মেয়ের কাছে তার বাবার চিঠি(প্রথম খণ্ড)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬
উত্তরণের বছরগুলো
প্রিয় মামনি,
তুমি যখন এই চিঠিটা হাতে পাবে, তখন হয়তো আমি আর কাছে থাকব না। কিন্তু কাগজের এই কুচি যেন আমার কণ্ঠস্বর হয়ে তোমার কানে ফিসফিস করে। আজ আমি তোমাকে আমাদের সেই অতীতের কথা বলব, যা হয়তো তুমি জানো না বা যা আমি কখনও বলার সাহস পাইনি। ভালোবাসা শুধুমাত্র আবেগ নয়, মামনি; এটি এক বিরাট বোঝা এবং দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানুষকে কখনও কখনও নিজের স্বপ্নকে বলি দিতে হয়।
আমার বয়স যখন পঁচিশ, তখন আমি ভেবেছিলাম পৃথিবীটা জয় করা খুব সহজ। তোমার মা তখন আঠারো। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাস, চট্টগ্রামের সেই আর্দ্র শীতের দিনগুলো। আমাদের বিয়েটা ছিল সমাজের সব রীতিনীতির ঊর্ধ্বে। পাশের বাড়ির মেয়েটি, যার সাথে কলেজের লাইব্রেরিতে চোখাচোখি হয়েছিল, যাকে আমি চিঠি লিখেছি সায়বানের কাগজে, সেই মেয়েটিকে আমি ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে বড় ফাঁক ছিল। ধর্ম আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা—দুই পরিবারই আমাদের মিলনটাকে মেনে নিতে চায়নি।
আমরা পালিয়েছিলাম। চট্টগ্রাম শহরের যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে পাহাড়তলীর এক কাজি অফিসে। সেদিন আকাশটা মেঘলা ছিল, মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও আমাদের পালানোর সাক্ষী হতে চাইছিল না। সাক্ষী ছিল শুধু আমার বন্ধু রফিক আর তার ভয়ংকর ভবিষ্যৎবাণী—"ভালোবাসা দিয়ে পেট ভরবে না জাহিদ!" কিন্তু আমরা তখন অভিমানী, অজ্ঞান।
বিয়ের পর তিনদিন আমরা লুকিয়ে ছিলাম একটা ছোট মেসে। ঘরটা ছিল একটা বড় আলমারির মতো অন্ধকার। রাতে ট্রেনের হুইসেল শুনে মনে হতো, যেন পৃথিবীর সব মানুষ আমাদের খুঁজছে। তোমার মা ভয়ে কাঁপত, আর আমি ভাগতে ভাগতে হিমশিম খেতাম। পরিবার মেনে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই মেনে নেওয়ার ভেতরে একটা ঠান্ডা দূরত্ব ছিল, যেটা সময়ের সাথে সাথে একটা প্রবল প্রাচীরে পরিণত হয়েছিল।
সেই বছরগুলো ছিল দারিদ্র্য আর অভাবের সংগ্রাম। পাহাড়তলীর সেই ভাড়া বাসায় বৃষ্টির দিনগুলো ছিল আমাদের জন্য অভিশাপ। বারান্দায় জল জমত, দেওয়ালে ফাঙ্গাস ধরে যেত। পকেটে টাকা থাকত না, কিন্তু তোমার মা জানতেন আমার প্রিয় খাবার আচার। তিনি নিজের শাড়ি কেনার কথা ভুলে যেতেন, কিন্তু বাজার থেকে আমার জন্য একটু বেশি মাছ কিনে আনতেন। আমি অনেক সময় নিজেকে অক্ষম বোধ করতাম। নিজের লুঙ্গির গিট্টু ঠিক রাখতে পারতাম না, রাতে ঘুমাতে গেলে লুঙ্গি খুলে যেত। তবুও চেষ্টা করতাম তোমার মাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে। আমার কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচলটা ঠিকমতো পড়ত না, আর তিনি হাসতেন। সেই হাসির মধ্যে ছিল এক ধরনের করুণা আর ভালোবাসা, যা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
তুমি যখন পৃথিবীতে আসতে চলেছ, তখন আমাদের জীবনে একটা নতুন আলো জ্বলেছিল। ১৯৯৬ সালের ১৪ই অক্টোবর, বিকেল চারটা পঁচিশ। হাসপাতালের করিডোর থেকে তোমার প্রথম কান্নার শব্দ শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, পৃথিবী আমাকে দ্বিতীয়বার জন্ম দিল। কিন্তু মামনি, সুখের সাথে দুঃখও এসেছিল হাত ধরে ধরে। তোমার মা তখন ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছিলেন। চোখের নিচে কালো দাগ, রাতে ঘুমাতে না পারা, হঠাৎ কেঁদে ওঠা—এসব আমি দেখেছি, কিন্তু কিছু করতে পারিনি। হয়তো পরিবারের অবহেলা, হয়তো অভাবের চাপ—সব মিলিয়ে সে একা হয়ে পড়েছিল।
সেদিন বিকেলটা আমার জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন তিনটা আটত্রিশ। জুলাই মাস, বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাঁচে আছড়ে পড়ছিল। দরজাটা যেই বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো, মনে হলো পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেল। তোমার মা একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। কারণ আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম—আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি। আমার ভালোবাসা হয়তো ছিল, কিন্তু সেই ভালোবাসার জন্য তাকে যে ক্ষতটুকু সহ্য করতে হয়েছে, তা হয়তো আমি কখনও বুঝতে পারিনি। তিনি হারিয়ে গেলেন নিজের অজান্তেই।
সেদিন থেকেই আমি শিখলাম—মানুষকে জোর করে রাখা যায় না। আর একা দাঁড়ানোর যে সাহস, তা আমাকে অর্জন করতে হলো রক্তাক্ত পায়ে।
চলবে...
#প্রথম_খণ্ড #বাবা_মেয়ে #বাংলা_ছোটগল্প #পরিবার #ভালোবাসা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।