অদৃশ্য দেয়াল
লেখকঃ হিমানী হিমাদ্রি
মাসের পঁচিশ তারিখ মানেই রফিক সাহেবের কাছে ক্যালেন্ডারের একটা বিভীষিকা। অফিসের টিফিন বিরতিতে সবাই যখন ক্যান্টিনে সতেজ শিঙাড়া আর চা খাচ্ছে, তিনি তখন ডায়েরির শেষ পাতায় পেনসিল দিয়ে খরচের হিসাব মেলাচ্ছেন। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, আর বড় ছেলের টিউশন ফি দেওয়ার পর হাতে যা আছে, তা দিয়ে মাসের বাকি পাঁচটা দিন পার করা মানে অনেকটা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা।
বাসায় ফেরার পথে বাজারের মোড়ে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। ছোট মেয়েটা সকালে বলেছিল, “বাবা, আজ আসার সময় আমার জন্য একটা লাল রঙের টিফিন বক্স এনো তো, সবারটা কত সুন্দর!” রফিক সাহেব কাঁচের শোরুমের দিকে তাকালেন। একটা প্লাস্টিকের বাক্সের দাম তার পকেটের নোটটার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। তিনি মাথা নিচু করে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন।
বাসায় ঢোকার সময় দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী রেখা বেগমের মুখটা দেখে তিনি বুঝলেন, রান্নার তেল বা নুন কিছু একটা ফুরিয়ে গেছে। রেখা বেগম সরাসরি চাইলেন না, শুধু বললেন, “বাজারের ব্যাগটা কি আজ খুব হালকা?”
রফিক সাহেব একটা ম্লান হাসি দিয়ে বললেন, “মাছওয়ালারা আজ খুব দাম চাচ্ছিল, তাই কালকের জন্য রেখে দিলাম।” এই ‘কাল’ শব্দটা মধ্যবিত্তের এক অদ্ভুত আশ্রয়। সব অপূর্ণতা তারা এই আগামীকালের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শান্তিতে ঘুমানোর চেষ্টা করে।
রাতে খাওয়ার টেবিলে যখন শুধু ডাল আর আলুভর্তা পরিবেশন করা হলো, বড় ছেলেটা একবারও অভিযোগ করল না। সে হয়তো বাবার হাতের পুরনো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বুঝে নিয়েছে, আজ অভিযোগ করার দিন নয়।
শোবার ঘরে রফিক সাহেব যখন জানালা দিয়ে বাইরের নিয়ন আলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন, রেখা বেগম পাশে এসে বসলেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমার একটা পুরনো শাড়ি আছে যা আমি আর পরি না, ওটা কাল বিক্রি করে দেব ভাবছি। মেয়ের বায়নাটা মেটানো দরকার।”
রফিক সাহেব রেখার হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তার মনে হলো, মধ্যবিত্তের সংসারটা আসলে চলে টাকার জোরে নয়, একে অপরের প্রতি এই সীমাহীন ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে। বাইরের চাকচিক্য না থাকলেও, এই ভাঙাচোরা দেয়ালগুলোর ভেতরেই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী মমতাগুলো লুকিয়ে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।