
সবাইকে থামিয়ে একই প্রশ্ন-
“ভাই, বাজারে আমার নামে কিছু হুনছেন?”
“আমারে নিয়া কেউ কি কিছু কইতাছে?” “বাজারে আমারে নিয়া কোন গ্যানজাম ট্যানজাম হয় নাই তো?”
এলাকার পেইচা সোহেল সাইকেল চালিয়ে বাজার থেকে ফিরছিলো। হন্তদন্ত হয়ে তাকে থামালো সান্টু। একই প্রশ্ন-
- বাজারে আমারে নিয়া কোন কিছু শুনলা? পেইচা সোহেল কিছুক্ষণ সান্টুর দিকে তাকিয়ে থাকলো।
— কি হইছে তর?
— না , কিছু না ভাই।
— তাইলে এমন করতাছস ক্যান?
সান্টু থতমত হয়ে জবাব দিল।
— না মানে ... এমনি জিগাইলাম আর কি। মনে হইলো তাই কইলাম...হইতে পারে না? পারে তো। হেহ হেহ হে..
সান্টু হাসার চেষ্টা করলো। হাসিটা ভীষণ বেমানান। যেন কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সে কৌতুক বলছে।
তার চোখে-মুখে এমন আতংক যেন- পুলিশ দেখা মাত্র ধানক্ষেতে লুকিয়ে পরবে।
বিকেলের দিকে গোঁয়ার পাড়া জামে মসজিদের ইমাম আবুল মুন্সি বাজার থেকে ফেরার পথে সান্টুকে দেখে থামলেন।
— কি সান্টু মিয়া, এহনও এহানেই?
সান্টু তার কথার উত্তর না দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে,
— চাচা, বাজারে কোন গ্যানজাম দেখলেন?
— কিসের গ্যানজাম?
— না মানে... আমারে নিয়া কিছু?
হুজুর ভ্রু কুঁচকালেন।
— তোমারে নিয়া গ্যানজাম লাগবো ক্যান?
সান্টু ঢোক গিললো।
— গ্যানজাম তো লাগবারই পারে... বুঝেন নাই?
আবুল মুন্সি কিছু বুঝলেন না।
সামনে গিয়ে নুরুলের পানের দোকানে থামলেন। সেখানে সান্টুকে নিয়ে ইতোমধ্যে ছোটখাটো অনুসন্ধান কমিটি বসে গেছে। সদস্য পেইচা সোহেল, জিলাপি জলিল, ফাটা বাচ্চু এবং আরও কয়েকজন দায়িত্বশীল বেকার লোক।
ফাটা বাচ্চু বললো,
— বাজার থাইকা আসা কমপক্ষে পঁচিশজনরে সে একই কথা জিগাইছে- 'ভাই আমার নামে কিছু হুনছেন?'
পেইচা সোহেল গম্ভীর গলায় বললো,
— ঘটনা সুবিধার না ভাই। ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।
জিলাপি জলিল ঠোঁট বাঁকিয়ে ফয়সালা দিলো,
— ডাইলের ভিতরে অবশ্যই গোস্ত আছে।
সবাই সিদ্ধান্ত নিলো, রহস্য উদঘাটন করতেই হবে। তারা দল বেঁধে কালভার্টের দিকে রওনা দিল।
সান্টু তখন রেলিংয়ে বসে অস্থিরভাবে আঙুল ফোটাচ্ছে।
জিলাপি জলিল হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো,
— শেষ!
সান্টুর বুক ধক করে উঠলো।
— কি হইছে ভাই?
— বাজারে তোমারে নিয়া তুমুল গ্যানজাম লাগছে। লোকজন দল বাইন্ধা তোমার বাড়ির দিকে যাইতাছে। কি কাম করছো তুমি?
কথাটা শোনামাত্র সান্টুর মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো।
— ভাই, ভুল হইয়া গেছে, ভাই! আমারে বাচাও!
ফাটা বাচ্চু ধমক দিলো,
— আগে খুইলা ক, কি করছস?
সান্টু কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চুর পা জড়িয়ে ধরলো।
— আর কোনদিন করমু না ভাই!
পেইচা সোহেল একটু নরম হয়ে মানবিক স্বরে বললো,
— আমরা থাকতে তোর কিচ্ছু হইবো না। সত্য ক।
সান্টু কাঁপা হাতে চোখ মুছল। তারপর ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল।
— ঘরের বাল্বটা দুইদিন ধইরা নষ্ট। বউ কয়দিন থেইকা একটা “এলার্জি বাল্ব” আনতে কইতেছিল। কারেন্ট গেলেও বলে জ্বলে। বউ পোয়াতি মানুষ … রাইতে কারেন্ট গেলে খুউব ডরায়। অন্দারে ছোট বাচ্চাডারে সামলাবার পায় না…
সান্টুর গলা ধরে এলো।
— বাজারে একটা গেছিলাম। একটা বাল্বের দাম সাতশ টাকা। আমি দিন আনি দিন খাই। সাতশ ট্যাকা দিয়া আমি বাল্ব কিনমু কেমনে ভাই?
চারপাশ নিস্তব্ধ।
সান্টু মাথা নিচু করে কান্না চাপে।
— মালিক সমিতির বারান্দা থাইকা বাল্ব খুইলা আনছি। সে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।
চারদিকে সুনসান নীরবতা। দুর থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো।
সান্টু শিশুর মতো কাঁদছিলো।
— আল্লার কসম, বাল্বটা ফেরত দিমু ভাই! আমি চোর না ভাই।
সবাই স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
পুরো বিকেলজুড়ে যে রহস্য, যে আতঙ্ক, যে তদন্ত— তার কেন্দ্রে ছিল একটা সাতশ টাকার বাল্ব!!
ফাটা বাচ্চু চুপচাপ বিড়ি ধরালো।
পেইচা সোহেল দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
আর জিলাপি জলিল আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো..
এই দ্যাশে চুরি কইরা ডরায় খালি ছোট চোরেরা।
যে মানুশ সাতশ ট্যাকার একটা বালব চুরি করে, সেই মানুশটা সারাদিন কালভার্টে বইসা আতংকে কাঁপে।
আর যারা হাজার হাজার কোটি ট্যাকা গিল্লা খায়, হ্যারা টিভিতে বইসা নীতির বক্তৃমা দেয়, বিদ্যাশে ছবি তুলে, গলাত টাই ঝুলায়া আমাগো উন্নয়নের গল্প হোনায়।
তাগোর ঘুম নষ্ট অয় না।
কালভার্টে খাড়ায়া কাউরে জিজ্ঞেসও করতে অয় না—
“ভাই, আমার নামে কিছু হুনলেন?”
##
গল্প - চোর
মাইদুল ইসলাম মুকুল
শিক্ষক, সাংবাদিক ও লেখক
<!-- /data/user/0/com.samsung.android.app.notes/files/clipdata/clipdata_bodytext_260518_122246_398.sdocx -->
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।