ধোঁয়ার ভেতর ঘর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
কথোপকথন । মে ১৭, ২০২৬
শীত প্রায় শেষের দিকে। বারান্দার লোহার গ্রিলে জমে থাকা কুয়াশা ধীরে ধীরে পানির দাগ হয়ে নেমে আসছে। বাইরে কাকগুলো বসে আছে, অস্বাভাবিকভাবে চুপ। যেন শব্দ করলেই শীতটা ভেঙে যাবে। ভেতরে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অভিক। হাতে আধখানা সিগারেট। ধোঁয়াটা বের হওয়ার বদলে বারবার ঘরের ভেতরেই ফিরে আসছে। অদ্ভুত লাগে—যেন এই ঘর নিজেই বাইরে যেতে দিতে চায় না কিছুই।
নিশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— জানেন, শীতের শেষে গাছগুলোকে আমার খুব অসহায় লাগে।
অভিক তাকাল,
— কেন?
— ওরা জানে পাতা ঝরবেই। তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রাখে।
অভিক জানালার বাইরে শুকনো গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি একবার বলেছিলাম, শীতের সময়ে যে কোনো গাছের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কতটা নির্মম হলে ঝরে যাওয়া পাতাও আগুনের কাছে যেতে রাজি হয়।
নিশি ভ্রু কুঁচকে বলল,
— শীতের শেষে পাতা তো ঝরবেই। তখন আগুনের সাথে সখ্যতা না মেনে উপায় কী?
অভিক একটু থামল।
— আমিও হয়তো ঝরা পাতার মতো। তবু আগুনের সাথে আমার সখ্যতা হয় না।
নিশি ধীরে বলল,
— সখ্যতা সবসময় ইচ্ছায় হয় না। কখনো খুব কাছে গেলেই হয়ে যায়। বোঝাও যায় না ঠিকমতো।
বাইরে হালকা বাতাস উঠল। জানালার কাঁচে কুয়াশা নড়ে উঠল একটু। অভিক বলল,
— আগুন শুরুতে পোড়ায় না। আগে কাছে টানে। উষ্ণতা দেয়। তারপর ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়। শেষে হয়তো মানুষ বুঝতেই পারে না, সে আসলে পুড়ছে।
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— আপনি কি চান কেউ এসে আপনাকে পুড়িয়ে দিক?
অভিকের ঠোঁটে একটা ছোট হাসি।
— তুমি কি আমার আগুন হবে?
নিশি হেসে ফেলল। কিন্তু সেটা পুরোপুরি হাসি ছিল না।
— হলে কী হবে?
— নিজেকে শেষ করবো না। শুধু বুঝবো, শেষ হওয়ার পর মানুষ কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
— তাহলে তো সব শেষ।
— না। হয়তো শান্তিটা শেষ হবে আগে।
নিশি এবার বিরক্ত হলো।
— আপনি সবকিছু এত ভাঙনের দিকে কেন নিয়ে যান? আগুন মানেই তো শেষ না। কখনো কখনো আগুন বাঁচিয়েও রাখে।
অভিক নিচু স্বরে বলল,
— কিছু মানুষ হয়তো জন্ম থেকেই ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না শুধু।
নিশি একটু এগিয়ে এল।
— দেখেছেন? আগুন হওয়াটা এত সহজ না।
— কেন?
— কারণ কেউ কারও ভাঙন খুব কাছ থেকে দেখে না। যে সত্যি থাকে, সে-ই না।
অভিক হেসে ফেলল।
— সেটা আগুনের বিষয় না। আগুন শুধু পোড়ায়।
নিশি বলল,
— আপনি সবসময় একইভাবে ভাবেন না কি?
অভিক একটু থামল। তারপর বলল,
— তুমি কি পারবে কাউকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও অন্যরকম একটা জায়গা দিতে?
নিশি চুপ করে গেল। বাইরে কোথাও কুকুর ডাকল। তারপর আবার নীরবতা।
নিশি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— রাধা-কৃষ্ণের গল্পটা মনে আছে?
— কোনটা?
— রাধা বলেছিল, “আমি তোমার মধ্যে কোথায় আছি?” কৃষ্ণ বলেছিল, “সর্বত্র আছ, শুধু ললাটে না।”
অভিক একটু হেসে বলল,
— এত কঠিন কথা তুমি কোথা থেকে পাও?
নিশি তাকাল।
— একা থাকলে এসব কথা মাথায় আসে… জানেন, একটু অন্যভাবে।
অভিকের গলায় শব্দ কমে এল।
— সবাই পাশে আছে, অথচ কেউ নেই।
— আপনি সবসময় নিজেকে একা ভাবেন কেন?
— কারণ আমি একা।
— সত্যি?
— মিথ্যে বলার কিছু নেই। আমার সব লেখা আসলে নিজের ভেতরের শব্দ।
নিশি মাথা নাড়ল।
— সব থাকার পরও কিছু না থাকা—এটা আপনার ক্ষেত্রে পুরোপুরি ঠিক লাগে না আমার।
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— প্রমাণ চাই?
নিশি কিছু বলল না।
অভিক আঙুল তুলে দেখাল,
— ওই যে পূর্ব আকাশে ছোট্ট তারা। দেখছ? খুব ধীরে জ্বলছে।
নিশি তাকাল।
— হ্যাঁ।
— ওটাই আমি। কম আলো নিয়ে বেঁচে থাকা। শেষ পর্যন্ত নিভে যাওয়ার জন্যই যেন জ্বলছি।
নিশি হেসে ফেলল।
— না। ওটা আপনি না।
— এটাই আমি।
নিশি খুব আস্তে বলল,
— আপনার আলো কম না। আপনি শুধু নিজের দিকে তাকান না।
অভিক চুপ করে রইল।
— চাঁদের পাশে তারা ছোটই লাগে, তাই না?
— তবু তারা থাকে।
— কারণ শেষটা তাদের জন্য আগে থেকেই লেখা।
নিশি খুব শান্ত গলায় বলল,
— একদিন সবই নিভে যাবে। সেটা ঠিক। কিন্তু কেউ কি ইচ্ছে করে আগে নিভে যেতে চায়?
অভিক উত্তর দিল না।
ঘরের বাতিটা হালকা দুলল। কুয়াশা আরও ঘন হলো বাইরে।
অনেকক্ষণ পর নিশি বলল,
— ঠিক আছে। যদি আগুনই চান, আমি আগুন হবো। কিন্তু শেষ করার জন্য না।
অভিক তাকাল।
নিশি বলল,
— ভেতরের কষ্টগুলো একটু কমানোর জন্য। যাতে একদিন আপনি ঘুম থেকে উঠতে পারেন, ভয় ছাড়া।
অভিক দীর্ঘক্ষণ চুপ। তারপর খুব আস্তে বলল,
— তাহলে হয়তো একদিন এই ভাঙা ঘরটার ভেতরেই আমি বাঁচার মতো কিছু খুঁজে পাব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।